৩৫ ‘বাচ্চার’ অভিভাবক দুই টোকাই!

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ০১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:৩৮

বাঘিনীর মোট বাচ্চা নয়টা। লালু-বুলুর বাচ্চা আটটা। নাগিনী-সুন্দরনীসহ আরও তিন কুকুরের মোট বাচ্চা ১৮টি। এর মধ্যে একটি কুকুর নিজের তিনটিসহ সম্প্রতি মা মারা যাওয়া ইয়াতিম তিন বাচ্চার লালন-পালন করছে। এই ৩৫ কুকুরছানার দিগি¦দিগ ছোটাছুটি, দুষ্টুমি সকাল থেকে রাত অবধি সামলে রাখে দুই টোকাই।

চঞ্চল ছানাগুলো যখন দলবেঁধে মায়ের দুধ পান করে কিংবা মাকে নিয়ে গড়াগড়ি আর হুটোপুটি খায়, তখন এক দেখার দৃশ্য তৈরি হয়। পথচলতি মানুষ তখন থমকে দাঁড়ায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে দুষ্টুমণিদের ছোটাছুটি।

এই দৃশ্য আপনি দেখতে পাবেন পুরান ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের  (বাহাদুর শাহ পার্ক) পাশে। কুকুর কিংবা ছানাগুলোর আদতে কোনো মালিক নেই। আবার যে দুই টোকাইয়ের দেখভালে পোষ মেনেছে কুকুরগুলো, তাদের ভাষায় এরা বেশ প্রভুভক্ত। সে হিসাবে বেওয়ারিশও বলা যায় না এদের।

কুকুরগুলোকে খাওয়ানো, দুষ্ট মানুষ কিংবা যানবাহন থেকে ছানাগুলো  নিরাপদ রাখার পাশাপাশি রাতের বেলা নিজেদের কাছাকাছি রেখে ঘুমাতে যায় তাদের অভিভাবক দুই টোকাই- ইয়াসিন ও বাদশাহ।

তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশ কয়েক বছর ধরে দেখভাল করায় পুরোপুরি পোষ মেনে গেছে কুকুরগুলো। তারা এখন পরস্পরের উপকারে আসছে। ময়লার স্তূপ থেকে বাছাই করে কুড়িয়ে আনা মাল চুরের হাত থেকে রক্ষা করে একাধিকবার প্রভুভক্তির প্রমাণ রেখেছে লালু-বুলুরা!

ইয়াসিন ও বাদশা ছাড়া ওই পার্কে আরও যারা আছে, তারাও যার যখন সুযোগ হয় বিস্কুট, টোস্ট, কলা কিনে খাওয়ায় কুকুরগুলোকে। তাদের পরম আদরে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে ছোট্ট ছানাগুলো।

লালু-বুলুর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কেমন জানতে চাইলে ইয়াসিন-বাদশার ভাষায়, ‘মাইনষেরে (মানুষকে) খাওয়ালে তারা বেইমানি করবে, মাগার ওরা (কুকুর) বেইমানি করে না।’ এই বিশ্বাস ধারণ করেই তারা নিজেদের সঙ্গী করেছে লালু-বুলু, বাঘিনীদের।

আরও বিস্তারে যাওয়ার আগে এখন একটু শুনে নেয়া যাক এ প্রতিবেদকের কুকুরছানা আবিষ্কারের গল্পটা।

‘চলতি মাসের শুরুর দিকে ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। পার্কের উত্তর পাশে রেলিংয়ের নিচে দেয়াল ঘেঁষে অনেকগুলো বাচ্চাকে কালো রঙের একটা কুকুরের দুগ্ধ পান করতে দেখে চোখ আটকে যায়। কাজের তাড়ায় তখন চলে এলেও ওই দিন বেশ কয়েকবার দৃশ্যটি মনের মধ্যে উঁকি দেয়। দুই দিন পর গত বুধবার (২৯ নভেম্বর) রাতে ঠিক একই জায়গায় দেখা মিলল বাচ্চাগুলোর। এক মায়ের নয়টি বাচ্চা। কেউ গড়াগড়ি খাচ্ছে, কেউ আবার মায়ের দুধ খাচ্ছে। হালকা আলোয় ফ্লাশ দিয়ে যখন ছবি তুলি, মাম কুকুরটি ঘাড় তুলে একবার তাকিয়ে আবার আপন মনে শুয়ে পড়ে।

পাশের ফুটপাতে খিচুরির দোকানে বসা একজনের সঙ্গে কথা বললে তিনি বলেন, ‘ভাই সামনে আরো আছে, যাইয়া দেহেন। লাল একটার আছে আটটা ছাও।’

সামনে একটু এগিয়ে দেখি ফুটপাতের ঠিক মাঝখানে লাল  রঙের একটি কুকুর ঘিরে আটটি বাচ্চা দুধ পান করছে। পাশেই ঝুপড়ির নিচে দুই কৈশোর পেরোনো তরুণ সতর্ক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তাদের কাছে জানা গেল এখানেই শেষ নয়, আরো ছানা আছে।

এই দুই তরুণই ইয়াছিন ও বাদশাহ। ইয়াসিন বলল, ‘মামা, এহানে কুত্তা (কুকুর) আছে আটটা। বাচ্চা হইছে পাঁচটার। সবতে মিললা ৩৫টা ছাও।’

শুনে একটু চমকেই উঠলাম। ৩৫টা! ইতিমধ্যে ১৭টা দেখা হয়ে গেছে। বাকি ১৮টা কোথায়? বিস্তারিত জানতে চাই তাদের কাছে।

তার আগে ইয়াছিন-বাদশাহর কিছু কথা।

প্রায় ১৮ বছর ধরে এই এলাকায় আছে ইয়াছিন।  আশপাশের এলাকার বাসাবাড়ি থেকে ময়লা কুড়ানোর পাশাপাশি ডাস্টবিন থেকে ভাঙারি কুড়িয়ে তা বিক্রি করে জীবন চলে তার। গত পাঁচ বছর ধরে তার সঙ্গে থাকে বাদশা। দুজনই একই কাজ করে জীবন চালান। আরও বেশ কজন আছে, যাদের ভিক্টোরিয়া পার্কের উত্তর পাশে ডাস্টবিনে ময়লা কুড়িয়ে জীবন চলে।

এবার কুকুরগুলোর সঙ্গে তাদের সখ্যের কথা। কয়েক বছর হবে লাল রঙের একটা বাচ্চা কেউ একজন ফেলে যায় ডাস্টবিনে। সেটা তুলে আনে ইয়াছিন ও বাদশা। ইয়াছিনের ভাষ্য, ‘আমরা তুইলা আইনা পালছি। ওরা তো বোবাধন। বোঝে না, কতাও কইতে পারে না। এহন (এখন) মোট আটটা কুত্তা আছে। ৫টার ছাও ৩৫টা। একটা মা আবার মইরা গেছে।’

কুকুরগুলোকে খেতে দিতে হয়? বাদশা বলে, ‘ওরা বিস্কুট খায়, কলাও খায়। আমরা যে যহন পারি আনি, ওরা খায়। আবার এদিক-ওদিক ঘুইরা খায়। রাতে আমগো ধারেই ঘুমায়। বোঝেন না- পাহারা দেয়।’

শুধু পাহারা দেয়, কামড়ায় না? বাদশার দার্শনিক উত্তর, ‘ভাই, মাইনষেরে খাওয়াইলে তারা বেইমানি করবে, মাগার ওরা (কুকুর) বেইমানি করে না। ওরা আমগো তো দূরের, কেউরে কামড়ায় না। তবে ওগো ডিস্টার্ব করলে খবর আছে। মানুষ দেখলেই ওরা বোঝে।’

বাদশার কথা টেনে নিয়ে ইয়াসিন কুকুরের প্রভুভক্তির একটি ঘটনার কথা  জানায়। ‘চোরে মোবাইল নিয়ে গেছে আমার। লালু-বুলু চোর ধইরা দিছে।’

কীভাবে?

‘রাতে মাথার পাশে বস্তার মধ্যে মোবাইল রাইখা ঘুমাইছি। টোকাই একটা আইসা বস্তা টাইনা নিয়ে যাইতেছে। মোবাইলটা বাইর কইরা পকেটে নিয়ে গেছে। ও (কুকুর) তো বস্তা কামড়াইয়া ধইরা ঘেউ ঘেউ শুরু করছে। ঘুম থেইকা উইঠা ধরলাম। মোবাইল বাইর কইরা নিয়ে নিলাম।’

বাদশা আরেক ঘটনার তুলে ধরে- ‘ভাঙারি বস্তায় ভইরা ভ্যানে রাইখা ঘুমাইছি। চোর ভ্যানসহ যাইতে শুরু করছে। আর ওরা (কুকুর) শুরু করছে ঘেউ ঘেউ। চোর তো ভ্যান রাইখা দৌড়।’

অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো দুজন টোকাইয়ের কথা যখন শুনছিলাম, তখন পাশে দাঁড়ানো একজন বলে, ‘ভাই ওরা কষ্ট কইরা জীবন চালাইলেও মনটা ভালো!’

চলে আসার আগে দুই টোকাইয়ের ছবি তুলতে চাইলে প্রথমে ওরা সংকোচ করে। পরে সাংবাদিক পরিচয় দেয়ার পর ইয়াসিন-বাদশা হাসিমুখে পোজ দেয়।

ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফেরার পথে বারবার দুটি ক্লিষ্ট মুখ ভেসে ওঠে মনে। তবে সেখানে যেন ঝলমল করছে এক মানবিক আলো। রাস্তায় বাস করা এই বয়সী তরুণরা কত অপরাধ আর অন্ধকার জগতের বাসিন্দা হচ্ছে। পারিবারিক নজরদারি আর বিধি-নিষেধমুক্ত ইয়াছিন-বাদশারা সেই হাতছানি উপেক্ষাই শুধু করেনি, বরং সারা দিন ঝুটা কুড়িয়ে যা পায় তা থেকে ভাগ দিচ্ছে বেওয়ারিশ কুকরকে। পরম মমতায় আগলে রাখছে তাদের ছানাগুলো।  

(ঢাকাটাইমস/১ডিসেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত