বঙ্গবন্ধুর দেশে ফেরা: রূপোলী ডানায় মুক্ত রদ্দুর

হাবিবুল্লাহ ফাহাদ
| আপডেট : ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ১৭:০৭ | প্রকাশিত : ১০ জানুয়ারি ২০১৮, ১৬:৪৪

যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পর পাকিস্তানের মানুষ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ওপর চড়াও হয়। তারা ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু করে। জনরোষে টিকতে না পেরে ১৯ ডিসেম্বর রাতে প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়েন ইয়াহিয়া। ২০ ডিসেম্বর পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে এসেও ইয়াহিয়া চেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে অন্যায়ভাবে ফাঁসিতে ঝুলাতে। বাংলাদেশকে অভিভাবকহীন করতে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে তার সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে যায়।

দেশ স্বাধীনের পর সাড়ে সাত কোটি বাঙালি প্রাণপ্রিয় বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পেতে মরিয়া হয়। আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ে। পরে ১৯৭২ সালের ৩ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে বিনা শর্তে মুক্তির ঘোষণা দেয় ভুট্টো। সেদিন রাতে বিবিসির খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো করাচিতে এক জনসভায় বক্তৃতা করার আগে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু তাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আমি কি মুক্ত?’।

জবাবে ভুট্টো বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনি মুক্ত, আপনি যেখানে ইচ্ছা যেতে পারেন।’ ওইদিন করাচির জনসভায় বক্তৃতাকালে ভুট্টো উপস্থিত শ্রোতাদের কাছে জানতে চান, তারা কি শেখ মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে একমত কি না? জবাবে জনতা একবাক্যে বলে ওঠে, ‘আমরা একমত।’ ভুট্টো বলেন, ‘আমি এখন বিরাট ভারমুক্ত হলাম। শেখ মুজিবকে বিনাশর্তে মুক্তি দেওয়া হবে।’

এরপরও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে গড়িমসি করা হয়। এই টালবাহানা সহ্য করবে না বলে বাংলাদেশ সরকার ভুট্টোকে হুঁশিয়ারি করে দেয়। পরে ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে করে লন্ডনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে, আমি বেঁচে আছি। আমি সুস্থ রয়েছি।’ তখন তাঁর পরনে ছিল একটা সাদা খোলা শার্ট ও ধূসর রঙের স্যুট। পরে ওখান থেকে লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারা তাঁকে ‘ক্লারিজেস’ হোটেলে থাকার জন্য নিয়ে যায়।

১০ জানুয়ারি বিশে^র নিপীড়িত মানুষের বিশ^স্ত মুখপাত্র বঙ্গবন্ধু রয়াল এয়ার ফোর্সের একটি ‘কমেট’ বিমানে করে লন্ডন থেকে নয়াদিল্লিতে আসেন। সেখানে পালাম বিমানবন্দরে ভারতীয় রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও অন্যান্য মন্ত্রী ও উচ্চপদের কর্মকর্তা এবং ২৪ জনের বেশি-বিদেশি কূটনীতিক তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। পরে দিল্লির প্যারেড গ্রাউন্ডে তিনি এক বিশাল জনসমাবেশে বাংলায় হৃদয়ছোঁয়া ভাষণ দেন।

ওইদিন দুপুর ১টা ৪১ মিনিটে দেশের মাটিতে পা রাখেন জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁকে এক নজর দেখার জন্য লাখো মানুষ পায়ে হেঁটে জড়ো হয়েছিল বিমানবন্দরে। বঙ্গবন্ধু সাধারণ বাঙালির চেয়ে বেশ লম্বা ছিলেন। মুখে পুরু গোঁফ। পঞ্চাশ পার হওয়া চুলে কাঁচা-পাকা রঙ। বোতাম-আঁটা উঁচু কলারের কালো রঙের স্যুট পরনে ছিল সেদিন।

পরদিন ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় লেখা হয়- ‘রূপোলী ডানার মুক্ত বাংলাদেশের রদ্দুর। জনসমুদ্রে উল্লাসের গর্জন। বিরামহীন করতালি, স্লোগান আর স্লোগান। আকাশে আন্দোলিত হচ্ছে যেন এক ঝাঁক পাখি। উন্মুখে আগ্রহের মুহূর্তগুলো দুরন্ত আবেগে ছুটে চলেছে। আর তর সইছে না। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসেছেন রক্ত¯œাত বাংলার রাজধানী ঢাকা নগরীতে দখলদার শক্তির কারা প্রাচীর পেরিয়ে।’

মানুষের উত্তাল সাগর সাঁতরে চার ঘণ্টায় রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছান বঙ্গবন্ধু। পঞ্চাশ লাখের বেশি মানুষের এসেছিল সমাবেশে। জাতির জনক সেদিন মানুষের দিকে তাকিয়ে শিশুর মতো কেঁদে ফেলেন। কান্না ভেজা কণ্ঠে মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন তিনি। বলেনÑ“...পাকিস্তানের কারাগারে বন্দিশালায় থেকে আমি জানতাম, তারা আমাকে হত্যা করবে। কিন্তু তাদের কাছে আমার অনুরোধ ছিল, আমরা লাশটা তারা যেন বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেয়, বাংলার পবিত্র মাটি আমি পাই। আমি স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলাম, তাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে বাংলার মানুষদের মাথা নিচু করব না। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘সাত কোটি সন্তানের হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।’
কিন্তু আজ আর কবিগুরুর সে কথা বাংলার মানুষের বেলায় খাটে না, তাঁর প্রত্যাশাকে আমরা বাস্তবায়িত করেছি। বাংলাদেশের মানুষ বিশে^র কাছে প্রমাণ করেছে, তারা বীরের জাতি, তারা নিজেদের অধিকার অর্জন করে মানুষের মত বাঁচতে জানে।”

বঙ্গবন্ধু ভারত সরকারকে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কারণে কৃতজ্ঞতা জানান। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান। বলেন, ‘গত ৭ মার্চ এই রেসকোর্স ময়দানে আমি আপনাদের বলেছিলাম, ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলুন। এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রামÑএবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ সেই স্বাধীনতা এনেছেন। আজ আবার বলছি, আপনারা সবাই একতা বজায় রাখুন। ষড়যন্ত্র এখনও শেষ হয়নি। আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। একজন বাঙালির প্রাণ থাকতেও আমরা এই স্বাধীনতা নষ্ট হতে দেব না। বাংলাদেশ ইতিহাসে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই টিকে থাকবে। বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে পারে, এমন কোনো শক্তি নেই।”
বিশ^বাসীকে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে জাতির জনক বলেন, ‘আজ সোনার বাংলার কোটি কোটি মানুষ গৃহহারা, আশ্রয়হারা। তারা নিঃসম্বল। আমি মানবতার খাতিরে বিশ^বাসীর প্রতি আমার এই দুঃখী মানুষদের সাহায্য দানের জন্য এগিয়ে আসতে অনুরোধ করছি। নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি, আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, তা হলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবেÑপূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে। আমাদের রাস্তাঘাট ভেঙে গেছে, সেগুলো মেরামত করতে হবে। আপনারা নিজেরাই সেসব রাস্তা মেরামত করতে শুরু করে দিন। যার যা কাজ, ঠিকমত করে যান। কর্মচারীদের বলছি, আপনারা ঘুষ খাবেন না। এদেশে আর কোনো দুর্নীতি চলতে দেওয়া হবে না।’ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানান। জাতিসংঘের সদস্য করার ব্যাপারেও সাহায্য চান।
লেখক: সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

[ লেখকের প্রকাশিতব্য- ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’ বইয়ের অংশবিশেষ। ২০১৮ সালের একুশে বইমেলায় ‘বিদ্যাপ্রকাশ’ থেকে বইটি প্রকাশ হতে যাচ্ছে।]

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত