বুদ্ধিজীবীর দুই খুনির ফাঁসি অনিশ্চিতই রইল

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৭:৫৭ | প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০৭

মুক্তিযুদ্ধের শেষ বেলায় বুদ্ধিজীবীদের হত্যার দায়ে চার বছর আগে দুই আলবদর নেতার ফাঁসির আদেশ হলেও দণ্ড কার্যকর অনিশ্চিত হয়েই রইল। বিদেশে অবস্থানরত বু্দ্ধিজীবীদের দুই খুনিকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে দৃশ্যমান কোনো সাফল্য নেই। তারা যেসব দেশে আছেন, সেই দেশের সরকারগুলো তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে কি না, সেটিও রয়েছে অনিশ্চয়তায়।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আলবদর নেতা হলেন চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান। এদের একজন যুক্তরাজ্য এবং একজন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।

আল বদর বাহিনীর দুই শীর্ষ নেতা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে এরই মধ্যে। ফাঁসি হয়েছে আলবদর নেতা মোহাম্মাদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলীরও। তাদের দণ্ড কার্যকরের মধ্য দিয়ে জাতির দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়েছে। তবে দুই খুনির দণ্ড কার্যকরে অনিশ্চয়তায় আবার রয়ে গেছে হতাশা।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীনী তুরিন আফরোজ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘প্রসিকিউটর টিম বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় চৌধুরী মুঈদুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করেছে। কিন্তু তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে না গেলে, তাদের সাজা নিশ্চিত করা গেলে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হবে না। তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের। কিন্তু তারা তাদের দায়িত্ব ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের ফিরে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেয়া উচিত।’  

চৌধুরী মুঈনুদ্দীন যুক্তরাজ্যে বসবাস করছেন। তাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটিতে মুসলিম নেতাদের মধ্যে তিনি বেশ প্রভাবশালী। এছাড়া মৃত্যুদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন কোনো বিদেশিকেও যুক্তরাজ্য তার নিজ মাতৃভূমিতে ফেরত পাঠায় না। অন্যদিকে আশরাফুজ্জামান খান যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। এই দেশটিও  নাগরিকত্ব দিয়েছে তাকে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খানকে বুদ্ধিজীবী হত্যায় মূল ‘মাস্টারমাইন্ড’ বলা হয়েছিল। অর্থাৎ এই হত্যাযজ্ঞের চিন্তা তাদের মাথা থেকেই এসেছিল।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের দুই দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির মেধাশূন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। আলবদর বাহিনী জাতির সূর্যসন্তানদের নৃশংসভাবে হত্যা করে। বুদ্ধিজীবী হত্যায় নেতৃত্ব দেয় আলবদর বাহিনী। জামায়াতের সে সময়ের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা-কর্মীদের দিয়ে গঠিত এই খুনি বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান।

২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আইন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই দুই আলবদর নেতার ফাঁসির রায় দেয়। দুই আলবদর নেতা অবশ্য বিদেশে বসে ‘পারলে সরকার এই দণ্ড কার্যকর করুন’ ধাঁচের বক্তব্য দিয়েছেন।

ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী বুদ্ধিজীবী হত্যায় আশরাফুজ্জামান ছিল প্রধান জল্লাদ। আর চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ছিলেন খুন মিশনের ‘অপারেশন ইনচার্জ’। এ দুইজনের পরিকল্পনায় খুন করা হয় দেশের সূর্যসন্তানদের।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর আশরাফুজ্জামান খানের বাসা থেকে একটি ডায়েরি পাওয়া যায়। যে ডায়েরিতে ১৯ বুদ্ধিজীবীর নাম ও ঠিকানা লেখা ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বুদ্ধিজীবী গিয়াস উদ্দিনের বোন অধ্যাপিকা ফরিদা বানু ফৌজদারি আইনের বিভিন্ন ধারায় বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে চৌধুরী মুঈনদ্দীন ও আশরাফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১৯৯৭ সালে মামলা করেন।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে পুলিশ এই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে শেষ করে দেয়। এরপর ২০১০ সালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে এ দুজনের বিরুদ্ধে সরাসরি বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মামলা হয়। তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে হত্যার ১১টি অভিযোগ আনা হয়।

ট্রাইব্যুনালে আনা ১১টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে উল্লেখ করে তাদের সর্বোচ্চ সাজা ঘোষণা করেন বিচারকরা।

রায়ে বলা হয়, ‘জামায়াতে ইসলামীর মস্তিষ্কপ্রসূত ঘাতক বাহিনী আলবদর একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার যে নীলনকশা বাস্তবায়ন করেছে, তা গোটা জাতির বুকে ক্ষত হয়ে আজও রক্ত ঝরাচ্ছে। গত চার দশকে মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার না করতে পারায় জাতি হিসেবে আমরা লজ্জিত, এ লজ্জা আমাদের ক্ষতকে দিন দিন বাড়িয়ে তুলছে। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বাঙালি জাতিকে চিরদিন নিদারুণ যন্ত্রণাই দিয়ে যাবে।’

রায়ে আরও বলা হয়, চৌধুরী মুঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান আলবদর বাহিনীর শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। জামায়াতের নীল নকশা অনুযায়ী সান্ধ্য আইন বলবৎ থাকা অবস্থায় পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের আগ মুহূর্তে কমপক্ষে ১০০ বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়। যাদের হত্যা করেছে, তাদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জন শিক্ষক, বিবিসির সাংবাদিকসহ পাঁচজন সাংবাদিক, দুজন সাহিত্যিক ও ২৬ জন চিকিৎসককে হত্যা করে বলে বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায়।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, দৈনিক পূর্বদেশে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘জল্লাদের ডায়েরি: বুদ্ধিজীবী হত্যার মূল্যবান দলিল।’ বাংলার সোনার সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হত্যার নৃশংসতার খণ্ড খণ্ড চিত্র ওই ডায়েরিতে ছিল। ওই ডায়েরির মালিক ছিলেন জল্লাদ আশরাফুজ্জামান খান। এই ডায়েরিতেই উল্লেখ রয়েছে, জল্লাদ বাহিনীর অপারেশন ইনচার্জ চৌধুরী মুঈনুদ্দীনের নাম। এ ছাড়া আলবদর কমান্ডার শওকত ইমরান, সিটি বদরবাহিনী প্রধান সামসুল হকের নামও উল্লেখ ছিল।

রায়ে বলা হয়, এটা প্রমাণিত যে বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়ার যে ‘মাস্টার প্ল্যান’ ছিল ফ্যাসিস্ট জামায়াতের সেই পরিকল্পনারই অংশ হিসেবে আলবদর বাহিনীকে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের কাজ ছিল এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা। আলবদর বাহিনী জামায়াতের নীল নকশা সম্পন্ন করতে ‘কিলিং স্কোয়াড’ হিসেবে কাজ করেছিল। রায়ে বলা হয়, প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর জাতি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। একটা নতুন জাতি গঠনে এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা নিঃস্বার্থভাবে অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে জাতির এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়।

রায়ের অভিমতে আরও বলা হয়, সবগুলো অভিযোগই ছিল এ দেশের ১৮ জন বুদ্ধিজীবীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ ধরনের অপরাধকে গুরুতর মানবাধিকার লংঘন হিসেবে বিবেচনা করার দাবি রাখে। ন্যায়বিচারের জন্য দুষ্কৃতকারীরা যে জঘন্য অপরাধ করেছে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে। অপরাধের গভীরতা বিবেচনা করে তাদের মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো সাজা দেয়ার উপায় নেই। তাদের একমাত্র এবং একমাত্র সাজা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।

যে ১৮ বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য এই দুই আলবদর নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। সেই বুদ্ধিজীবীরা হলেন: দৈনিক ইত্তেফাকের তৎকালীন নির্বাহী সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন হোসেন, পিপিআইয়ের তৎকালীন প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ নাজমুল হক, দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার তৎকালীন প্রধান প্রতিবেদক আ ন ম গোলাম মোস্তফা, বিবিসির তৎকালীন সংবাদদাতা ও পিপিআইয়ের সাবেক মহাব্যবস্থাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ, শিলালিপি পত্রিকার সম্পাদক সেলিনা পারভীন, সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সার, বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক আলীম চৌধুরী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের কার্ডিওলজিস্ট ফজলে রাব্বী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা, আবুল খায়ের, সন্তোষ ভট্টাচার্য, সিরাজুল হক খান, ফয়জুল মহিউদ্দিন, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও মুনীর চৌধুরী এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক মোহাম্মদ মর্তুজা।

(ঢাকাটাইমস/১৪ডিসেম্বর/এমএবি/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত