রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার, চুক্তি সই

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ১৬:০২ | প্রকাশিত : ২৩ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:২০

সেনা অভিযানের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে মিয়ানমারকে রাজি করাতে পেরেছে বাংলাদেশ। দেশটির রাজধানী নেপিডোতে দুই পক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই সমঝোতা অনুযায়ী দুই মাসের মধ্যেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করবে মিয়ানমার।

তবে কবে নাগাদ এই প্রত্যাবাসন শেষ হবে, সেই বিষয়টি স্মারকে উল্লেখ নেই। মিয়ানমারে দুই পক্ষের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার পরদিন এই সমঝোতায় পৌঁছেছে দুই পক্ষ।

বৃহস্পতিবার দুপুর দুইটার দিকে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদোতে দেশটির রাষ্ট্রীয় পরামর্শক ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সু চির দলীয় কার্যালয়ে এই সমঝোতা স্মারক সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী এবং মিয়ানমারের পক্ষে দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা কার্যালয়ের মন্ত্রী কিয়াউ তিন্ত সোয়ে চুক্তিতে সই করেন বলে বার্তা সংস্থা ইউএনবির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এর আগে আজ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় নেপিদোতে সু চির কার্যালয়ে ৪৫ মিনিটব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকের পর ঢাকা ও নেপিদোর মধ্যে ‘অ্যারেঞ্জমন্ট অন রিটার্ন অব ডিসপ্লেসড পারসন্স ফ্রম রাখাইন স্টেট’ বা ‘রাখাইন রাজ্যের উদ্বাস্তুদের ফিরিয়ে নেয়ার আয়োজন’ শীর্ষক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের পাশাপাশি ১৯৯৮ সালে করা সীমান্ত চুক্তি অনুমোদনের বিষয়টিও বিনিময় করে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার।

সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগে মিয়ানমারের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত মিয়ানমারের নেত্রী সু চির সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী।

মিয়ানমারের সঙ্গে আলাচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে অন্তর্ভুক্তির কথা বলেছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া একটি নির্ধারিত সময়ে শেষ করার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছিল। তবে মিয়ানমার এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা ঠিক করতে রাজি হয়নি।

এ বিষয়ে বার্তা সংস্থা ইউএনবির সঙ্গে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করে তিনি বলেছেন, ‘আমরা বেশ কিছু বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছি। কিন্তু আমাদের প্রত্যাশা শতভাগ পূরণ হয়নি। কোনো আলোচনায় এটা সম্ভবও নয়।’

অন্য একজন কূটনীতিক বলেছেন, মিয়ানমার চুক্তি সইয়ের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে চায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুরো প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ করতে চায়, তবে মিয়ানমার সময় বেঁধে না দিয়ে বিষয়টি উন্মুক্ত রাখতে চায়।

তবে কিছু দ্বিমত থাকলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার একটি জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে একমত হয়েছে। পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে এই গ্রুপ গঠন হবে। 

সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগের দিন দুই পক্ষের আলোচনা শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বৃহস্পতিবার দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি সইয়ের বিষয়ে আশাবাদ জানিয়েছিলেন।

পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক, মিয়ানমারে বাংলাদেশের হাইকমিশনার শফিউর রহমান, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা বুধবারের ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে মিয়ানমারের মন্ত্রী কিয়াউ তিন্ত সোয়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একান্ত বৈঠকের পর বৈঠক হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে।

এই বৈঠকের দিন মিয়ানমারের নেত্রী সুচি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে চলতি সপ্তাহেই সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়ে পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। মিয়ানমারে এক জণাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘যেসব শরণার্থী সীমান্ত পারি দিয়েছে তাদেরকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আমরা একটি সমঝোতা স্মারক সই করার চেষ্টা করছি।’

রাখাইন রাজ্যে বসবাসকারী মুসলিম রোহিঙ্গাদেরকে নিজের নাগরিক বলে স্বীকার করে না মিয়ানমার। এক সময় তাদের নাগরিক অধিকার থাকলেও তা বাতিল করা হয় ১৯৮২ সালে। মিয়ানমারের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশি এবং তাদেরকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে হবে।

ওই বছর থেকেই নানা সময় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী এবং নানা সময় বাংলাদেশে প্রাণ বাঁচাতে এসেছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। এদেরকে ফিরিয়ে নিতে বারবার আলোচনা হলেও মিয়ানমার সেই উদ্যোগ নেয়নি।

আগস্টের শেষ দিকে রাখাইন রাজ্যে কয়েকটি পুলিশি চেকপোস্টে হামলার জেরে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে দমন-পীড়ন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসে রোহিঙ্গারা। আর মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেয় বাংলাদেশ। এরপর দুই মাসে ছয় থেকে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে বলে সরকারের তথ্য বলছে।

রোহিঙ্গাদের কক্সবাজারে অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশ এই বিষয়টি এবার জাতিসংঘে তুলে ধরেছে বেশ জোরালভাবে। সাধারণ অধিবেশনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার নির্যাতনের কথা তুলে ধরে তাদেরকে প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক সহায়তা চান।

এরপর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ ও তাদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশের প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়েছে জাতিসংঘে।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চেষ্টার পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চালিয়ে যায় ঢাকা।

গত অক্টোবরে ঢাকায় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির দপ্তরের মন্ত্রী কিউ টিন্ট সোয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর মধ্যে বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসকে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে ওই বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে মতদ্বৈততা রয়ে যায়। বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৯৮২ সাল থেকে যত রোহিঙ্গা এসেছে, ফেরাতে হবে তাদের সবাইকেই। তবে মিয়ানমার চাইছিল সম্প্রতি যারা এসেছে, ফিরে যাবে কেবল তারাই। তবে সেই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ঢাকা। এরপরওও আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে ছিল বাংলাদেশ এবং সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী দেশটিতে গেছেন।

ঢাকাটাইমস/২৩নভেম্বর/এমআর/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত