এত ধ্বংসের পর আবারো হরতাল কেন?

শেখ আদনান ফাহাদ
| আপডেট : ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ১৪:৪৬ | প্রকাশিত : ৩০ নভেম্বর ২০১৭, ১২:৫৮

 

পেট্রোলের আগুনে পোড়া মানব-দেহ দেখেছেন কখনো? যে মরে গেছে, সে তো মরে বেঁচে গেছে। কিন্তু যে মানুষ প্রাণে বেঁচে গেছে, কিন্তু চোখ হারিয়ে অন্ধ হয়ে গেছে, কিংবা পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে গেছে, সে জানে কষ্ট কাকে বলে! তার পরিবার বুঝে, কী হারিয়ে কী পেয়েছে তারা। যে হরতাল-সংস্কৃতিকে দেশের মানুষ না করে দিয়েছে, সেই একই কর্মসূচী আসল ‘মানবতাবাদী’ বলে দাবি করা দেশের বাম দলগুলোর পক্ষ থেকে। এত’ শিক্ষিত’, ‘মানবদরদী’ মানুষেরা এদেশে বাম রাজনীতি করেন; অথচ আত্মঘাতী রাজনৈতিক সংস্কৃতি হরতালের কাছেই নিজেদের সমর্পণ করলেন!

হরতাল-অবরোধ এদেশে কত মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, কত মানুষকে অন্ধ, বধির কিংবা পঙ্গু করে দিয়েছে তার কোনো হিসেব কি আছে এদেশের কোনো গবেষণাগারে? একদিনের হরতাল দেশের অর্থনীতির কতখানি ক্ষতি করে, তার হিসেব নিশ্চয় জানেন এই ‘প্রগতিশীল’ রাজনীতিবিদরা। যদিও বামদলগুলোর ডাকা হরতালে দেশবাসী উল্লেখযোগ্য কোনো সাড়া দেয়নি। বাম দল কেন, এদেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার দোসর স্বাধীনতা-বিরোধী অপশক্তি জামাতের ডাকা হরতাল কিংবা অবরোধ কর্মসূচীতেও দেশবাসী এখন আর সাড়া দেয় না। বহুদিন হয়ে গেল, হরতাল ডেকে জনসমর্থন পাচ্ছে না এই সরকারবিরোধী দলগুলো। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে দেশের কর্মজীবী মানুষ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের। ঘরে বসে তিলে তিলে মরে যাওয়ার চেয়ে রাস্তায় দলে দলে বেরিয়ে পড়ে, কষ্ট করে অফিসে, ব্যবসা কেন্দ্রে কর্মমুখর পরিবেশ সৃষ্টির জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে শিখে গেছেন এরা।

বিএনপি-জামাত না হয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নোংরা রাজনীতির অংশ হিসেবে হরতাল-অবরোধ দিয়ে দেশ অচল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে হরতাল-অবরোধের সংস্কৃতি চর্চা করছিল, কিন্তু সাম্যবাদের রাজনীতি করা দলগুলো কেন হরতালের কাছেই নিজেদের সপে দিলেন? বাম দলগুলো বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছিল। তবে বামদলগুলোর হরতালের তেমন কোনো প্রভাবছিল না রাজধানীতে। শুধুমাত্র পল্টন মোড়, শাহবাগে আর জাহাঙ্গীরনগরের পাশের রাস্তায় হরতালের সমর্থনে মিছিল করতে দেখা গেছে কিছু ছেলে-মেয়েকে। পুলিশ তাদেরকে সেভাবে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেনি।

ঢাকাটাইমসের প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে ডাকা এই হরতালের প্রভাব খুব একটানেই রাজধানীতে। সকাল থেকেই স্বাভাবিক নিয়মে খুলেছে অফিস, আদালত, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। রাজধানীতে যান চলাচলও অন্যান্য দিনের মতোই। হরতালের সমর্থনে পিকেটিং চোখে পড়েনি খুব একটা। রাজধানীতে হরতাল সমর্থকদের অবস্থান দুই একটি জায়গাতেই সীমাবদ্ধ।

বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি ৩৫ পয়সা বাড়ানোর প্রতিবাদে আধাবেলা হরতালের ডাক দেয় সিপিবি, বাসদ ও গণতান্ত্রিক বামমোর্চা। পরদিন বিএনপির মহাসচিব মির্জাফখরুল ইসলাম আলমগীর এই কর্মসূচিতে সমর্থন দেয়ার কথা নাকচ করলেও বুধবার সমর্থন দেয়ার কথা জানান দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তবে এই কর্মসূচিতে বিএনপির কোনো অংশগ্রহণ দেখা যায়নি কোথাও। মির্জা ফখরুল হয়ত আগেই এই হরতালের পরিণতি টের পেয়েছিলেন।

সকালে হরতালের শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মোড় থেকে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ের দিকে আসেন। তাদের শাহবাগ থানার সামনে পুলিশ বাধা দেয়। পরে তারা বাধা ডিঙিয়ে শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। ঠিক শাহবাগে মোড়ে অবস্থান না করে হরতাল সমর্থকরা জায়ান্ট স্ক্রিনের সামনের রাস্তায় অবস্থান নেয়। সকালের দিকে একবার পুলিশ ওই এলাকায় সাঁজোয়া যান থেকে বিকট শব্দ সৃষ্টি করে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয় বলে জানিয়েছেন একজন হরতাল সমর্থক। পরে প্রগতিশীল ছাত্রজোটের কর্মীরা মিছিল নিয়ে শেরাটন মোড় ও কাঁটাবন মোড় ঘুরে আবার শাহবাগে এসে অবস্থান নেন। এই যদি হয়, হরতালের পরিস্থিতি, তাহলে কিসের আশায় বামদলগুলো হরতাল আহবান করে? দেশের মানুষ যে হরতাল সংস্কৃতিকে তালাক দিয়েছে, সেটা কি এই বাম রাজনীতিবিদদের জানার বাইরে?

এই বাম দলগুলোর হরতালে না হয় দেশের অর্থনীতি বা মানুষের দৈনন্দিন কাজে তেমন আছর পড়েনা, কিন্তু দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তো নিশ্চয় এর সুদূরপ্রসারী কুপ্রভাব রয়েছে। রাজনীতিবিদদের হরহামেশাই হরতাল-জাতীয় কর্মসূচির ধ্বংসাত্মক প্রভাব নিয়ে সোচ্চার হতে দেখা যায়। কিন্তু যখনই নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের দরকার পড়ে, ইনারা হরতালের ইস্তেমাল করেন। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী, আইন করে হরতাল কর্মসূচী বন্ধ করার দাবি এদেশে বহুদিনের। কারণ মানুষ হরতাল-অবরোধ-জাতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচী দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। গবেষকদেরমতে, এক দিনের হরতালে ক্ষতির পরিমাণ অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা, যারমধ্যে পোশাক খাতেই ক্ষতির পরিমাণ ২০০ কোটি টাকার ওপরে। যে বছর নির্বাচনথাকে, সে বছর বেশি হরতালও থাকে, এতে সে বছরটিতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও কমেযায়। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৬ সালে। সে চার বছর দেশেরজিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের বেশি থাকলেও ২০১৩ সালে ৬-এর নিচে নামারই আশঙ্কাকরেছিল বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। সিপিডির হিসাবে, হরতালে ১ শতাংশ পুঁজি নষ্ট হলেআর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা। এফবিসিসিআইয়েরদাবি, এক দিনের হরতালে দেশের জিডিপির দশমিক ১২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর যে ক্ষতিহয়েছে, তা বাংলাদেশের জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশের সমান।

হরতাল-অবরোধ না থাকলে অর্থনীতি কতখানি চাঙ্গা হয়, তার প্রমাণ বিগত ২০১৬ সাল ও প্রায় শেষ হয়ে আসা ২০১৭ সাল। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতো মধ্যেই জানিয়েছিল, ২০১৬ সালে প্রধান প্রধানঅর্থনৈতিক সূচক শক্ত অবস্থানে থাকায় এটি প্রমাণ করে, ২০১৭ সালেও তা অব্যাহতথাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল ২০১৭ অর্থবছরের শেষনাগাদ ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৫ ভাগ অর্জন করার ব্যাপারে তারা আশাবাদী।কারণ, বিনিয়োগ বাড়ছে। চলতি বছর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬.৮ শতাংশ হবে বলে বিশ্বব্যাংক তার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল।

বিদ্যুতের দামসহ নানা ইস্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচী আসবে, স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণ মানুষকে নিজেদের দিকে টানতে নানা কর্মসূচী দিয়ে থাকে। কিন্তু সে কর্মসূচী যদি জনগণের জন্যই ক্ষতিকর হয়, তাহলে বিকল্প রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চা শুরু করা ছাড়া দলগুলোর সামনে কোনো বিকল্প থাকা উচিত নয় বলে মনে করি।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত