‘ভারতের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ অযৌক্তিক নয়’

প্রকাশ | ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ১৯:৫৩ | আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০১৮, ২০:০৪

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকাটাইমস

কলকাতা হাইকোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী অরুণাভ ঘোষ বলেছেন, এত বছর আইন-আদালত নিয়ে রয়েছি, এমন পরিস্থিতি কখনও দেখিনি। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সবচেয়ে সিনিয়র পাঁচ বিচারপতির মধ্যে চারজন একত্রে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকলেন, দেশের প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অস্বচ্ছ কার্যকলাপের অভিযোগ তুললেন। ভারতের বিচার বিভাগের ইতিহাসে এই ঘটনার নজির আর নেই।

তিনি আরো বলেছেন, বিচারপতি চেলামেশ্বর, বিচারপতি কুরিয়েন, বিচারপতি গগৈ এবং বিচারপতি লোকুর যা বলেছেন, তা খুব অযৌক্তিক নয়। আমার নিজের উপলব্ধিও এই রকমই। সুপ্রিম কোর্টে ইদানিং যেন সব কিছু ঠিকঠাক চলছে না। ভারতীয় বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পীঠস্থানটার প্রশাসনেই যেন গলদ।

‘বেশ কিছু মামলার রায় দেখে আশ্চর্য হতে হচ্ছে আজকাল। যারা রায় দিচ্ছেন, তারা যেন মামলার বিষয়বস্তুই ঠিক মতো বুঝতে পারেছেন না। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, যে বিষয়ে মামলা, সেই বিষয়ে জ্ঞানের অভাব রয়েছে সংশ্লিষ্ট বিচারপতিদের।’

‘কোনও আইনজ্ঞ বা কোনও বিচারকের পক্ষেই সব রকম আইনের বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব নয়। যিনি আইনের যে দিকটা ভালো বোঝেন, তার এজলাসে সেই সংক্রান্ত মামলা যাবে, এমনটাই কাম্য। কিন্তু সেসব বিচার-বিশ্লেষণ যেন আজকাল উঠেই গিয়েছে। ফলে অনেক মামলার রায়ই সন্তোষজনক হচ্ছে না। বাংলার অধ্যাপককে যদি পদার্থবিদ্যার খাতা পরীক্ষা করতে দেয়া হয় বা চক্ষু বিশেষজ্ঞকে যদি স্নায়ুর জটিল রোগের চিকিৎসা করতে বলা হয়, তা হলে যেমন বিপর্যয়ের আশঙ্কা থাকে, বেশ কিছু মামলার রায়েই তেমন বিপর্যয়ের ছায়া। এই ধারা বজায় থাকলে বিচার বিভাগের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাবে’- অরুণাভ বলেন।

আইনজীবী অরুণাভের কথায়, ‘বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান সুপ্রিম কোর্ট যেভাবে চলছে, তাতে সুপ্রিম কোর্টের উপরে সাধারণ মানুষের আস্থা কমুক বা না কমুক, খোদ বিচারপতিদের আস্থা যে কমেছে, সেটা খুব স্পষ্ট হয়ে গেল। সবচেয়ে প্রবীণ পাঁচ বিচারপতির মধ্যে চারজনই জানালেন, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে সব কিছু ঠিকঠাক চলছে না। এভাবে চললে দেশে গণতন্ত্র বাঁচবে না, এমন মন্তব্যও তারা করলেন। খুব স্পষ্ট করেই চার বিচারপতি জানালেন, প্রধান বিচারপতির ওপর তাদের আস্থা নেই। এই ঘটনা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। এতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আস্থা বা ভরসা ধাক্কা তো খাবেই। সুপ্রিম কোর্ট সম্পর্কে মানুষের মনে যে শ্রদ্ধা-সম্ভ্রম রয়েছে, তাও কমবে।’

‘চার জ্যেষ্ঠ বিচারপতির যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরে একাংশের ধারণা হয়েছে যে, এ বার প্রধান বিচারপতি পদ থেকে বিচারপতি দীপক মিশ্রের ইমপিচমেন্ট অর্থাৎ অভিশংসন ঘটানো হবে। এই ধারণা কিন্তু ভ্রান্ত। অভিশংসন অনেক দীর্ঘ একটা প্রক্রিয়া। আর অভিশংসনের মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি’- বললেন অরুণাভ।

কলকাতা হাইকোর্টের অভিজ্ঞ আইনজীবী অরুণাভ ঘোষ আরো বলেন, ‘বিচারপতি চেলামেশ্বরকেও সাংবাদিক সম্মেলনে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, প্রধান বিচারপতির অভিশংসন হবে কি না। তিনি সবিনয়ে জানিয়েছেন, এ প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই, এ সিদ্ধান্ত জাতিকে নিতে হবে। আসলে অভিশংসনের সিদ্ধান্ত সংসদে হয় সুপ্রিম কোর্টে বা অন্যত্র নয়।’

প্রধান বিচারপতির প্রশাসনিক ভূমিকার প্রতি চার বিচারপতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন ঠিকই। কিন্তু মনে রাখতে হবে, তারা প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত দুর্নীতির কোনও অভিযোগ সরাসরি তোলেননি। অতএব, ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কোনও সম্ভাবনা এখনই দেখতে পাচ্ছেন না বলে তিনি জানান।

‘প্রধান বিচারপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া খুব সহজও নয়। লোকসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাশ করাতে হয় অভিশংসন প্রস্তাব। তারপর রাজ্যসভায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাশ করাতে হয়। রাজ্যসভায় আটকে গেলে, যৌথ অধিবেশন ডেকে ফের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রস্তাব পাশ করাতে হয়। সংসদে যে পরিমাণ গরিষ্ঠতা এখনকার শাসকদের রয়েছে, তাতে সরকার চাইলে অভিশংসন অসম্ভব নয়। তবে সরকার তেমন কিছু ভাবছে বলে মনে হয় না।’

অরুণাভ বলেন, ‘দৃশ্যপটটা যে রকম দাঁড়াল, তাতে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং কর্তৃত্বকামী রাজনীতিকদের সুবিধা হলো। এ দেশে রাজনৈতিক স্বৈরাচার বার বারই সবচেয়ে বড় বাধার সম্মুখীন হয় বিচার বিভাগের তরফ থেকে। রাজনীতিকদের বা ক্ষমতাশালীদের দুর্নীতি এবং স্বৈরাচার থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করে আদালতই। এ বার আদালতের সেই কর্তৃত্ব দুর্বল হবে। শীর্ষ আদালতের সর্বোচ্চ মহলে পারস্পরিক অনাস্থা এবং মতানৈক্যের যে ছবি প্রকট হলো, তার সুযোগ এক শ্রেণির রাজনীতিক অবশ্যই নিতে চাইবেন। সেটা দেশের জন্য খুব একটা কল্যাণকর হবে না।’

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা

(ঢাকাটাইমস/১২জানুয়ারি/এসআই)