জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি-বাংলাদেশ

২০১৭ তে স্বস্তি, ২০১৮ তে কী

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান
 | প্রকাশিত : ০১ জানুয়ারি ২০১৮, ১১:৫৬

২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দেশের অন্যতম আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল দেশজুড়ে চলা গুপ্তহত্যা বা টার্গেট কিলিং। যার দায় স্বীকার করেছে আল কায়েদা ও ইসলামিক স্টেট। ২০১৬ পর্যন্ত  দেশজুড়ে চলা টার্গেট কিলিংয়ের ৪২টির সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত ছিল আইএসের সমর্থনপুষ্ট নব্য জেএমবি। আর দেশ তো বটেই সারা বিশ্বের অন্যতম আলোচিত ঘটনা ছিল হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা। এরপরই নড়েচড়ে বসে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হলি আর্টিজান ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে র‌্যাব, পুলিশ, সিটিটিসি সহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে তাই ২০১৭ সালে জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যের পাল্লাই ভারি।

এই বছরের মার্চে কুমিল্লার চান্দিনায় বোমাসহ গ্রেপ্তার হয় দুই জন। মূলতঃ তাদের দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অভিযান চলে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানে নিহত হয় বেশ কয়েকজন জঙ্গি। তবে এই সময়ে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল জঙ্গিদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা। ১৭ মার্চ র‌্যাবের আশকোনার ব্যারাকে আত্মঘাতী হয় একজন জঙ্গি। এর পরপরই ২৪ মার্চ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের অদূরে পুলিশ চেকপোস্টে আত্মঘাতী হয় আরেক জঙ্গি। একই দিন সকাল থেকে সিলেটে শুরু হয় আরেক জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযান অপারেশন টোয়াইলাইট।

সেনাবাহিনীর কমান্ডোদের ১১১ ঘণ্টার অভিযানে চারজন জঙ্গি নিহত হয়। তবে এই অভিযানে বোমা বিস্ফোরণে নিহত হন র‌্যাবের গোয়েন্দা প্রধান লেফট্যানেন্ট কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ আরো ছয়জন। জটিলতর এই অভিযানেও সফল হয় সেনাবাহিনীর প্যারা কমান্ডোরা। সব মিলিয়ে নতুন কোন টার্গেট কিলিং, আত্মঘাতী হামলা কিংবা বিবৃতি না থাকায় ২০১৭ সালটি জঙ্গিবাদের ভয় থেকে অনেকটা নির্ভার ছিলেন দেশবাসী।

তবে ২০১৮ তে কিছু চ্যালেঞ্জও যুক্ত হয়েছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য। প্রথমেই আসে ২০১৮ সালের দেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বাংলাদেশে নির্বাচনের বছরটিতে রাজনীতির মাঠ সব সময়ই ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ থাকে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অনেক সময়ই নির্বাচনের পরিবেশ ঠিক রাখতে ব্যস্ত থাকতে হয়। সেক্ষেত্রে জঙ্গি সংগঠনগুলোর নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ‘মানবসৃষ্ট আইনব্যবস্থা’ অভিহিত করে তাগুত বলে খারিজ করে দেয় জঙ্গি সংগঠনগুলো। তাই সামনের সংসদ নির্বাচনে আতঙ্ক তৈরির লক্ষ্য নিয়ে নতুন করে মাঠে নামতে পারে নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম।

২০১৭ সালে দেশের জঙ্গিবাদ বিরোধী অভিযানের মূল কেন্দ্রে ছিল আইএসের সমর্থনপুষ্ট নব্য জেএমবি। কিন্তু সমসাময়িক আরেকটি জঙ্গিগোষ্ঠী সক্রিয় আছে সেটি হলো-আল কায়েদার সমর্থনপুষ্ট আনসার আল ইসলাম। পুরনো এই সংগঠনটি ২০১৩ সাল থেকেই সক্রিয়। ওই বছর ব্লগার রাজীব হত্যার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসে আনসার উল্লাহ বাংলা টিম। ২০১৪ সালে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশীয় শাখা আল কায়েদা ইন ইন্ডিয়ান সাব কন্টিনেন্ট কর্মকাণ্ড চালানোর ঘোষণা দিলে নিজেদের নাম পাল্টে আনসার আল ইসলাম রেখে আল কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয় আনসারুল্লাহ বাংলা টিম। পরপর বেশ কয়েকটি টার্গেট কিলিংয়ে অংশ নেয় এর সদস্যরা। আইএসের সমর্থনপুষ্ট নব্য জেএমবি যেখানে ততোটা দৃশ্যমান নয়, সেখানে ভার্চুয়াল মিডিয়ায় এখনো যথেষ্ট সক্রিয় আনসার আল ইসলাম।

দাওয়া ইল্লাহ নামের বিভিন্ন ডোমেইন নেম নিয়ে নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে সংগঠনটি। সেখানে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে নতুন সদস্য সংগ্রহ সবই চলে। নব্য জেএমবির ভয়াবহতায় খানিকটা আড়ালে রয়ে গেছে আনসার আল ইসলাম। আনসার আল ইসলাম তার সক্রিয়তার কারণে ২০১৮তে নতুন ঝুঁকি হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার দীর্ঘসূত্রিতা থেকে ২০১৭ সালেও বের হওয়া যায়নি। ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার মামলার তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি। ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমার নতুন তারিখ ধার্য করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার এই ধরণের দীর্ঘসূত্রিতায় জামিনে বের হয়ে আসছে দুর্ধর্ষ জঙ্গিরা।

২০১৭ সালে ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পাশাপাশি পুলিশের নতুন এন্টি টেররিজম ইউনিট অনুমোদন পেয়েছে। সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে সিটিটিসির। কিন্তু স্বল্প মেয়াদি এসব উদ্যোগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জঙ্গিবাদের মতাদর্শের বিরুদ্ধে পাল্টা মতাদর্শ দাঁড় করানোর খুব একটা সাফল্য ২০১৭ সালে দেখতে পাওয়া যায় না। অভিযান কিংবা আইনের হাতে সোপর্দ করার পাশাপাশি পাল্টা মতাদর্শ তৈরি না হলে জঙ্গিবাদ নির্মূলে পুরোপুরি সাফল্য পাওয়া কঠিন। 

২০১৮ সাল নির্বাচনের বছর। এই সময়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি থাকে উত্তপ্ত। এই সুযোগে ঘুরে দাঁড়াতে পারে আনসার আল ইসলাম কিংবা নব্য জেএমবি। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং জঙ্গিবাদ বিরোধী পাল্টা মতাদর্শই পারবে জঙ্গিবাদের ঝুঁকি কমিয়ে আনতে।

সৈয়দ মাহফুজুল হক মারজান

শিক্ষক ও জঙ্গিবাদ বিষয়ক গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত