জেরুজালেম প্রশ্নে জাতিসংঘ

মোহাম্মদ জমির
 | প্রকাশিত : ০৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:৫০

আমেরিকা যা করবে, তার বিপরীত কিছুই করবে ইরান। বিশ্ব রাজনীতিতে এই কথাই সত্য। ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে জেরুজালেমকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতির পাল্টা জবাবে এবার একে ‘ফিলিস্তিনের চিরস্থায়ী রাজধানী’র স্বীকৃতি দিয়েছে ইরান। জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের স্থায়ী রাজধানীর স্বীকৃতি দিতেই ২৭ ডিসেম্বর ইরানের পার্লামেন্টে ভোটাভুটির আয়োজন করা হয়। সেই ভোটে এ নিয়ে পার্লামেন্টে একটি আইনি প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছেন আইনপ্রণেতারা। এ বিষয়ে জেরুজালেম পোস্ট জানায়, ওই প্রস্তাবে ২৯০ আইনপ্রণেতার মধ্যে জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণার পক্ষে ভোট দেন ২০৭ জন। পার্লামেন্টে ভাষণে স্পিকার আলি লারিজানি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ইরান এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফিলিস্তিন অনেক আগে থেকেই তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে পূর্ব জেরুজালেমকে দেখে আসছে। অন্যদিকে তেল আবিবকে রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করে দাপ্তরিক ও সরকারি কর্মকাণ্ড চালালেও সবসময় জেরুজালেমকেই রাজধানী করতে চেয়েছে ইসরাইল।

১৯৬৭ সালে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ইরান। গত ৬ ডিসেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথমবারের মতো অখণ্ড জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ইসরাইলে মার্কিন দূতাবাস তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে সরিয়ে নিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এ ঘোষণার পর বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ-নিন্দার ঝড় ওঠে। প্রতিবাদে ওআইসি পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানীর স্বীকৃতি দেয়। ২১ ডিসেম্বর জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির মার্কিন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব অনুমোদন করে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। ভোটাভুটিতে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেয় বাংলাদেশসহ ১২৮টি দেশ। কানাডা, আর্জেন্টিনা এবং ভুটানসহ ৩৫টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইলসহ ৯টি দেশ প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। এর আগে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে প্রত্যাখ্যান করে উত্থাপিত একটি খসড়া প্রস্তাবের ওপর নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি হয়। এতে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের ১৪ সদস্য পক্ষে ভোট দেয়। কিন্তু একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের কেউ ভেটো দিলেই জাতিসংঘের কোনো সিদ্ধান্ত আর কার্যকর হতে পারে না। সেই সুযোগই নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই ভোটে ক্ষমতার নিন্দা আমরা করতে পারি না। কারণ এই ক্ষমতা না থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতে পারত না। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে রাশিয়ার ভেটোদানের ক্ষমতা আমাদের পক্ষে যাওয়ায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনের চ‚ড়ান্ত ফল হিসেবে আমরা বিজয় পাই। এতে করে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় নিশ্চিত হয়। তবু আজকের দিনে এসে এটি প্রায়ই মনে হচ্ছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হিসেবে কেউ কী এর অপপ্রয়োগ করছে। বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো মানুষ যদি বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়ে যান, তখন আশঙ্কা আরো বহু গুণ বৃদ্ধি পায়।

আমরা দেখলাম নজিরবিহীনভাবে পুরো বিশ্বের প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্টের হুমকি-ধামকি। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতির মার্কিন সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে অনুমোদন বিষয়ক ভোটাভুটির আগে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নিকি হ্যালি ১৯৩ সদস্য-রাষ্ট্রের অধিকাংশকে একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে বলা হয়েছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দেবে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে। একটি টুইটেও তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন। টুইটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের বিপক্ষে ভোট দিতে দাও। আমরা অনেক বাঁচাবো।’

২০ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠক শুরুর আগে নিকি হ্যালিকে পাশে বসিয়ে তার কাজের প্রশংসা করেন ট্রাম্প। জাতিসংঘে ভোটের আগে হ্যালি সবার কাছে ‘সঠিক বার্তা’ পাঠিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। এছাড়া তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তারা (বিভিন্ন দেশ) আমাদের অর্থ নেয় এবং তারপর আমাদের বিপক্ষে ভোট দেয়। তারা শত শত মিলিয়ন ডলার, এমনকি বিলিয়ন ডলার নেয় এবং তারপর আমাদের বিপক্ষে ভোট দেয়। আমরা এই ভোটের দিকে নজর রাখছি। তাদের আমাদের বিপক্ষে ভোট দিতে দেন। আমরা অনেক অর্থ বাঁচাবো। আমরা পরোয়া করি না।’

ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর ‘কাউন্সিল অন অ্যামেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’র জাতীয় নির্বাহী পরিচালক নিহাদ আওয়াদ টুইট করে বলেছেন, ‘জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে অন্যান্য দেশ, যারা জেরুজালেমের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সমর্থক, তাদের ব্ল্যাকমেইল করা আমাদের সরকারের উচিত হবে না। খ্রিস্টান, ইহুদি ও ইসলাম ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ হলো ন্যায়বিচার।’ ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিয়াদ আল-মালিকি ও তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসল যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভয় দেখানোর অভিযোগ এনেছেন। এই ভয় সেভাবে কাজে আসেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটের মাধ্যমে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ট্রাম্পের ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ট্রাম্পের অর্থ-সহায়তার হুমকি যে পুরো ব্যর্থ হয়েছে তা নয়। কিছু রাষ্ট্র এ কারণেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ভোট দিয়েছে, নয়তো ভোটদানে বিরত থেকেছে। প্রস্তাবে যেসব দেশ ভোট দেওয়া থেকে বিরত ছিল সেগুলো হলো- এন্টিগুয়া-বারবুদা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামাস, বেনিন, ভুটান, বসনিয়া-হারজেগোভিনা, ক্যামেরুন, কানাডা, কলম্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, ডোমিনিক্যান প্রজাতন্ত্র, ইকুইটোরিয়াল গিনি, ফিজি, হাইতি, হাঙ্গেরি, জ্যামাইকা, কিরিবাতি, লাটভিয়া, লেসেথো, মালাউয়ি, মেক্সিকো, পানামা, প্যারাগুয়ে, ফিলিপাইন, পোল্যান্ড, রোমানিয়া, রুয়ান্ডা, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, দক্ষিণ সুদান, ত্রিনিদাদ-টোবাগো, টুভ্যালু, উগান্ডা ও ভানুয়াতি। আর নিরাপত্তা পরিষদে সিদ্ধান্তের বিপক্ষে সংগত কারণেই ভোট দেয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। তাদের পক্ষে ভোট দেওয়া বাকি সাত দেশ হচ্ছে গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, মাক্রেসয়া, নাইরু, পালাও, টোগো, মার্শাল দ্বীপ। একেই সাফল্য হিসেবে দেখাতে চাইছে ভোটে পরাজিত যুক্তরাষ্ট্র। তাদের আরো খুশি করেছে গুয়াতেমালার সিদ্ধান্ত। ইসরাইলে নিজেদের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জিমি মোরালেস। ২৪ ডিসেম্বর এক ফেসবুক পোস্টে মোরালেস জানিয়েছেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলার পর সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পও একই ঘোষণা আগেই দিয়ে রেখেছেন। তার মানে তাকেই অনুসরণ করছেন মোরালেস। আসলে মধ্য আমেরিকার দরিদ্র দেশ গুয়াতেমালাকে সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে থাকে। তাই ট্রাম্পের সহায়তা বন্ধের হুমকি কিছু ক্ষেত্রে কাজে আসছে।

কিন্তু জেরুজালেম ইস্যুতে বাকি বিশ্বকে কাছে পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিষদে শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ভোট দিয়েছে মিত্র সৌদি আরব, ভারত ও আরব আমিরাত। এমনিতে ঘনিষ্ঠতম বন্ধুরাষ্ট্র ইংল্যান্ড, ফ্রান্সও নাখোশ মার্কিন ঘোষণায়। ভোটেও ছিল সেই জের। ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপানও জেরুজালেম ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক বিপরীত মেরুতে। ২৬ ডিসেম্বর জর্দানের রাজধানী আম্মান সফরের সময় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদির সঙ্গে বৈঠকে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কানো বলেছেন, ইসরাইল কর্তৃক দখলকৃত জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেবে না জাপান। তেল আবিব থেকে জাপান তাদের দূতাবাস সরিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে নেবে না। সংলাপের মাধ্যমেই পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহরের মর্যাদা ঠিক করতে হবে বলে জাপান মনে করছে।

অন্যদিকে ওআইসি শুধু নয়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মতো প্রভাবশালী সংগঠন ট্রাম্পের ঘোষণার নিন্দা করেছে। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে মার্কিন স্বীকৃতির সিদ্ধান্তটিকে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য ‘বিপজ্জনক’ বলে মনে করছেন ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস। ১৯ ডিসেম্বর জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে এক একান্ত বৈঠকে এই মত দেন তিনি। ফিলিস্তিনি-ইসরাইল সংঘাত নিরসনে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান নীতির প্রতিও জোর দেন এই দুই নেতা। সেই সময় ভ্যাটিকান সফরে থাকা জর্ডানি বাদশাহ আবদুল্লাহর সঙ্গে পোপের ২০ মিনিটের একান্ত বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে ভ্যাটিকানের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, এই দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। বিশেষ করে পবিত্র স্থানগুলোর হেফাজতকারী হিসেবে জেরুজালেম প্রশ্নে জর্ডানের হাশেমি রাজতন্ত্রের ভ‚মিকা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাদশাহ আবদুল্লাহর হাশেমি রাজবংশকে জেরুজালেমের মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর হেফাজতকারী বলে বিবেচনা করা হয়।

এদিকে আরব বিশ্বের অনৈক্যের সুযোগ নিয়েই ইসরাইলের আগ্রাসন চলছে। যার কারণে ফিলিস্তিনিরা ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এবার ট্রাম্পের ঘোষণার বিরোধিতা করছে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ সব রাষ্ট্র। কিন্তু এরপরও কী তারা একতাবদ্ধ হতে পারবে এ প্রশ্ন পর্যবেক্ষকদের মধ্যে। তবে মুসলিম বিশ্ব সবসময়ই অখণ্ড মনোভাব পোষণ করে এসেছে যে বিষয়ে সেটা হলো ফিলিস্তিনি ইস্যু। সিরিয়া নিয়ে তাদের মতভেদ থাকতে পারে, ইরাক নিয়ে তাদের মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, কিন্তু যখন ফিলিস্তিনের বিষয় আসে এবং বিশেষ করে পবিত্র স্থান জেরুজালেম প্রসঙ্গে তারা অভিন্ন অবস্থান নেয়। সামনের দিকে তাকাতে হলে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এর একটা প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যেতে পারে, যেখানে এই ইস্যুতে অভিন্নতা প্রধান হয়ে উঠতে পারে এবং একটা প্রতীকী পর্যায়ে মুসলিম বিশ্বের সংহতি আরও জোরালো করে তুলতে পারে। বিশেষ করে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে এবং তেল আবিব থেকে জেরুজালেমে আমেরিকা দূতাবাস সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে। এটা অবশ্য নতুন কোনো ইস্যু নয়। আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই, তাহলে আরেকটা ইন্তিফাদা যে হবে এটা ভাবা অযৌক্তিক কিছু নয়। হামাস ইতিমধ্যেই অভ্যুত্থানের ডাক দিয়েছে। মুসলিম দুনিয়ায় একটা বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল যে, একটা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের মধ্যে দিয়ে সমাধানের একটা পথ, একটা শান্তিপূর্ণ সমঝোতার পথ হয়তো তৈরি হয়েছে। কিন্তু অসলো চুক্তির ২৩ বছর পর আসলে কিছুই হয়নি। ওয়েস্ট ব্যাংক এবং জেরুজালেমে ৮ লাখ ইসরাইলি বসতি তৈরি হয়েছে। কাজেই ট্রাম্পের ঘোষণা সিদ্ধান্তের ফলে শান্তি প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধারের বদলে তার যে পুরোপুরিই মৃত্যু ঘটেছে এ ব্যাপারে এখন কারো মনেই যে আর সন্দেহ নেই সেটা বলা যায়। বিক্ষোভ করে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের সঙ্গে একাত্ম ৫৬টি মুসলমানপ্রধান দেশের ১৫ কোটি মানুষ, যা বিশ্বের জনসংখ্যার ২২ শতাংশের বেশি। কারণ মক্কা আর মদিনার পর জেরুজালেম তাদের সবার জন্য পবিত্র একটি স্থান। তবে আরব দেশগুলোর সরকারগুলোর মধ্যে নানা মতভেদ থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে আরব, ইরান অনৈক্য দিন দিন বাড়ছেই। আবার তাদের বিভাজন থেকেই পুরো বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর বিভেদ তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি ইস্যুতে হয়তো গণমানুষের একতা বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রগুলো একই ছাতার নিচে না এলে ইসরাইলি আগ্রাসন আর তার পক্ষে মার্কিন মদদ ঠেকানো অসম্ভব। মূলত এই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে ইহুদি রাষ্ট্রটি।

ট্রাম্পের ঘোষণা যেন ইসরাইলকে আরো উসকে দিয়েছে। এত দিন জোর গলায় না বললেও এখন ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন এবং দাবি করছেন, ‘গত ৩০০০ বছর ধরেই জেরুজালেম ইসরাইলের রাজধানী ছিল এবং এটি কখনোই আর কারো রাজধানী ছিল না।’

অবশ্য জাতিসংঘ জেরুজালেম ইস্যুতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর অবস্থানের সমালোচনায় কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণার পর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সিএনএনকে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার উদ্যোগকে ঝুঁকিতে ফেলছে। আর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পোপ ফ্রান্সিস। তিনি জেরুজালেমকে ইহুদি, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের ‘এক পবিত্র নগরী’ বলেও উল্লেখ করেছেন। তবে সবচেয়ে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। তিনি ট্রাম্পের ঘোষণার সমালোচনা করে বলেন, জেরুজালেমকে রাজধানী স্বীকৃতি দেওয়ার বিতর্কিত মার্কিন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লড়াই করা হবে। দখলদার ইসরাইলিরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এমনকি শিশুদের পর্যন্ত হত্যা করছে। এত গেল বিশ্বের বাক-বিতণ্ডা।

অন্যদিকে জেরুজালেমে দখলদারি বাড়িয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। ফিলিস্তিনিদের ইট-পাথরের প্রতিবাদ তারা চাপা দিচ্ছে কামান দাগিয়ে, বন্দুক চালিয়ে। অনেকটা অসহায় যেন ফিলিস্তিন নেতারাও। তবু তারা কঠোর বক্তব্য-বিবৃতি দিয়ে চলেছেন। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে ‘মহাঅপরাধ’ বলে মন্তব্য করেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ট্রাম্প ওই ঘোষণার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনের ঘোরতর লঙ্ঘন করেছেন বলে তার অভিযোগ। জেরুজালেম ইস্যুতে ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) ৫৭ মুসলিম সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত জরুরি সম্মেলনে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট এসব কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, ‘জেরুজালেম ফিলিস্তিনের রাজধানী আছে এবং সর্বদা থাকবে। জেরুজালেম যদি আমেরিকার শহর হতো তাহলে স্বীকৃতি দেওয়াটা বৈধ হতো। এ ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প সব সীমা অতিক্রম করেছেন।’ আব্বাস বলেন, ইসরাইলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করায় মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভ‚মিকা মেনে নেওয়া যায় না। জেরুজালেমকে রাজধানী ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভ‚মিকা থাকতে পারে না। জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী ঘোষণা ছাড়া কোনো শান্তি অথবা স্থিতিশীলতা আসবে না।

তবে নতুন একটি বছর এসেছে। ২০১৮ সালে যদি শান্তিময় একটি বিশ্ব পেতে চাই আমরা, তার জন্য অবশ্যই ফিলিস্তিনিদের সংকট নিরসনে পুরো বিশ্বকে মানবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এই প্রত্যাশাই কেবল করতে পারি আমরা। নতুন বছর সবার ভালো কাটুক।

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং প্রধান তথ্য কমিশনার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত