প্রশ্ন ফাঁস: শিশুকে অসৎ পথে ঠেলছে অভিভাবক-স্বজন

মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ নভেম্বর ২০১৭, ১৬:৩৩ | প্রকাশিত : ২৫ নভেম্বর ২০১৭, ০৮:১৯

রাজধানীর শনির আখড়া এলাকার ‘জ’ অদ্যাক্ষরের একজন ব্যক্তি। রাত ১১টায় ফেসবুকে বিভিন্ন গ্রুপে ঢু মারছেন। কী খুঁজছেন তিনি? জানতে চাইলে জবাব আসলো ভাগ্নের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চলছে। শুনেছেন ফেসবুকে প্রশ্ন পাওয়া যাচ্ছে। সেটা যোগাড় করে পাঠাতে চান ভাগ্নেকে। ভাগ্নেও গভীর রাত অবধি সজাগ প্রশ্নের জন্য। পরদিন সকালে তার বিজ্ঞান পরীক্ষা।

একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ‘হ’ অদ্যাক্ষরের এক কর্মীও রাত সাড়ে ১১টার দিকে বসে ফেমবুকে প্রশ্ন খুঁজে মরছেন। তিনি ভাতিজাকে পাঠাতে চান প্রশ্ন।

গত কয়েক বছর ধরেই পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে তোলপাড় চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা, মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে মাধ্যমিক সমাপনী এসএসসি, এইচএসসি, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষা এমনকি ছোটদের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগও উঠেছে।

প্রশ্ন ফাঁস রোধে সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে-সরকারের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসার পরও চলতি বছরও মাধ্যমিক সমাপনী এবং চলমান প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদনও হচ্ছে নিয়মিত।

কিশোরদের বা বড়দের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হলে তারা নিজেরা হয়ত প্রশ্ন যোগাড় করতে পারে, কিন্তু প্রাথমিকের পরীক্ষার্থীর পক্ষে কি বাইরে থেকে বা ফেসবুক থেকে প্রশ্ন যোগাড় করা সম্ভব? আবার পরীক্ষার আগের রাতের প্রস্তুতিকে কি বাবা-মা বা তার নিকটজন ছাড়া অন্য কেউ শিশুর কাছে থাকে?

বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উত্তর হচ্ছে না এবং এই শিশুদের জন্য প্রশ্ন যোগাড় করে দিচ্ছেন উপরের দুটি উদাহরণের মতো তাদের স্বজনরাই। মামা, চাচা, ভাই, বোন তো বটেই এমনকি বাবা-মাও এই অনৈতিক ও অসৎ পন্থা শেখাচ্ছেন তাদের সন্তানদেরকে।

মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে অভিযোগ তদন্ত করতে গিয়ে সম্প্রতি পুলিশ জানতে পেরেছে, এক দম্পতি তার সন্তানের জন্য সাড়ে ১১ লাখ টাকা দিয়ে প্রশ্ন কিনেছেন।

শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমি কল্পনাই করতে পারি না একজন অভিভাবক তার সন্তানকে অনৈতিকতার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। বাবা-মা-ই প্রশ্নপ্রত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছেন।’

বুধবার সকাল ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত দেশজুড়ে একযোগে পিইসির ‘প্রাথমিক বিজ্ঞান’ পরীক্ষা হয়। এই পরীক্ষার প্রশ্ন পেতে আগের দিন বিকাল থেকেই ফেইসবুক গ্রুপগুলোতে অনেককে পোস্ট ও কমেন্ট করতে দেখা যায়। রাতে ও সকালে এসব গ্রুপে প্রশ্ন ও উত্তর পোস্ট করা হয়। পরীক্ষা শেষে ঢাকা অঞ্চলের প্রশ্নের সঙ্গে তার মিল পাওয়া যায়।

একটি পাবলিক গ্রুপে একজন সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রশ্নের ছবি পোস্ট করেন। পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, ফাঁস হওয়া এ প্রশ্নের সাথে ঢাকা অঞ্চলের প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে।

এই ফেইসবুক গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৫৪ হাজার। জেএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন-উত্তর আসার পর থেকে গ্রুপটিতে সদস্য সংখ্যা বাড়তে থাকে। পিইসি পরীক্ষা শুরুর পর ফের সদস্য বাড়তে দেখা গেছে। প্রশ্ন ফাঁসকারীদের মতো প্রশ্ন অনুসন্ধানে পোস্ট ও মন্তব্যকারীদের সংখ্যাও কম নয় এ গ্রুপে।

কিন্তু প্রাথমিকের পরীক্ষার্থীর পক্ষে ফেসবুক খুলে এভাবে পেজের সদস্য হওয়া কঠিন। কাজেই বোঝা যাচ্ছে বড়রাই তাদের হয়ে এই কাজটি করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, সন্তানের জিপিএ ফাইভ নিশ্চিত করার জন্য মরিয়া হয়ে গেছেন অভিভাবকরা। এটা যেন মান সম্মানের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। আর নিজের সন্তান বা স্বজনের জিপিএ ফাইভ নিশ্চিত করতে সততার ধার ছাড়ছেন না তারা।

আনোয়ার হোসেন বলেন, অভিভাবকদেরকে বুঝতে হবে শিশুর অবশ্যই ভালো ফলাফল করা উচিত। তবে শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তু শিশুকে সৎ, যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। জীবনের শুরুতেই তাদেরকে অনৈতিক দিকে নিয়ে গেলে তারা কিছুতেই সৎ মানুষ হবে না। এতে তার ভবিষ্যত যেমন নষ্ট হবে তেমনি যারা তাদেরকে প্রশ্ন যোগাড় করে দিচ্ছেন তাদের সঙ্গে আচরণও সৎ হবে না।

‘শিশুকে জিপিএ ফাইভ পেতেই হবে- অভিভাবকদেরকে এই মানসিকতার ঝেড়ে ফেলে তাকে পরিশ্রমী, ভালো মানুষ করতেই অভিভাবকদের চেষ্টা থাকা উচিত’-বলেন আনোয়ার হোসেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, সন্তানদের সৎ মানুষ হিসেবে গড়তে শিক্ষক-অভিভাবককে সৎ হতে হবে। নইলে ভবিষ্যত প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাবে।

কিন্তু সরকার কেন প্রশ্ন ফাঁস বন্ধ করতে পারছে না- এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, তাদের তদন্ত বলছে দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষকের হাত ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে।

ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার বলেছেন, প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি এমন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছেছে যেখানে কোনো কিছুতেই হচ্ছে না। সম্প্রতি হয়ে যাওয়া জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস ঠেকাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা শুরুর আধাঘণ্টা আগে পরীক্ষার্থীদের হলে প্রবেশ বাধ্যতামূলক করে। তাতেও কোনো ফল দেয়নি। যথারীতি ফাঁস হয়েছে প্রতিদিনের প্রশ্নপত্র। কেন্দ্রগুলোর সামনে আগের মতোই শিক্ষার্থীদের দেখা গেছে মোবাইল ফোনে পাওয়া প্রশ্নোত্তর মিলিয়ে নিতে।

শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, আগে সরকারি ছাপাখানা বিজি প্রেস ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য খুবই ‘রিস্কি’ জায়গা। এখন সেখান থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয় না। জেলা বা থানা থেকেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের কোনো সম্ভাবনা নেই। পরীক্ষার দিন সকালে শিক্ষকদের হাতে প্রশ্ন যাওয়ার পর কিছু শিক্ষক প্রশ্নপত্র ফাঁস করেন।

মন্ত্রী বলেন, এই শিক্ষকদের অনেককেই চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক পদস্থ কর্মকর্তা ঢাকাটাইমসকে বলেন, প্রশ্নফাঁসের সঙ্গে মূলত সরকারবিরোধী রাজনৈতিক বিশ্বাসের শিক্ষকরাই জড়িত। একাধিক তদন্তে বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে কারা কারা জড়িত সে বিষয়ে মুখ খুলেননি ওই কর্মকর্তা।

(ঢাকাটাইমস/২৫নভেম্বর/এমএম/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত