বাহাদুর শাহ পার্ক

উপনিবেশের নীরব সাক্ষী আজ মৃত প্রায়

মনিরুজ্জামান সাইফ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:২৮ | প্রকাশিত : ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, ০৮:৪৫

এখানে মানুষ আসে সকাল ও বিকাল দুবেলা হাঁটতে। কেউ আবার একটু ফাক পেলে এসে বসে থাকে পার্কেরই কোথাও। হাটুক কিংবা বসুক, নাগরিক জীবনের শত রূঢ় বাস্তবতার ক্লান্তি ও অবসাদ কাটাতে একটু স্বস্তির জন্য বাহাদুর শাহ পার্কে তাদের আগমন। যাবার আর তেমন জায়াগাও বাকি নেই এ কংক্রিটের জঞ্জালে ঘেরা শহরে। তাই পুরান ঢাকার মানুষের জন্য একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার জায়গা এক চিলতে এই পার্কটি।

পার্কের ইতিহাস বেশ পুরোনো। উপমহাদেশের উপনিবেশিক ইতিহাসের সাথে এর সম্পর্ক মেলদিনের। আঠারো শতকের শেষের দিকে এখানে ঢাকার আর্মেনীয়দের বিলিয়ার্ড ক্লাব ছিল। স্থানীয়রা এর নাম দিয়েছিল ‘আন্টাঘর’। দেখতে অনেকটা ডিমের মতন বলে বিলিয়ার্ড বলকে স্থানীয়রা ‘আন্টা’ বা ডিম নামে ডাকতো। সেখান থেকেই এসেছে ‘আন্টাঘর’ কথাটি। ক্লাব ঘরের সাথেই ছিল একটি মাঠ বা ময়দান যা ‘আন্টাঘর ময়দান’ নামে পরিচিত ছিল। ১৮৫৮ সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার পর এই ময়দানেই এ সংক্রান্ত একটি ঘোষনা পাঠ করে শোনান ঢাকা বিভাগের কমিশনার। সেই থেকে এই স্থানের নামকরণ হয় ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’। ১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত পার্কটি ‘ভিক্টোরিয়া পার্ক’ নামেই পরিচিত ছিল। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এক প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ শাসকেরা ফাঁসি দেয় অসংখ্য বিপ্লবী সিপাহিকে। তারপর জনগণকে ভয় দেখাতে সিপাহীদের লাশ ঝুলিয়ে দেয়া হয় গাছের ডালে। ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে পার্কের নামকরণ করা হয় ‘বাহাদুরশাহ পার্ক’।

পার্কটির আকার অনেকটা ডিমের মতন গোল। চারদিক লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা। পূর্ব এবং পশ্চিম পাশে দুটো গেট রয়েছে। পার্কটির ভেতরে রেলিংয়ের পাশ দিয়ে পাকা রাস্তা করা হয়েছে। এর চারপাশে সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাসহ বেশ কিছু স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থাকার কারণে এটি পুরানো ঢাকার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে বিবেচিত হয় এখনো। পার্কের উত্তর পাশে রয়েছে সাধু থোমার চার্চ। এক কালে এই চার্চ থেকে ভেসে আসতো ঘন্টার শব্দ। পার্কে যারা ঘুরতে আসতেন তাদের কেউ কেউ ঘুম থেকে উঠতেন সেই ঘন্টার শব্দ শুনেই। তার পাশেই ঢাকার প্রথম পানি সরবরাহ করার জন্য তৈরি ট্যাংক। উত্তর-পূর্ব কোনে আছে ঢাকার অন্যতম পুরানো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং ইসলামিয়া হাই স্কুল। পূর্ব পাশে রয়েছে ঢাকার অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয় সরকারি মুসলিম স্কুল, দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে রয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। পার্কের ঠিক উত্তর পশ্চিম পাশেই রয়েছে ঢাকার জজ কোর্ট। এছাড়া বাংলাবাজার, ইসলামপুর, শাখারীবাজারের মত ঢাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু জায়গা রয়েছে এই পার্কটির চারদিকে।

যদিও বতর্মানে এই বাহাদুরশাহ পার্কে স্বাস্থ্য সচেতন নগরবাসীর জন্য ঘুরতে আসাটাই এক দুষ্কর কাজ। কেননা পার্কটির চারপাশে গাড়ি  পার্ক করে রাখা হচ্ছে ক্রমাগত। আশে পাশেই রয়েছে ময়লা জড়ো করবার বড় বড় কন্টেইনার। এসব কন্টেইনার ক্রমাগত দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরা পার্কটির পূর্বে এবং পশ্চিম পাশে দুটো প্রধান ফটক থাকলেও পশ্চিম পাশের ফটকটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ এ ফটকের সামনে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান।

সব মিলিয়ে পার্কটির বর্তমান অবস্থা বেশ করুণ। অথচ এরকম ঐহিহ্যবাহী একটি স্থানের যথার্থ সংরক্ষণ খুবই দরকার ছিলো।

এখানকার বাসীন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায় পার্কটির রক্ষনাবেক্ষনে কখনোই খুব একটা উদ্যোগী ছিলো না কর্তৃপক্ষ। তারা জানান এক রকম অবহেলার শিকার হয়েই এই পার্কটির বর্তমানে এমন করুণ দশা। ঠিকঠাক পরিচর্যা না পেলে সামনের দিনগুলোতে হয়তো আর দেখতে পাওয়া যাবে না উপনিবেশ কালে সাক্ষী হয়ে থাকা বাহাদুরশাহ পার্কের অনেক স্মৃতিচিহ্নকেই।

(ঢাকাটাইমস/১৩ জানুয়ারি/এমএস/কেএস)
 

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত