বিএসসির গোঁয়ার্তুমি জটিল করছে ব্যাংকে নিয়োগ

শরিফুল হাসান
 | প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:১০

দ‌েশের তরুণ‌দের স‌ঙ্গে তামাশায় মে‌তে‌ছে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটি। আমার ম‌নে হয় তারা শুধু একের পর ভুলই শুধু কর‌ছে না, চরম অপেশাদারিত্বেরও প‌রিচয় দি‌চ্ছে। আটটি সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র অফিসারের পরীক্ষা নি‌য়ে কথাগু‌লো বল‌ছি।

এর আ‌গে আমরা ব্যাংক নি‌য়োগ পরীক্ষায় বার বার প্রশ্নপত্র ফাঁস, অস্বীকার, প‌রে বা‌তিল, মামলা নানা কিছু দে‌খে‌ছি। ত‌বে বাংলা‌দে‌শের ব্যাংক খাতের সব‌চে‌য়ে বড় নি‌য়োগ নিয়ে যা হ‌চ্ছে ক‌য়েক‌টি কথা না বল‌লেই নয়। দীর্ঘ‌দিন যেহেতু সাংবাদিক হি‌সে‌বে নি‌য়োগ প্র‌ক্রিয়া নি‌য়ে লি‌খে‌ছি এবং এখ‌নো তরুণরা আমার সা‌থে যোগা‌যোগ ক‌রে সে পরিপ্রে‌ক্ষি‌তেই কথাগু‌লো।

সি‌নিয়র অফিসা‌রের ১৬৬৩টি শূন্য পদে নিয়োগের সম‌ন্বিত এই পরীক্ষা ১২ জানুয়ারি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদাল‌ত রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, কর্মকর্তা, কর্মকর্তা (ক্যাশ)-সহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিত ক‌রে‌ছে। কারণ খুব প‌রিষ্কার। ২৮জন প্রার্থী এক‌টি রিট ক‌রে‌ছেন। তা‌তে তারা বলেছেন, ২০১৬ সালে ওই তিন ব্যাংকের বিভিন্ন পদের জন্য তারা আবেদন করেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনো সেই পরীক্ষা না নি‌য়ে নতুন ক‌রে বিজ্ঞ‌প্তি দি‌য়ে সেই পরীক্ষা আগে নি‌চ্ছে।

এখা‌নে প্রথম ভুল হ‌লো, আগের প‌রীক্ষা আ‌গে না নেওয়া। দ্বিতীয় ভুল হ‌লো, আদাল‌ত রাষ্ট্রপক্ষকে বোঝা‌তে ব্যর্থ হ‌য়ে‌ছে কেন ১২ তা‌রিখের পরীক্ষা। তৃত‌ীয় ভুল হ‌লো, রা‌য়ের পর ১৬৬৩টি প‌দের বদ‌লে ত‌ড়িঘ‌ড়ি ক‌রে ৬৯২টি প‌দে পরীক্ষা নেওয়া। তৃত‌ীয় এই ভুল আরও অনেকগু‌লো ভু‌লের পথ তৈ‌রি করে‌ছে। এর ফ‌লে ব্যাং‌কের নি‌য়োগ পরীক্ষা আরও দীর্ঘসূত্রতায় পড়‌বে। এক মামলা আরও অনেক মামলার পথ তৈ‌রি কর‌বে।

বাংলা‌দেশ ব্যাংক বল‌ছে, আদাল‌তের আদেশ অনুয়ায়ী সোনালী ব্যাংক লিমিটেডে ৫২৭টি, জনতা ব্যাংক লিমিটেডে ১৬১টি, রূপালী ব্যাংক লিমিটেডে ২৮৩টিসহ মোট ৯৭১টি পদের নিয়োগ স্থগিত থাকবে। কিন্তু বা‌কি পাঁচ ব্যাংকের ৬৯২ পদের নিয়োগ পরীক্ষা হবেই।

আমার কা‌ছে বিষয়টা গোঁয়ার্তু‌মি ম‌নে হচ্ছে। কেউ য‌দি পেছ‌নে যান দেখ‌বেন প্র‌তিবার মামলা হ‌চ্ছে আ‌গের ভু‌লের কার‌ণে। আর গোয়ার্তু‌মি কোনো সমাধান নয়। প্রশ্নপত্র ফাঁ‌সের প‌রেও গোয়ার্তু‌মি কর‌তে গিয়ে জনতা ব্যাং‌কের লি‌খিত পরীক্ষা আট‌কে আ‌ছে। অগ্রণী ব্যাংকের পরীক্ষা ঠিকই বা‌তিল ক‌রে আবার নি‌তে হ‌য়ে‌ছে।

এরও আগে গে‌লে দেখ‌বেন ২০১৪ সালে পরীক্ষা নেওয়ার প‌রেও প্যানেল লিস্ট না দি‌য়ে আবার বিজ্ঞ‌প্তি দেওয়ায় রিট হয়। শুরু হয় বিবাদ। কিন্তু বিএসসি সব উপেক্ষা ক‌রে একের পর এক নি‌য়োগ বিজ্ঞপ্তি দি‌লে। এরপর শুরু হ‌লো রিট। আটকে গে‌ল একটার পর একটা প‌রীক্ষা। ২০১৫, ২০১৬ সা‌লের নি‌য়োগ এখ‌নো হয়‌নি। ২০১৮-তে হ‌বে কিনা তাও স‌ন্দেহ।

আ‌মি এই দীর্ঘসূত্রতা নি‌য়ে নিউজ ক‌রে‌ছিলাম যেখানে দে‌খি‌য়ে‌ছি সাত হাজার প‌দের বিপরীতে ২৬ লাখ আ‌বেদন প‌ড়ে আ‌ছে। লা‌খো তরুণের এই অপেক্ষা ক‌বে শেষ হ‌বে? এভা‌বে চল‌লে ২০২০ সা‌লেও সব নি‌য়োগ সম্ভব হ‌বে না। কারণ প্রি‌লি‌মিনা‌রি, লি‌খিত, মৌ‌খিকসহ নানা ধাপ র‌য়ে‌ছে।

এদি‌কে পু‌রোনো বিজ্ঞাপ‌নের পরীক্ষা না নি‌তে পার‌লেও নতুন ক‌রে আরেক কাজ কর‌ল বিএস‌সি। আ‌গের পরীক্ষা না নি‌য়ে শুরু হ‌লো সম‌ন্বিত বিজ্ঞাপন। লাখ লাখ আ‌বেদন পড়ল। কিন্তু ২০১৬ সা‌লে যা‌দের বয়স শেষ তারা তো আর ২০১৭ সা‌লে এসে আ‌বেদন কর‌তে পার‌ছে না। আবার পুরানো পরীক্ষাও হ‌চ্ছে না। ফ‌লে আবার শুরু রিট। এবার জ‌টিলতায় সম‌ন্বিত পরীক্ষা।

আচ্ছা ধ‌রেন এই ১২ তা‌রি‌খে য‌দি পাঁচ‌টি ব্যাংকের পরীক্ষা হ‌য়ে গে‌ল। এরপর য‌দি কেউ রিট ক‌রে সমন্বিত পরীক্ষা আলাদা নেওয়া আইনের পরিপন্থী তখন কী হ‌বে? কেউ য‌দি ব‌লে আ‌মি তো ১৬৬১টা প‌দের জন্য আ‌বেদন ক‌রে‌ছি। ৯৭১টা প‌দে কেন পরীক্ষা তখন কী হ‌বে? কারণ প্র‌বেশপ‌ত্রে প‌রিষ্কার লেখা আট‌টি ব্যাংকের পরীক্ষা। যারা ১২ তা‌রি‌খের পরীক্ষায় ফেল কর‌বে তারা য‌দি টাকা খরচ করে এই রিটের পেছ‌নে লে‌গে থা‌কে পু‌রো নি‌য়োগ আটকে যা‌বে যেকোনো সময়।

আবার ১২ তা‌রি‌খে যারা টিক‌ছে তারা য‌দি ব‌লে আমার আটটার জন্য একটা পরীক্ষা দেয়ার কথা। কা‌জেই আমি সোনালী, রুপা‌লি, জনতার জন্য কেন পরীক্ষা দেব? আবার প‌রের তিনটায় ফেল করা কেউ বল‌তে পারে আমি আগেরটায় টিক‌ছি, যে‌হেতু একটা পরীক্ষার কথা কা‌জেই আমাকেও পাস দেখা‌তে হ‌বে তখন কী হবে? সব‌মি‌লি‌য়ে তৈ‌রি হ‌বে দীর্ঘসূত্রতা।

শুধু সি‌নিয়র অ‌ফিসার নয়, এর আগে বিভিন্ন সময়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে সোনালী, রূপালী এবং জনতা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার, সাধারণ অফিসার এবং ক্যাশ অফিসার পদের সবগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রয়েছে। কবে নাগাদ আবার প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবো তাও জা‌নে না বিএসসি। এক‌দিকে ব্যাংকগু‌লো‌তে জনবল সংকট আরেকদিকে তরুণরা চাকরিব‌ঞ্চিত।

আমার কা‌ছে ম‌নে হ‌চ্ছে, বিএসসি তাদের অহমিকা আর গোঁয়ার্তুমি দেখাতে গি‌য়ে ভু‌লের চ‌ক্রে পড়‌ছে। এর সাথে য‌দি যুক্ত ক‌রি প্রশ্নপত্র ফাঁস, হলগু‌লোর ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা, এক ক‌ক্ষে অনেক পরীক্ষার্থ‌ী ব‌সি‌য়ে পরিবেশ নষ্ট করা তাহলে বল‌তেই হয় বিএসসি বাংলা‌দেশের চাকুরিপ্রার্থী লাখ লাখ তরু‌ণের সা‌থে উপহাস করছে। আর যা‌কে তা‌কে পরীক্ষার দা‌য়িত্ব দি‌য়ে রা‌ষ্ট্রের কো‌টি টাকা খরচতো আ‌ছেই।

আপনারা প্রশ্ন কর‌তে পা‌রেন সমাধান কী? সেই সমাধান দেওয়ার আগে আরও একটা সমস্যার কথা ব‌লি। ব্যাংক নি‌য়ো‌গে আরেক সমস্যা কোটা। মুক্তি‌যোদ্ধার সন্তান, আ‌দিবাসী কোটায় প্রার্থী পাওয়া যায় না ব‌লে বহু পদ খা‌লি রাখ‌তে হয়। পিএসসি কোটা শি‌থীল কর‌লেও বিএস‌সি কোটা শি‌থি‌লের প্রস্তাব কে‌বিনে‌টে পাঠা‌তে পার‌ছে না। অথচ সেটা জরুরি।

এবার সমাধা‌নে আসি। সমস্যা সমাধা‌নে সবার আগে প্র‌য়োজন বিএসসির সংস্কার। সবার আগে প্র‌য়োজন বিএসসির সংস্কার। কারও নাম উল্লেখ কর‌ছি না কারণ গীবত আমার অপছন্দ। ত‌বে সাংবা‌দিক হি‌সে‌বে আ‌মিই প্রথম বিএস‌সি‌কে গণমাধ্য‌মে আ‌নি। বে‌শিরভাগ সাংবা‌দিক সেখানকার নী‌তি নির্ধারক‌দের নম্বর নি‌য়ে‌ছেন আমার কাছ থে‌কে।

আমার খুব কাছ থে‌কে দেখার অভিজ্ঞতায় ম‌নে হ‌য়ে‌ছে সেখানকার নী‌তি নির্ধারক যারা আ‌ছেন তারা সৎ হ‌তে পা‌রেন কিন্ত‌ চরম অপেশাদার এবং গোয়ার। নি‌জে‌দের ভুল তারা কখ‌নোই স্বীকার কর‌তে চায় না। তারা বুঝতে চায় না ব্যাংকার হওয়া এক কথা আর নি‌য়োগ পরীক্ষা নেওয়া আ‌রেক কথা। কা‌জেই সবার আ‌গে সেখানকার নী‌তি নির্ধারণী পর্যা‌য়ে সংস্কার দরকার।

‌বিএসসি সংস্কা‌রের পর দ্বিতীয় যে কাজ‌টি কর‌তে হ‌বে আদালত, সব ব্যাংক এবং প্র‌য়োজ‌নে পরীক্ষার্থী‌দের সাথে কথা ব‌লে সবার কা‌ছে গ্রহণ‌যোগ্য একটা সমাধা‌নে যে‌তে হ‌বে। বিএসসি‌কে বল‌ব পিএসসি বি‌শেষ ক‌রে প্র‌তিষ্ঠান‌টির চেয়ারম্যান সা‌দিক স্যার তাঁর ঐকা‌ন্তিক প্র‌চেষ্টা ও সম‌ন্বিত উদ্যোগ নি‌য়ে কীভা‌বে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করার পাশাপা‌শি সা‌ড়ে তিন লাখ ছে‌লে‌মে‌য়ের পরীক্ষা এক সা‌থে কীভা‌বে সুষ্ঠুভা‌বে নেওয়া যায় সেটা শিখতে পা‌রে।

সব‌চেয়ে ভা‌লো হ‌তো ‌বিএসসি য‌দি পিএসসি হয়ে যে‌তে। কিন্তু সেটা যে‌হেতু হচ্ছে না বিএস‌সির কা‌ছে অনু‌রোধ সব পরীক্ষাগু‌লোর দা‌য়িত্ব পিএসসি‌কে দি‌তে পা‌রেন। তা‌তে অন্তত ব্যাংকে নি‌য়ো‌গে‌র না‌মে যে জ‌টিল সমস্যা হ‌চ্ছে সেখান থে‌কে মু‌ক্তি পা‌বে তারুণ্য।

লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত