১৬ ডিসেম্বরের পর স্বাধীন হয় যেসব এলাকা

নজরুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৭:৪৮ | প্রকাশিত : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:১০

বাঙালির নিজের রাষ্ট্র পাওয়ার সাধ পূর্ণ হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা প্রাণ বাঁচাতে অস্ত্র সমর্পণ করার পর পরই বাস্তব হয় বাংলাদেশ নামের এক স্বপ্নের বাস্তবায়ন। পাকিস্তানি বাহিনীর সেনাপতি আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী তার সহযোগীদের নিয়ে অস্ত্র সমর্পণ করলেও সেদিন স্বাধীন হয়নি গোটা বাংলাদেশ। রাজধানীরই একটি অঞ্চলসহ দেশের বেশ কিছু এলাকায় তখনও চলছিল যুদ্ধ।

পাকিস্তানি আত্মসমর্পণের পর এই যুদ্ধ চালিয়ে যায় দখলদার বাহিনীর দেশীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস আর বিহারিরা। প্রভু নতি স্বীকার করলেও তারা তখনও পাকিস্তান রক্ষার চেষ্টায় চালিয়ে গেছে বাঙালি নিধন। কোনো কোনো জেলায় অবশ্য সক্রিয় ছিল পাকিস্তানি সেনারাও।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনী গণহত্যা চালাতে এ দেশেও গঠন করেছিল রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী আর শান্তি কমিটি। তারা যুদ্ধ চলাকালে বেপরোয়া লুটপাট আর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের পরও তারা শাস্তির ভয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ গড়ার ব্যর্থ চেষ্টা করে।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, এরা ‘ক্যাথলিক মোর দেন দ্যা পোপ’ এর মতো। কেবল বাংলাদেশে নয়, দেশের বাইরে থেকেই তারা চালিয়েছে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযমও পূর্ব পাকিস্তান পুনরুদ্ধার কমিটি গঠন করে বিভিন্ন দেশ থেকে তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বাঙালির শক্তির কাছে এক সময় নতি স্বীকার করে সবাই।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, দালালদের অনুসারীরা এখনও দেশবিরোধী তৎপরতায় সক্রিয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিলে মিলে প্রায়ই তারা নানা ঘটনা ঘটায়। এদেরকে সামাজিকভাবে প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

নিয়াজীর আত্মসমর্পণ দালালদের ব্যর্থ চেষ্টা

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তসাগর পেরিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে চারটার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চলে পাকিস্তানি বাহিনী বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্ব। জন্ম হয় স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশের। অথচ তখনও অস্ত্র জমা দিতে রাজি হয়নি এই ময়দানের ১২ কিলোমিটার দূরের মিরপুরের বিহারী আর রাজাকাররা। ঢাকার পতন হলেও ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার পতনের পরেও উত্তরাঞ্চলে পাকিস্তানিরা প্রতিরোধ যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। তবে ১৮ ডিসেম্বর বগুড়া, গাইবান্ধা, রংপুর, নাটোর ও নওগাঁর পতন ঘটে ও পাকিস্তানিরা আনুষ্ঠানিকভাবে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে।

১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর দিন ‍স্বাধীন হয় চট্টগ্রাম, সিলেট, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ। ১৩ ডিসেম্বর ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমান প্রথম ইস্ট বেঙ্গলকে নিয়ে চুড়খাই-কানাইরঘাট-চিকনাগুল চা বাগান হয়ে সিলেট শহরের এমসি কলেজ এলাকার টিলাগুলোতে অবস্থান নেন। ১৭ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের আগ পর্যন্ত দখলদার বাহিনীর দুইটি ব্রিগেডকে মুক্তিবাহিনী সিলেট শহরে ঘেরাও করে রাখে।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পরদিন। ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে যৌথবাহিনীর দুই কোম্পানি সেনা ভাটিয়ারীতে আক্রমণ চালায়। ১৬ ডিসেম্বর তীব্র যুদ্ধ হয় সেখানকার সড়ক ও নৌপথে। সড়কপথে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সঙেগ্ তীব্র যুদ্ধ হয় সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই পয়েন্টে। সম্মুখ যুদ্ধ চলে ১৬ ডিসেম্বর রাতেও। পরে ১৭ ডিসেম্বর সার্কিট হাউসে উড়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা।

কিশোরগঞ্জ থেকে পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে এসেছিল আগেই। কিন্তু তাদের দোসর এ দেশীয় দালালরা ঠেকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছিল মুক্তিবাহিনীর জয়যাত্রা। তবে ১৭ ডিসেম্বর সকালে একটি খোলা জিপে করে মুক্তিযোদ্ধা কবির উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র দল শহরে প্রবেশ করে। একই সময় শহরের মারিয়া এলাকা দিয়ে অধ্যাপক আবদুল গণিসহ মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল শহরে ঢোকে। দিশেহারা হয়ে পড়ে রাজাকাররা। ওই দিন শহরের পুরানথানা শহীদী মসজিদ সংলগ্ন ইসলামীয়া ছাত্রাবাস মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করে রাজাকার-আলবদর বাহিনী। রাজাকার-আলবদর বাহিনী আত্মসমর্পণ করার পর মুহূর্তেই বদলে যায় কিশোরগঞ্জ শহরের চিত্র। বিজয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে চারপাশ। পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে কিশোরগঞ্জের আকাশে ওড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের পর দিন ‍স্বাধীন হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  জন্মস্থান ফরিদপুর। ১৭ ডিসেম্বর দুপুরে ফরিদপুর পুলিশ লাইনে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। ওইদিন সকালেও পাক মিলিশিয়া ও বিহারীদের সাথে মরণপন যুদ্ধে লিপ্ত হতে হয়েছিল ফরিদপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের। 

১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও খুলনা মুক্ত হয়েছিল একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর। বিজয়ের পরদিনও  মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর মুখোমুখি যুদ্ধ হয় খুলনার শিরোমণি, গল্লামারী রেডিও স্টেশন (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা), লায়ন্স স্কুল, বয়রার পোস্ট মাস্টার জেনারেলের কলোনি এলাকা, ৭নম্বর জেটি এলাকা, নূরনগর ওয়াপদা (পানি উন্নয়ন বোর্ড) ভবন, গোয়ালপাড়া, গোয়ালখালি, দৌলতপুর, টুটপাড়া, নিউ ফায়ার ব্রিগেড স্টেশনসহ বিভিন্ন এলাকায়। ১৭ ডিসেম্বর ভোরে শিপইয়ার্ডের কাছে রূপসা নদীতে বটিয়াঘাটা ক্যাম্প থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি লঞ্চ এসে পৌঁছে। কিন্তু শিপইয়ার্ডের মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা পাকসৈন্যরা লঞ্চটির ওপর আক্রমণ চালায় এবং গুলিবর্ষণ করেন। মুক্তিবাহিনীও লঞ্চ থেকে নেমে শিপইয়ার্ডের ওপারের ধান ক্ষেতে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলি চালায়। উভয়পক্ষের গুলি বিনিময়ে ১ জন মুক্তিযোদ্ধা নিহত ও ১৬ জন আহত হন। এই যুদ্ধে পাকবাহিনীরও কয়েকজন নিহত ও আহত হয়। অবশেষে সব বাঁধা অতিক্রম করে ১৭ ডিসেম্বর সকালে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা শহরে প্রবেশ করতে শুরু করেন। খুলনা সার্কিট হাউস দখল করার পর মেজর জয়নুল আবেদীন ও রহমত উল্লাহ্ দাদু যৌথভাবে সার্কিট হাউসে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।

১৬ ডিসেম্বরের ছয় দিন পর স্বাধীন হয় বরিশালের আগৈলঝাড়া ও গৌরনদী। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে দীর্ঘ ২৮ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করে ২২ ডিসেম্বর রণে ভঙ্গ দেয় শতাধিক পাক সেনা আর তাদের দালালরা।

পাকিস্তানিদের দালালদের সবশেষ চেষ্টা চলে ঢাকার জনপদ মিরপুরে। সেখানে প্রধানত বিহারিরা অস্ত্রবাজি চালাতে থাকে পরের মাস জানুয়ারির পুরোটা জুড়েই।

অবশেষে ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অভিযান চালায় মিরপুরে। অস্ত্রধারীরা এরপর আর সাহস দেখায়নি।

(ঢাকাটাইমস/১৭ডিসেম্বর/এনআই/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত