মরে যাবে তবু হাত পাতবে না প্রতিবন্ধী আশরাফুল

ফয়সাল আহমেদ, শ্রীপুর (গাজীপুর)
| আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:৫২ | প্রকাশিত : ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:২৪

মাত্র ১৩ বছর বয়সে দুই পায়ের চলার শক্তি স্তিমিত হয়ে যায় ছেলেটার। তার কিছুদিন পর পঙ্গুত্ব ভর করল জীবনে। লোকে তার বাবাকে মরামর্শ দেয় তাকে শহরে নিয়ে ভিক্ষা করাতে, তাতে প্রচুর আয়। কিন্তু তার সাফ জবাব, না খেয়ে মরে যাবেন তবু অন্যের কাছে হাত পাতবেন না।

হতদরিদ্র বাবা-মায়ের সন্তান আশরাফুল ইসলাম ছোটবেলা থেকেই ভীষণ মেধাবী। দু চোখে বড় হবার স্বপ্ন নিয়ে স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। নবম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়াও করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন ভেঙে দিলো পোলিও নামের অসুখ। তবু থেমে থাকেনি আশরাফুলের জীবনসংগ্রাম।

দুঃস্বপ্নের মতন তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাকে শারীরিক অক্ষমতা। দিন যতই যাচ্ছে আশরাফুলের শারীরিক গঠন যেন ততই ছোটো হয়ে আসছে। পুরো পরিবারের চোখে-মুখে এখন বিষাদের ছায়া।

২৭ বছরের আশরাফুল দুই সন্তানের বাবা। সংসার বড় হয়েছে। বাস করেন সরকারি খাস পুকুরের পাড়ে। অভাব তার নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ জোগানোর পাশাপাশি সংসারের যাবতীয় ব্যয় মেটাতে নিজের ঘরের ভেতরেই ছোট একটা দোকান খুলে বসেন বছর পাঁচেক হলো। সেখান থেকে দিনশেষে যা আয় হয় তা দিয়ে আর সংসার চলে না। তাই তার স্ত্রী কয়েক দিন আগে স্থানীয় একটি কারখানায় শ্রমিকের চাকরি নেন।

আশরাফুল চলাচলে অক্ষম, তার মা ও স্ত্রীর কোলে চড়ে চলাফেরা করতে হয়। হতদরিদ্র আশরাফুল মুলাইদ গ্রামের রতন মিয়ার ছেলে। রতন মিয়া নিজেও এই বয়সে দিনমুজুরের কাজ করে সংসার চালান। ছেলের অসহায়ত্বের কথা ভেবে মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করেন তিনি।

রতন মিয়া জানান, তিনি গরিব মানুষ। নানান সময় লোকে তাকে বুদ্ধি দিয়েছে শহরে গিয়ে আশরাফুলকে দেখিয়ে ভিক্ষা করতে। তাতে নাকি প্রচুর আয় হবে। কিন্তু আশরাফুলের আত্মসম্মানবোধ এতো তীব্র, সে কখনো রাজি হয়নি। তার কথা একটাই, না খেয়ে মারা যাবে তবু অন্যের কাছে হাত পাতবে না, ভিক্ষা করবে না।

শরীরে নানা ধরনের অসুখ বাসা বেঁধেছে, তারপরও সময় পেলেই বই পড়েন আশরাফুল। আবার কখনো ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের তার দোকানের ভেতর পড়ান। এলাকার বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের খবর মাইকে প্রচারের কাজে সবার আগে ডাক পড়ে আশরাফুলের।

আশরাফুলের মা রাফেজা আক্তার জানান, আশরাফুলের চলাচল করার জন্য একটি হুইলচেয়ার জোগাড়ের অনেক চেষ্টা করছি, কিন্তু পারিনি। হুইলচেয়ারের অভাবে তার চলাচলে খুব কষ্ট করতে হয়। গত ১০ বছর ধরে অসুখে কাবু হয়ে দিন দিন শরীরের গঠন ছোট হয়ে এলেও অর্থের অভাবে ভালো চিকিৎসা নিতে পারেননি। তাই তাদের সব চিন্তা এখন আশরাফুলের বেঁচে থাকা নিয়েই।

শরীর ভেঙে পড়ছে, তবে আশা হারাননি আশরাফুল। বললেন, ‘আমার খুব আশা ছিল আবার উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে লেখাপড়া করে উচ্চতর শিক্ষা শেষ করব। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ হবে কি না জানি না। শরীরের যে অবস্থা, নিজের জীবন নিয়ে আর ভাবি না। এখন সন্তানদের নিয়েই স্বপ্ন দেখি।’

তেলিহাটি ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নং ওয়ার্ড সদস্য মোবারক হোসেন জানান, ‘আশরাফুল আত্মপ্রত্যয়ী এক যুবক। সে নিজে শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে নানা কাজে অক্ষম থাকার পরও অন্যদের বিভিন্ন ভালো কাজে উৎসাহ দেয়। তাই সে হতদরিদ্র থাকার পরও আমাদের গর্ব।’

শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, আশরাফুলের ব্যাপারে আমরা আগে অবহিত ছিলাম না। খুব শিগগির তাকে সরকারের সামাজিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে সহযোগিতা করা হবে।

(ঢাকাটাইমস/১১ডিসেম্বর/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত