৪৬ বছরেও চিহ্নিত হয়নি ডোমারের সাত বধ্যভূমি

এস এ প্রিন্স, নীলফামারী প্রতিনিধি
 | প্রকাশিত : ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:১০
ডোমারে অরক্ষিত বদ্ধভূমি দেখাচ্ছেন বোড়াবাড়ী স্কুলপাড়ার বাসিন্দা একরামুল হক

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার অন্তত সাতটি এলাকায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মরদেহ পুঁতে রেখেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সেই সাতটি বধ্যভূমি চিহ্নিত হলেও সেগুলো সংরক্ষণে স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও নেয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ।

এতে আগামী প্রজন্মের কাছে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসরদের গণহত্যার কথা অজানা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা গিয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও সে সময়কার ঘটনাবলী সংরক্ষণের উদ্যোগও ভেস্তে যেতে বসেছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নীলফামারীর ডোমার উপজেলায় হানাদার বাহিনী বিভীষিকাময় তাণ্ডব চালায়। বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্তিকামী মানুষজনকে ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করে তাদের ক্যাম্পের অনতিদূরে গর্ত খুড়ে লাশগুলো পুঁতে রাখে।

যুদ্ধের সময় ডোমার উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখানেই তারা হত্যাযজ্ঞ চালায়। বর্তমানে কয়েকটি বধ্যভূমিকে করে যে যার মতো চাষাবাদ করছে।

তৎকালীন সিও অফিস বর্তমানে ডোমার উপজেলা পরিষদের স্টাফ কোয়ার্টারগুলো ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর প্রধান ক্যাম্প। উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন বর্তমান বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের পিছনে শত শত মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখে তারা। দেশ স্বাধীনের পর ওই এলাকায় শত শত মাথার খুলি পড়ে থাকতে দেখেছে এলাকার লোকজন।

উপজেলার বোড়াগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন এলাকায় একটি, গোমনাতী ইউনিয়নে দুইটি, জোড়াবাড়ী ইউনিয়নের মিরজাগঞ্জে একটি, ভোগডাবুড়ী ইউনিয়নের চিলাহাটী বউ বাজারে একটি বধ্যভূমি চিহিৃত করে প্রাচীর দিয়ে ঘিড়ে রাখা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা ভোডাবুড়ী ইউনিয়ন কমান্ডার আব্দুল জব্বার কানু জানান, চিলাহাটি মার্চেন্ট বিদ্যালয়ের পিছনে গণকবরের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল যুদ্ধের পরপর।

বোড়াগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন স্কুল পাড়ার বাসিন্দা ৮৫ বছর বয়সী সাবেক শিক্ষক একরামুল হক জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা বোড়াগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ সংলগ্ন বিএস কোয়ার্টারে ক্যাম্প করে থাকা শুরু করে। তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিকামী মানুষজনকে ধরে এনে এখানে নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলে পুঁতে রাখত।

ওই ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মান্নান বলেন, ‘আমি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরে জানতে পারলাম খান সেনারা পালিয়ে যাওয়ার সময় তাদের ক্যাম্প এলাকার রেলওয়ে লাইন থেকে ছাইতন তলা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার জায়গায় মাইন পুঁতে রাখে এবং সেখানে অনেক লোককে হত্যা করে পুঁতে রাখে। এরপর আমরা মাইনগুলো অনেক কষ্ট করে তুলে নিষ্ক্রিয় করি। এ সময় ক্যাম্প সংলগ্ন মাঠে সাতটি মাথার খুলি পড়ে থাকতে দেখি। এর মধ্যে তিনজন নারী এবং বাকিরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলো বলে জানতে পারি।’

বোড়াগাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান তোফায়েল আহমেদ জানান, সাবেক হুইপ আব্দুর রউফ বেঁচে থাকাকালে বধ্যভূমিগুলা সংরক্ষণের ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হলেও পরে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

ডোমার উপজেলা পরিষদ মোড়ের বাসিন্দা প্রবীণ মতিয়ার রহমান জানান, বর্তমান উপজেলা পরিষদের স্টাফ কোয়ার্টারগুলো ছিল খান সেনাদের টর্চার সেল। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষজন ধরে এনে হত্যা করে বনবিভাগের পেছনের মাঠে পুঁতে রাখত। সেখানে অগুণতি মানুষকে হত্যা করে পুঁতে রাখে খান সেনারা।

উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নরন্নবী বলেন, ডোমার উপজেলায় সাতটি বধ্যভূমি অযত্ন অবহেলায় পড়ে রয়েছে। এগুলো চিহিৃত করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডোমারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উম্মে ফাতিমা বলেন, ‘বধ্যভূমির বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো নির্দেশনা পাইনি। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ থেকেও কোন কিছু জানায়নি।’

ঢাকাটাইমস/১৫ডিসেম্বর/প্রতিনিধি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত