শাকিলের মৃত্যু: একটি রাজনৈতিক ময়নাতদন্ত

শেখ আদনান ফাহাদ
 | প্রকাশিত : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৩:৪৭

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আর রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি আদর্শগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন কবি মাহবুবুল  হক শাকিল। রাজপথের মিছিল, মিটিং, প্রথাগত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। রাজপথ দখলের ট্র্যাডিশনাল পলিটিক্স এর পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশীদের মগজে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মানবতাবাদী আদর্শের বাণী পৌঁছে দেয়ার কঠিন সংগ্রাম শুরু করেছিলেন কলম আর কবিতার শক্তিতে।

নিজে উঠে এসেছেন রাজপথ থেকে। রাজপথের অভিজ্ঞতায়, সময়ের কষাঘাতে বুঝতে শিখেছিলেন রাজনীতিতে শুধু গায়ের জোরে, স্লোগানের আওয়াজে দিশেহারা জনমানুষকে সব সময় পথ-প্রদর্শন করা যায়না। যে কাজ টিয়ার শেল, লাঠিচার্জ কিংবা  বুলেট দিয়ে হয়না, সে কাজ হয় কবিতা দিয়ে, লেখনীর শক্তিতে।

দলীয় নেতা-কর্মীদের তিনি ভালোবাসতেন ঠিকই। কিন্তু স্নেহ আড়াল করে কাব্যের দেয়াল তুলে নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে দূরে থাকতে চাইতেন তিনি। শুধু দলের নেতাকর্মী নন, দলহীন অসংখ্য মানুষের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন ফেসবুককে। হাজির হতেন নানা সেমিনার, আলোচনা সভায়, সাহিত্য আড্ডায়। বইমেলার খবর পেলেই ছুটে যেতেন দেশ-বিদেশের নানা স্থানে।  

সাধারণ মানুষ যখন রাতের আরাম ঘুমে হারিয়ে যেতেন, শাকিল তখন দিনের দাফতরিক কাজ শেষ করে নতুন সৃজনশীলতায়  মগ্ন হয়ে সৃষ্টি করে যেতেন নতুন সব লেখনী। যেসব লেখনীতে মিলেমিশে উঠে আসত ব্যষ্টিক প্রেম-ভালবাসা থেকে শুরু করে রাষ্ট্র দর্শন, বর্তমান নিয়ে সমালোচনামিশ্রিত প্রশংসা, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ ও আশঙ্কা।

ক্ষমতার কাঠামো ও রাজনীতিতে বরাবরই সামরিক, বেসামরিক আমলা আর রাজনীতিবিদদের একচ্ছিত্র আধিপত্য রাষ্ট্রের মুক্তমনা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় অবহেলার কারণ হয়েছে। শাকিল বুঝতে পেরেছিলেন, বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতা আমাদের দিয়ে গিয়েছিলেন তাকে অর্থবহতার সাথে রক্ষা করতে হলে প্রথাগত রাজনীতি চর্চার বাইরে আসতে হবে; মানুষের মন ও মগজের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হলে পুলিশ-আর্মির বাইরে গিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাড়াতে হবে সমাজে। এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা যারা করেন তাদের প্রগতিশীলতা আর শিক্ষার আলোকে সাধারণ মানুষের মনে প্রগতি, সততা আর দেশপ্রেমের সুপ্ত শক্তিকে জাগাতে চেয়েছিলেন শাকিল।

স্রোতের বিপরীতে গিয়ে এই কঠিন সংগ্রাম একা পারবেন না বলে নিজে প্রবেশ করেছিলেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক-কলামিস্টদের সৃজনশীল  পৃথিবীতে। এ পৃথিবী এমন এক পৃথিবী যেখানে কেউ আপনাকে সহজে, সরলমনে গ্রহণ করবেনা। আপনার জ্ঞান-গরিমা, সৃজনশীলতা-প্রজ্ঞা থাকলেই কেবল আপনাকে সবাই একটু পাত্তা দিবে। নিজের লেখার গভীরতা আর সাবলীলতা আর বিষয় বৈচিত্রে তিনি ভালোবাসা অর্জন করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের জীবিত সব বড়-ছোট কবি, লেখক, গল্পকার, উপন্যাসিকের।

নতুন প্রজন্মের কলম যোদ্ধারা যেমন তাঁর লেখনীতে মুগ্ধ হয়েছিলেন, দেশবরেণ্য সব বড় বড় লেখকেরাও তাঁর কাব্য প্রতিভায় মনোযোগ দিয়েছিলেন। শাকিল কাব্যের ছলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন কবি হেলাল হাফিজ,  কবি শহীদ কাদরী, কবি নির্মলেন্দু গুণ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অ্যামিরেটাস আনিসুজ্জামান, দেশের খ্যাতনামা প্রকাশক ওসমান গণিসহ বাংলাদেশের সব সৃজনশীল জগতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে। বাংলা নাটক-সিনেমার কিংবদন্তী পুরুষ হুমায়ূন ফরিদি’র সাথে ছিল তাঁর  অর্থবহ বন্ধুত্ব। হুমায়ূন ফরিদি তাঁর জীবনের শেষ নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে যাদের সাথে আলাপ করে  বাঁচতে চাইতেন তাদের একজন মাহবুবুল হক শাকিল।

দেশের তরুণ, মধ্যবয়সী, প্রবীণ সাংবাদিকদের সাথে পেশাগত এবং ব্যক্তিগত সুসম্পর্ক বজায় রেখে দেশের এবং বিদেশের সংবাদ প্রবাহে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন অধিকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন শাকিল।

বিশেষ করে সর্বশেষ সামরিক বাহিনীর মদদপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে দলীয় নেতা-কর্মী এবং জনসাধারণের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক  অটুট রাখতে কার্যকর ভুমিকা রেখেছিলেন।

আজ মাহবুবুল হক শাকিল শারীরিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। জগতের সব ঝামেলা থেকে তিনি মুক্তি পেয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি নিজেকে অনেক কষ্ট দিয়েছেন শাকিল। কী ছিল সেই অভিমান, কার সাথে ছিল তাঁর অভিমান? উনার মৃত্যু নিয়ে অনেকে অনেক গল্প-কাহিনী কল্পনা করে অনেকে বিকৃত আনন্দ খুঁজবেন।কর্ম যদি হয় ব্যক্তির পরিচয়, তাহলে ব্যক্তির গোপনীয়তায় গণমাধ্যম কিংবা আওয়ামের উঁকি মারার দরকার আছে বলে মনে করিনা।  লোভের রাজনীতিতে যারা ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে আগামীর সুশীল সৎ রাজনীতির স্বপ্ন বুনছেন, তাঁরা নতুন করে আবার টের পেতে শুরু করবেন একজন মাহবুবুল হক শাকিলের অভাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত