কেমন পুলিশ চাই

তায়েব মিল্লাত হোসেন
 | প্রকাশিত : ১৭ জানুয়ারি ২০১৮, ১৩:০৫

সৈনিক হিসেবে চাকরিজীবন শুরু। মেজর জেনারেল হিসেবে অবসরে। এই নজির আছে বাংলাদেশেই। বিদায়ী বছরের শেষান্তে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মইনুল ইসলাম। বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে এমন উপমা আরো বেশি। ছোট পদ থেকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হয়েছেন অনেকেই। আবার কাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই পদ কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। জীবনবাজি রেখে কাজ করলে মিলতে পারে অনেক বড় পুরস্কারও। এবারের পুলিশ সপ্তাহে পদস্থ অনেক কর্মকর্তা পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মান তথা বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)। ৩০ জনের সেই তালিকায় কিন্তু পাঁচজন কনস্টেবল নাম উঠাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদেরই একজন মো. পারভেজ মিয়া। তো কী এমন কাজ করেছেন, যার জন্য এক্কেবারে সর্বোচ্চ সম্মান পেয়ে যাবেন- এমন প্রশ্ন নিয়ে ভ্রু কুঁচকাতে পারেন অনেকেই।

পারভেজের অবদান জানতে হলে ফিরতে হবে গেল বছরের জুলাই মাসে। ৭ জুলাই শুক্রবার বেলা ১১টা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গৌরীপুর। প্রায় অর্ধশত যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর যাচ্ছে ‘মতলব এক্সপ্রেস’ নামে বাস। আকস্মিক নিয়ন্ত্রণ হারায় । চলে যায় পাশের ডোবায়। তখনি দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার কনস্টেবল পারভেজ সেখানে লাফিয়ে পড়েন। লহমায় ভাঙেন বাসের জানালার কাচ। যা দিয়ে বেরিয়ে আসে যাত্রীরা। ডুব দিয়ে দিয়ে আপন হাতে পারভেজ বের করে আনেন সাত মাস বয়সী এক শিশু আর পাঁচ নারীসহ অন্তত ১২ জনকে। তার হাত ধরেই জীবন ফিরে পায় অর্ধশত মানুষ। এরপর গণমাধ্যমের কল্যাণে অসীম সাহসী পারভেজের নাম ছড়িয়ে যায় পুরো দেশে। একের পর এক পুরস্কার পান। সবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে পান পুলিশের সর্বোচ্চ সম্মান বিপিএম।

এই প্রাপ্তির পর কনস্টেবল পারভেজ ফিরে গেছেন তার কর্তব্যে। কর্মস্থল এখন রাজধানী ঢাকার উত্তরায় হাইওয়ে পুলিশের হেড কোয়ার্টার্সে। এই সময় থেকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয় তার সঙ্গে।

-অভিনন্দন পারভেজ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুরস্কার পেলেন। আপনার অনুভূতি কী?

-অনুভূতি ভালো। তবে কিছু পাওয়ার আশা করে কাজ করি না। মানবসেবার চাকরি করি, এইটাই বড় বিষয়।

আসলেই তো পুলিশের কাজ জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর চেয়ে বড় মানবসেবা আর কী হতে পারে। তবে সকলেই পারভেজ নন। কেউ কেউ পারভেজ। তাই পুলিশের ভেতরেও বিপথগামীদের একটা অংশ আছে। এরা আবার বহুরৈখিক। কেউ টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের ছাড় দেন। কেউ ক্ষমতা খাটিয়ে গাড়ি-বাড়ি হাতান। কেউ বা বগলদাবা করতে চান অন্য কিছু। তবে পুলিশি মেজাজ দিয়ে আর যাই হোক কারও মন জয় করা যায় না। পুলিশ সপ্তাহে বিষয়টি নিয়ে অনেকটা সতর্ক-সংকেত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৯ জানুয়ারি নিজ দপ্তরে তিনি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বলেন, ‘আগে একটা কথা ছিলÑ বাঘে ধরলে এক ঘা, পুলিশে ধরলে ১৮ ঘা। সেই প্রবাদ বাক্য যেন মিথ্যা প্রমাণিত হয়।’

‘জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস পুলিশ অর্জন করবে। মানুষ যেন মনে করে, হ্যাঁ, পুলিশ আমাকে সাহায্য করবে, আমার পাশে আছে, আমার একটা ভরসার স্থান। সেই জায়গাটা অর্জন করতে হবে, সেই বিশ্বাসটা গড়তে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর এই বাণী যেদিন পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে সেদিনই মানবসেবার চাকরি হিসেবে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকবে পুলিশের কাজ।

পুলিশে কেন রাজনীতির প্রভাব?

জানুয়ারি ৫ এলে এক ধরনের অন্তর্দাহ তৈরি হয় বিএনপি নেতাদের মধ্যে। চার বছর আগের এমনি দিনে তারা দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে। তা ঠেকানোর জন্য ‘জ্বালাও-পোড়াও’ সহিংস কর্মসূচি হাতে নেয়। তবু নির্বাচন হয়ে যায়। আওয়ামী লীগ টানা দ্বিতীয়বারের মতো রাষ্ট্র পরিচালনায় আসে। তারপর বছর দুই দিনটি এলে আন্দোলনের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি। রাজপথেও তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এর পেছনে তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা স্পষ্ট। সরকারের বাইরে থেকেও জনসম্পৃক্ত হতে না পারার অমোচনীয় অকৃতকার্যতা রয়ে গেছে। তবে এসব নিয়ে তারা সেভাবে মাথা ঘামায় না। তাদের কাছে যত দোষ নন্দ ঘোষের মতো সেই দোষী শুধু বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী। সেই ইঙ্গিত দিয়ে গেল ৫ জানুয়ারি সামনে রেখে ৪ জানুয়ারি বেগম খালেদা জিয়া টুইট করেন, ‘বিশ্ব দেখল ব্যালট নয়, বুলেটই হাসিনার ক্ষমতার উৎস।’

ঠিক আছে মেনে নিতে দ্বিধা নেই যে, হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার। অবরোধ গণতান্ত্রিক অধিকার। এই কর্ম দিতে চাইলে নিজেরা দিন। পালন করুন। কিন্তু আরেকজনের উপর চাপিয়ে দেওয়া কিন্তু গণতান্ত্রিক হতে পারে না। সফল হরতালের নামে ‘বোমা মারো, ককটেল ফাটাও, গাড়ি জ্বালাও, রেললাইন উপড়াও’ এ ধরনের হিংস্র আচরণ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এগুলো মেনে নিতে নারাজ জনসাধারণ। তাই তো এগিয়ে আসতে হয় রাষ্ট্রকে। মাঠে নামতে হয় পুলিশকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় থাকে, তবে তাদের এক ধরনের প্রভাব পুলিশে থাকবেই। কারণ জনগণের নিরাপত্তার ভার তো সেই সরকারি দলের হাতেই। কোনো অঘটন হলেই তো অভিযোগের আঙুল সবার আগে সরকারি দলের দিকে উঠে। তাই তাদের ইশতেহার মতো পুলিশকে চলতে হবে। বলতে হবে। তাই তো পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘আপনার সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত ও পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই ২০১৩ সালের হেফাজতি তাণ্ডব, ১৪ ও ১৫ সালের নজিরবিহীন বোমা সন্ত্রাস এবং ১৬ ও ১৭ সালে জীবনবাজি রেখে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে কঠোরভাবে দমন করতে সক্ষম হয়েছি।’

উগ্রতা, সহিংসতা অবশ্যই বাংলাদেশ পুলিশকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। কিন্তু পুলিশের কেউ যদি সরকারের বাইরে থাকা দলের কাউকে অযথাই হেনস্তা করে, হয়রানি করে- তা মেনে নেওয়া যায় না। যা করতে হয়ে নিয়মের মধ্যে করতে হবে, আইনের মধ্যে করতে হবে। নীতি- নৈতিকতা মেনে করতে হবে। এই শতকের গোড়ায় এই দেশের জোট সরকার কিন্তু তার ধার ধারেনি। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় কিংবা ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আমরা দেখেছি কিভাবে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর গুরুদায়িত্বে থাকা কিছু ব্যক্তিকে কিভাবে অপরাধীদের সহচরে পরিণত করা হয়েছে। পুলিশকে এই ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতেই হবে এবং তাদের নিজেদেরও থাকতে হবে।

প্রয়োজন হাজার কোটি টাকা...

সততার ঘাটতি আমাদের সমাজেই। পুলিশও তার বাইরে নয়। তাই এই বাহিনীতেও অসৎ মানুষ আছে। সৎ যারা কাজ করতে চান, তাদেরও নানা সীমাবদ্ধতায় পড়তে হয়। প্রয়োজন তাই পুলিশের উন্নয়ন। কিন্তু টাকার অভাবে পুলিশের উন্নয়নের অনেক প্রকল্প ঝুলে আছে। এই তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজি) এ কে এম শহীদুল হক। এগুলো এগিয়ে নিতে তিনি প্রতি বছর এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন সরকারের কাছে। ৯ জানুয়ারি রাতে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে রাজারবাগ পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে মাঠ পর্যায়ে কর্মরত ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও সচিবদের মতবিনিময় সভা হয়। এই সুযোগে নিজেদের দাবি-দাওয়া পেশ করেন আইজিপি। সেখানে তার ভাষ্য, ‘আমাদের কিছু বাজেট দেওয়া হয়। উন্নয়নের বাজেট পাই বছরে মাত্র ৪০০ কোটি টাকা। আমাদের যে এতগুলো প্রজেক্ট সে প্রজেক্টগুলো শুরু করে শেষ করতে পারি না। বাজেটে হয় না, শুরু করলাম, এরপর দেড় বছর তিন বছর লেগে যায়।’ তিনি অনুরেধের সুরে বলেন, কাজের টেন্ডার দ্রæত অনুমোদন, দ্রæত বাজেটের অর্থ ছাড় দেওয়া উচিত। এখনো রাজধানী ঢাকার ৪৯টি থানার ১৫টি ভাড়া বাসায় আছে। আগামীতে যাতে পুলিশের সক্ষমতা ও দক্ষতা বাড়ানো যায় সেজন্য সবার সহায়তা চান তিনি।

নিয়োগেই গণ্ডগোল!

দুই বছর আগের ঘটনা। ২০১৬ সাল। কিশোরগঞ্জ শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ। লাখো মানুষ নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আচমকা শব্দ। গুলশান হামলার রেশ না কাটতেই ঈদের সকালে শোলাকিয়ায় পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা। গোলাগুলিতে চারজন নিহত। এর মধ্যে দুজন কনস্টেবল। সেই গোলাগুলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল হয়। সেখানে মনে হয় যেন রুপালি পর্দার কোনো অ্যাকশন দৃশ্য। পেছনে ছয়জন বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও হেলমেট পরা পুলিশ সদস্য। সামনে নীল পাঞ্জাবি ও জিন্স প্যান্ট পরা এক পুলিশ কর্মকর্তা চায়নিজ রাইফেল হাতে মুফতি মোহাম্মদ আলী (রহ.) জামে মসজিদ অতিক্রম করছেন। তিনজন পুলিশ সদস্যকে কাভারে রেখে মসজিদের পরের বাসাটির ফটকের সীমানা প্রাচীরকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। আর সন্ত্রাসীদের উদ্দেশে একের পর এক গুলি ছুড়ছেন। ফটকের ভেতরে কিছুটা ঝুঁকে সন্ত্রাসীদের পাল্টা গুলি থেকে নিজেকে সুরক্ষা করছেন। কয়েকটি গুলি তার সামনে এসে পড়ে। এরপরও ঝুঁকি নিয়ে চালিয়ে যান বন্দুকযুদ্ধ।

জননিরাপত্তার কাজে সেইদিন দুই কনস্টেবল প্রাণ দেন। যিনি জীবনবাজি রেখে রাইফেল চালিয়ে সন্ত্রাসীদের কুপোকাত করেছেন সেই পুলিশ কর্মকর্তার নাম মোর্শেদ জামান। যারা জীবনের প্রয়োজনে প্রাণ দিতে পারেন কিংবা মোর্শেদের মতো সাহসিকতা দেখাতে পারেন, তাদেরই নাম লেখানোর কথা পুলিশের খাতায়। এই হিসাব করলে এই দেশের সাহসী মানুষের কোনো শেষ নেই। কিন্তু সবাই কী আসলেই সাহসী? প্রাণ হারাতে রাজি? উত্তর যদি ‘না’ বোধক হয়, তবে পুলিশে চাকরি নিতে এত লোকের আগ্রহ কেন? তাদের অনেকেই তো আবার নিয়মের বাইরে গিয়ে বাড়তি খয়-খরচা করেও এই বাহিনীতে যেতে রাজি। এর সুযোগ নেয় একটি মহল। তারা কারা? এ প্রশ্নের উত্তর বেশ খানিকটা মিলবে পুলিশ সপ্তাহের শেষদিকে এসে ১১ জানুয়ারি পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বার্ষিক সভায় দেওয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্য থেকে। সেদিন তিনি বলেন, ‘পুলিশের কোয়ালিটি বাড়ানোর পথে রাজনীতি অন্তরায়। পুলিশের কোয়ালিটি কীভাবে বাড়বে? প্রতি বছরই পুলিশে ভাগাভাগি হচ্ছে। অমুক জেলায় পাঁচজন এমপি ওখানে পাঁচজন দিতে হবে। তখন উনারাও ভাগ নেন।’ সদ্যই ঠাকুরগাঁওয়ে এক দলীয় সভায় এই নিয়োগ বাণিজ্যকারীদের সতর্ক করে দিয়ে কাদের বলেন, ‘পুলিশ কনস্টেবল কত গরিব মানুষ, এখানে ভাগ বসায়, আমার দুজন, পাঁচজন, আমার সাতজন; আর গরিব লোক জমি বিক্রি করে টাকা দেয়, এসব লোক আওয়ামী লীগের নেতা হতে পারে না।’ আমরা আশায় থাকব যে, সরকারি দলের দ্বিতীয় প্রধানের এই ভাষণ অনুদিত হবে সব ধাপের, সব দলের নেতাদের জীবনে।

তায়েব মিল্লাত হোসেন: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত