নেতা চাই, চাঁদা আদায়কারী নয়

প্রভাষ আমিন
| আপডেট : ১০ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৭:৫১ | প্রকাশিত : ১০ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৭:৪৩

আমরা যখন টুকটাক সাংবাদিকতা শুরু করি, তখন সময়টা উত্তাল। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় চলছে। ছাত্র-জনতার মনে গণতন্ত্রের তীব্র আকাক্সক্ষা। আমার প্রথম রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে পাক্ষিক অনন্যায়। তখনও আমি হাফ অ্যাক্টিভিস্ট, হাফ সাংবাদিক। ৯২-৯৩ সালে শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা তীব্র গণ-আন্দোলন পর্যন্ত হাফ সাংবাদিক-হাফ অ্যাক্টিভিস্টই ছিলাম। আস্তে আস্তে সাংবাদিকতটাই রক্তে মিশে যায়। ফুলটাইম রাজনীতি ছেড়ে ফুলটাইম সাংবাদিক বনে যাই।

গোটা নব্বই দশকজুড়ে রাজপথ ছিল উত্তাল। প্রেসক্লাব, পল্টন মোড়, পল্টন ময়দান, মুক্তাঙ্গন, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, বায়তুল মোকাররম এলাকা ছিল আমাদের প্রতিদিনের কর্মক্ষেত্র। সভা-সমাবেশ, মিছিল, সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাস, হরতাল ছিল পত্রিকার প্রতিদিনকার শিরোনাম। তখন সময়টা ছিল অনেক সংগ্রামের। দিনভর চরকির মতো ঘুরে বেড়াই, কিন্তু পকেট ঠনঠনে। সস্তা খাবারের খোঁজে চষে বেরাই পল্টন আর তোপখানা রোডের বিভিন্ন হোটেল। কাজের কারণে প্রতিদিনই প্রেসক্লাবে যেতে হতো। কিন্তু সেখানে আমাদের মতো ‘অসভ্য’দের প্রবেশাধিকার ছিল না। ঝড়-বৃষ্টি-বাদল উপেক্ষা করে প্রেসক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে থাকি। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে পালিয়েও প্রেসক্লাবে ঢোকার অনুমতি থাকে না। এমনকি প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতেও উল্টোদিকের বিএমএ ভবনে আশ্রয় খুঁজতে হতো। সবচেয়ে মজাটা হলো, বাইরের কোনো অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করে প্রেসক্লাবে আসার পর ‘সভ্য’রা ঢুকে যেতেন, আমাদের জন্য দুয়ার বন্ধ হয়ে যেত। একটু আগেও যারা সহকর্মী ছিলেন, তারাই গেট আটকে দাঁড়িয়ে যান। কী যে অপমান, কী যে বেদনা। পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। জাতীয় প্রেসক্লাব এখন পেশাদার সাংবাদিকদের জন্য অনেকটাই খোলা। কিন্তু হায়, যখন ‘সভ্য’ হতে পেরেছি, তখন আর প্রেসক্লাবে যাওয়ার দরকার এবং সময় কোনোটাই নেই।

বলছিলাম নব্বই দশকের সাংবাদিকতার কথা। এরশাদ পতন পর্যন্ত সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন, কি প্রেসক্লাবে, কি ইউনিয়নে। তাই সাংবাদিকদের শক্তিও ছিল অনেক। কিন্তু এরশাদ পতনের পর বিভক্তি আসে সাংবাদিক ইউনিয়েনে। এমনকি অফিসও আলাদা হয়ে যায়। জাতীয় প্রেসক্লাবে ভবন আলাদা না হলেও টেবিল আলাদা হয়ে যায়। এ বিভক্তির কালে বিপাকে পড়ে মাঠের রিপোর্টাররা। তারা তখন না ঘরকা না ঘাটকা। তেমনি এক সময়ে ১৯৯৬ সালে ২৬ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের দোতলায় গঠিত হয় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি। তথ্য অধিদপ্তরের আমন্ত্রণে রিপোর্টারদের একটি টিমের যমুনা সেতু পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সফরের অব্যবস্থাপনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিকভাবে রিপোর্টারদের একটি সংগঠন গড়ে তোলার তাগিদ হয় এবং গড়ে ওঠে। আমি তখন জনকণ্ঠে কাজ করি। সেদিন ঘটনাস্থলে না থাকলেও আমি রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। এটা আমার সারা জীবনের গর্ব। সেগুনবাগিচার ভাড়া ভবনে যাত্রা শুরু করা রিপোর্টার্স ইউনিটি এখন অনেক বড়। ১২৬ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য এখন ১৭০০ ছাড়িয়েছে। শুরু থেকেই রিপোর্টারদের পেশাগত বিষয়ে পাশে ছিল রিপোর্টার্স ইউনিটি। রিপোর্টারদের ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অনুপ্রেরণার জন্য নিয়মিম পুরস্কার দিয়ে আসছে ইউনিটি। রিপোর্টার্স ইউনিটি পুরস্কার এখন সাংবাদিকদের জন্য বহুল প্রার্থিত।

শুধু রিপোর্টারদের নয়, তাদের সন্তানদের কৃতিত্বেরও স্বীকৃতি দেয় ইউনিটি। সদস্যদের জন্য বিমা সুবিধা, প্রয়াত সদস্যদের সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি, কল্যাণ তহবিল, আবাসনের জন্য সমবায় সমিতি, লেখক সদস্যদের সংবর্ধনা, নিয়মিত রিপোর্টার্স ভয়েস প্রকাশ, সাঁতার শেখানো, পারিবারিক সম্প্রীতি বাড়াতে বনভোজন, মিট দ্য রিপোর্টার্সসহ নানা আয়োজনে বিস্তৃত এখন আমাদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন। ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি এখন আর শুধু রিপোর্টারদের নয়, তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে। রিপোর্টার্স ইউনিটির সবচেয়ে ভালো লাগে যেটা, তা হলো বিভক্তির বিষ এখনও পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি একে। নিয়মিত নির্বাচন হয়, তবে সেখানে কোনো নির্দিষ্ট কোনো প্যানেল হয় না। রাজনৈতিক বিভক্তি আছে, তবে তা প্রেসক্লাব বা ইউনিয়নের মতো প্রকাশ্য বা ঘোষিত নয়।

রিপোর্টার্স ইউনিটির এ সাফল্য, এ বিস্তার দেখলে মন ভরে যায়। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলাম, একবার নির্বাচন করেও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলাম। একসময় পেশাগত কাজে প্রায় নিয়মিতই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যেতে হতো। এখন আর নিয়মিত যাওয়া হয় না। তবে আমি সাংবাদিকদের সব সংগঠনের সব নির্বাচনে ভোট দিতে যাই। ভোটের সময় যে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়, সেটা আমার খুব ভালো লাগে। আর সবচেয়ে বড় যেটা, সেটা হলো অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচন হয় প্রতিবছর ৩০ নভেম্বর। এবারও ভোট দিতে গিয়ে অনেক সময় আড্ডা দিয়েছি। তবে ভোট দেওয়ার পর আড্ডা দিতে গিয়ে একটা মজার তথ্য জানলাম। একজন সাবেক নেতা জানালেন, রিপোর্টার্স ইউনিটির বছরে খরচ প্লাস মাইনাস তিন কোটি টাকা। ক্যান্টিনে সাবসিডি রেটে খাওয়া, পিকনিক ইত্যাদিতে বড় খরচ হয়। হল ভাড়া থেকে আয় হয় এক কোটি টাকা। বাকি টাকাটা আসে কোত্থেকে?

তিনি জানালেন, বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনুদান থেকে। তিনি অনুদান বললেন বটে, তবে আমি শুনলাম চাঁদা। আসলে চাঁদাই তো। নইলে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেন বছরের পর বছর রিপোর্টার্স ইউনিটিকে অনুদান দেবে। মানুষ মসজিদে বা মাদ্রাসায় টাকা দেয় সওয়াবের আশায়। রিপোর্টার্স ইউনিটিকে টাকা দিয়ে তো অশেষ নেকি হাসিল হবে না।

সহজ কথা হলো, এসব প্রতিষ্ঠান রিপোর্টারদের হাতে রাখতে চায় বলেই তাদের টাকা দেয়। অনুদান কত হবে, সেটা নির্ভর করে রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রেসিডেন্ট বা সেক্রেটারির দক্ষতার ওপর। যিনি যত বেশি অনুদান বা চাঁদা আনতে পারবেন, তিনি তত সফল। আমরা আসলে ভোট দিয়ে চাঁদাবাজ নির্বাচিত করি। তবে সেই নেতা দাবি করলেন, এখন অনুদান নেওয়া হয় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, চেকের মাধ্যমে। ধরে নিচ্ছি, আমরা যাদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছি, তারা ব্যক্তিগতভাবে সৎ। কিন্তু প্রতিষ্ঠান হিসেবে ডিআরইউর সততা কিন্তু আমরাই প্রতিদিন প্রশ্নের মুখে ফেলছি। নেতাদের সততা নিয়ে সন্দেহ নেই। তারপরও প্রশ্ন থেকেই যায়, এত টাকা খরচ করে তারা নেতা হতে চান কেন?

আমার দুটি পরামর্শ, প্রথম কথা হলো হল ভাড়া বাড়িয়ে হলেও আয় বাড়াতে হবে। আর ক্যান্টিনে খাবার দাম বাড়িয়ে হলেও সাবসিডি কমাতে হবে। রিপোর্টার্স ইউনিটির নিয়মিত প্রকাশনা থেকে বিজ্ঞাপন খাতে আয় বাড়াতে হবে। পিকনিক করলে ছোট পরিসরে করতে হবে, প্রয়োজনে বাদ দিতে হবে। যেভাবেই হোক আয় বাড়িয়ে, ব্যয় কমিয়ে রিপোর্টার্স ইউনিটিকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে হবে। অনুদান-নির্ভরতা কমাতে হবে। সম্ভব হলে শূন্য করে ফেলতে হবে।

এবার রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাইফুল ইসলাম। নব্বই দশকে যে সংগ্রামমুখর সময়ের কথা বলেছি শুরুতে, সাইফুলও সেই সময়ের মাঠের সৈনিক। সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ শুকুর আলী শুভও আমার পছন্দের। নতুন নেতাদের কাছে দাবি থাকল তারা যেন রিপোর্টার্স ইউনিটিকে স্বনির্ভর সংগঠনে পরিণত করেন। আমরা যেন সব সময় বুক ফুলিয়ে বলতে পারি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যক্তি রিপোর্টার বা প্রতিষ্ঠান রিপোর্টার্স ইউনিটির কোনো দায় নেই। আমরা নেতা চাই, চাঁদা আদায়কারী তথা চাঁদাবাজ চাই না। নতুন কমিটির জন্য প্রাণঢালা শুভেচ্ছা রইল।

প্রভাষ আমিন: বার্তাপ্রধান, এটিএন নিউজ

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত