কুড়িগ্রাম-৪: আ.লীগ-বিএনপিতে প্রার্থীর ছড়াছড়ি, জাপায় একক

সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
| আপডেট : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:২৫ | প্রকাশিত : ১৪ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:২৩

রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলা এবং চিলমারীর তিনটি ইউনিয়ন নিয়ে কুড়িগ্রাম-৪ আসনটি মূলত জাতীয় পার্টির এলাকা হিসেবেই পরিচিত ছিল। নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বেশির ভাগ সময় এ আসনে রাজত্ব করে জাতীয় পার্টি। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে লাঙ্গল নিয়ে জয়লাভ করেন জাতীয় পার্টির নেতা গোলাম হোসেন, ২০০১ সালে গোলাম হাবিব দুলাল। ২০০৮ সালে জাতীয় পার্টির দুর্গে হানা দিয়ে বিজয় ছিনিয়ে নেন আওয়ামী লীগের জাকির হোসেন। ২০১৪ সালে নৌকাকে হারিয়ে বিজয়ী হন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টির (জেপি) রুহুল আমিন (সাইকেল মার্কা)।

এলাকার তিনটি উপজেলা চেয়ারম্যান পদই আওয়ামী লীগের দখলে। তবে চেয়ারম্যান হওয়ার পর তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতি অভিযোগ মেনে নিতে না পেরে দলের অনেক নেতাকর্মী নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন। তৃণমূল নেতাকর্মীরা আসনটি আবার দখলে নিতে স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রার্থীর সন্ধানে রয়েছেন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টি চায় আসনটি পুনরুদ্ধার।  বিএনপিও আশাবাদী বিজয়ের।

এরই মধ্যে মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। মাঠে, হাট-বাজারে, চায়ের দোকানে আড্ডায় পক্ষে-বিপক্ষে থাকছে নানা যুক্তি। মোড়ে মোড়ে সাঁটানো হয়েছে পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড এবং ডিজিটাল ব্যানার। তাদের নানামুখী তৎপরতায় ভোটার ও দলীয় নেতাকর্মীরা এখন নির্বাচনী আমেজে।

এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী প্রায় দুই ডজন। তাদের মধ্যে রাজীবপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে মতবিনিময়, সভা-সমাবেশ করছেন। নিজের নির্বাচনী প্রস্তুতি সম্পর্কে শফিউল আলম বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন দিলে আসনটি পুনরুদ্ধার করব। সাধারণ মানুষ আমাকে ভালোবাসে। দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আমি যেভাবে গুরুত্ব দেই অন্য কোনো নেতা তা করেননি। তৃণমূলই আমার শক্তি, সাহস।’

নির্বাচন সামনে রেখে মাঠ গরম করে তুলছেন সাবেক মন্ত্রী মরহুম আবদুর রাজ্জাকের শ্যালক মুরাদ লতিফ। তিনি এলাকায় ‘চরবন্ধু’ হিসেবে খ্যাত। চরে বসবাস থেকে শুরু করে তাদের সঙ্গে ওঠাবসাসহ তাদের সুখ-দুঃখে পাশে থাকার কারণে স্থানীয়ভাবে তাকে এ টাইটেল দেয়া হয়।

জানতে চাইলে মুরাদ লতিফ বলেন, আসনটি চর, দ্বীপচর নিয়ে গঠিত। চরের অধিকাংশ মানুষ আমাকে ভালোবাসে। নদী এ অঞ্চলের প্রধান দুঃখ। ২০০১ সালে আবদুর রাজ্জাক পানিসম্পদমন্ত্রী থাকাকালে আমি সাড়ে ৯ কোটি টাকার রাজীবপুর শহররক্ষা বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করি। এ ছাড়া চিলমারী বন্দর রক্ষা প্রকল্পসহ আরো কিছু খাতে প্রায় ৪০ কোটি টাকার কাজ করি। মনোনয়ন পেলে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারব। এ লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বঙ্গবাসী একাধিকবার যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনিও মনোনয়ন প্রার্থী।

শেখ জিল্লুর রহমান আমেরিকায় অবস্থান করলেও এলাকার সঙ্গে তার সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এবং শীতে চরাঞ্চলের দুঃস্থদের মাঝে কম্বল ও গরম কাপড় বিতরণ তার নিয়মিত কর্মসূচি। জানতে চাইলে শেখ জিল্লুর রহমান জানান, ‘আমার বাবা শেখ আবদুল করিম ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আমিও মানুষের সঙ্গে আছি। আমাদের বড় একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত আছি। সব সময় সুখ-দুঃখে এলাকাবাসীর পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

সাবেক এমপি ও রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাকির হোসেন মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এমপি থাকার সময় এলাকার ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। আগের চেয়ে সংগঠনও শক্তিশালী হয়েছে। তিনি বলেন, মনোনয়ন পেলে বিজয় নিশ্চিত।

সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা ও রৌমারী আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফুল ইসলাম মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। তারুণ্যদীপ্ত নেতৃত্বের মাধ্যমে সমাজবদলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে সাইফুল ইসলাম বলেন, গোটা এলাকায় আমি মাটি ও মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করছি। বঙ্গবন্ধুর একজন সৈনিক হিসেবে আরও কাজ করতে চাই। আগে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে নিজেকে নিয়োজিত রাখলেও এখন মূল দলের হয়ে কাজ করছি। মানুষের ভালোবাসাই আমার প্রেরণার উৎস।

আওয়ামী লীগের অপর মনোনয়ন-প্রত্যাশীরা হলেন- রৌমারী আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদ রেজাউল ইসলাম মিনু, রৌমারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল কাদের, জেলা পরিষদ প্যানেল চেয়ারম্যান আজিম মাস্টার, জেলা পরিষদ সদস্য ও যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জাইদুল ইসলাম মিনু, শিক্ষক আবু হোরায়রা, অধ্যাপক ফজলুল হক মনি, ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল হক মন্ডল, অ্যাডভোকেট মাসুম ইকবাল, অধ্যাপক মজিবর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম, রাজীবপুরের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকবর হোসেন হিরো।

বিগত বছরগুলোতে ২০ দলীয় জোট থেকে এ আসনে প্রার্থী দিয়ে আসছিল জামায়াতে ইসলাম। তবে ইসির নিবন্ধন না থাকায় আগামী নির্বাচনে জামায়াত নিজ দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। এ ছাড়া জোটের প্রধান শরিক বিএনপির স্থানীয় নেতারাও চান না এখানে জামায়াতের প্রার্থী।

রাজীবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান বলেন, দলের নেতাকর্মীরা আর জামায়াতের প্রার্থী দেখতে চায় না। এ আসনে বিএনপির প্রচুর ভোট রয়েছে। জোট থেকে বিএনপির প্রার্থী দিলে বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।

রৌমারী বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাহেদ হোসেন সোনাও দলের শক্তি সম্পর্কে আস্থাশীল। তিনি জানান, এলাকায় বিএনপি অনেক শক্তিশালী। সে হিসেবে জোট থেকে বিএনপির প্রার্থী না দিলে দলের নেতাকর্মীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে।

বিএনপির অপর মনোনয়ন-প্রত্যাশীরা হলেন- রৌমারী উপজেলা বিএনপির সভাপতি আজিজুর রহমান, সাবেক ছাত্রনেতা আবুল হাশেম মাস্টার, উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান রঞ্জু, শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান মিনু, মমতাজ হোসেন লিপি ও বেসরকারি সংস্থা আরএসডিএর প্রতিষ্ঠাতা সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইমান আলী।

এনজিওর পরিচালক থাকার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপক পরিচিতি রয়েছে ইমান আলীর। জানতে চাইলে তিনি বলেন, টানা ৩০ বছর উন্নয়নকর্মী হিসেবে চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত গ্রামে কাজ করেছি। এ কারণে ৪৫ হাজার পরিবারের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তারা আমাকে জানে এবং ভালোবাসে। ২০০৮ সালে এ আসন থেকে স্বতন্ত্র নির্বাচন করে ২৭ হাজার ভোট পাই। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র ভোট করে ১৪ হাজার ভোট পেয়েছি। এসব বিবেচনায় আমার নিজস্ব ভোট ব্যাংক রয়েছে। তাই দল মনোনয়ন দিলে ধানের শীষের পক্ষে জয় ছিনিয়ে আনতে পারব।’

আগামী নির্বাচনে ১৪ দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হোক না হোক জাতীয় পার্টি এ আসনে নির্বাচন করবে। কেননা এ আসনে জাতীয় পার্টির শক্তিশালী একটা অবস্থান রয়েছে। রাজীবপুর উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও রাজীবপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ইউনুছ আলী এ দিক থেকে এগিয়ে রয়েছেন। ২০১৪ সালের নির্বাচনে দল থেকে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু এরশাদের নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন তিনি। তবে গত নির্বাচনের পর থেকেই তিনি মাঠে রয়েছেন। নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ ইউনুছ আলী বলেন, ‘মানুষ যা-ই বলুক, এলাকায় এখনো লাঙ্গলের ভক্ত আছে। সাধারণ ভোটাররা এরশাদের প্রতি দুর্বল। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলের কমিটি রয়েছে। বিশাল কর্মী বাহিনী আছে, আর আছে এরশাদ ও লাঙ্গল ভক্তরা। আমার ২২ বছরের শিক্ষকতা জীবনে রয়েছে অনেক ভক্ত। দুর্নীতিমুক্ত পরিচ্ছন্ন ইমেজের অধিকারী হিসেবে মানুষের ভালোবাসাই আমাকে বিজয়ের পথে নিয়ে যাবে।’

গত নির্বাচনে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (জেপির) প্রার্থী ও বর্তমান এমপি রুহুল আমিন মাঠে নেমে পড়েছেন। এলাকায় তার রয়েছে নিজস্ব ভোট ব্যাংক। কেননা তার বড় ভাই গোলাম হোসেন লাঙ্গল নিয়ে দুবার এমপি হন। এ ছাড়া রুহুল আমিন একাধিকবার রৌমারী সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। জানতে চাইলে রুহুল আমিন বলেন, ‘পারিবারিকভাবে এ নিয়ে তিন দফা জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছি। প্রতিবারই নদী বিচ্ছিন্ন রৌমারী-রাজিবপুর অঞ্চলের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। তবে আমার সময়ে স্মরণকালের দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে নিবিড়ভাবে কাজ করছি। এ জন্য মানুষ আমাকে ভালোবাসে।’

মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের মধ্যে বাসদের অ্যাডভোকেট আবুল বাশার মঞ্জু, কমরেড মহিউদ্দিন আলমগীর এবং রৌমারীর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শেখ মো. আবদুল খালেকের নাম শোনা যাচ্ছে। ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের মওলানা আবুল কালাম আজাদ ও যাদুরচর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল বারেকের নাম প্রার্থী তালিকায় রয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/১৪ডিসেম্বর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত