মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খেলাপ আমরা কী করে সই!

হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া
 | প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:২৮

“আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত নাও হতে পারি কিন্তু তোমার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিতে পারি।” (ভলতেয়ার, ফরাসি কবি ও দার্শনিক)।

ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তান ও হিন্দুস্তান হওয়ার সময় পাক-ভারত উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মতান্তরে ১০ থেকে ৩০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। সব ধর্মে নরহত্যা মহাপাপ। ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে কত বড় অধর্মের কাজ করেছিলাম আমরা!

ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরপরই বর্বর পাকিস্তানিরা অধর্মের কাজ শুরু করে। পবিত্র কোরআন শরিফে মাতৃভাষার ওপর সূরা ইব্রাহিম আয়াত ৪- আল্লাহ তাআলা বলেন, “আমি সব রাসুলকে তাদের জাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা পরিষ্কার করে বোঝাতে পারে।’

মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগে যাদের ওপর কিতাব নাজিল হয়েছে তাদের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। হযরত মুসা (আ.)-এর জাতির ভাষা ছিল ইবরানি। তাওরাত নাজিল হয় ইবরানি ভাষায়। হযরত দাউদ (আ.)-এর জাতির ভাষা ছিল ইউনানি; এ ভাষাতেই জবুর কিতাব নাজিল হয়। হযরত ঈসা (আ.)-এর গোত্রের ভাষা সুরিয়ানিতে নাজিল হয় ইঞ্জিল কিতাব। প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর ভাষা ছিল আরবি। পবিত্র কোরান নাজিল হয়েছে আরবি ভাষায়।

ভারত উপমহাদেশে হিন্দু ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত ভাষায় এবং বুদ্ধের ভাষায় বৌদ্ধধর্মের ত্রিপিটক রচিত হয়।

অথচ ধর্মীয় জ্ঞান-বিবর্জিত পাকিস্তানি নেতা জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এসে পল্টনে প্রকাশ্য সভায় ঘোষণা করেন “Urdu shall be the state language of Pakistan”| সেনাবাহিনীতে চাকরি করতে তিন মাস উর্দু শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির ভাষা বাংলা, তারা কেন মাতৃভাষা ছেড়ে ভিনদেশি উর্দু জিকির করবে? তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ করেছিলেন। এ দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ বুঝতে পেরেছিলেন, ধর্মীয় উগ্রপন্থী পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকা সম্ভব হবে না।

এর প্রতিবাদে বাঙালি নিজের ভাষা রক্ষায় শুরু করে ভাষা আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে শহীদ হন ছালাম, বরকত, জব্বার, রফিকসহ আরও অনেকে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই বীজ রোপিত হয় বাঙালি জাতির স্বাধিকার আন্দোলনের। এর পরিণতি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সারা জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং নয় মাস রক্তের সাগরে ভেসে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় বিজয়। পৃথিবীর মানচিত্রে স্বমহিমায় উড্ডীন হয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা।

এ বিজয় কোনো এক ধর্মের বিজয় ছিল না। এ ছিল বাংলাদেশের সব ধর্মের মানুষের বিজয়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখ লাখ মানুষের সমাবেশে ঘোষণা করেন, এখন থেকে বাংলাদেশ কোনো ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে না। দেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তো তা-ই ছিল। এরই আলোকে ১৯৭২ সালে রচিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান, যা প্রশংসিত হয় সারা বিশ্বে। কিন্তু পরাজিত শক্তি তা মেনে নিতে পারেনি। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শক্তি মিলে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট নৃশংসভাবে হত্যা করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে। আর এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে বপন করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বীজ।

সামরিক শাসকরা সংবিধানকে কচুকাটা করে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। স্বৈরাচার এরশাদের আমলে কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা মান্নান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। এসব কারণে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা চরমভাবে অবহেলিত ছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতায় মুক্তিযুদ্ধের বীর সন্তানরা বর্তমানে সম্মানজনক অবস্থায় আছে এবং আরও সুযোগ-সুবিধা পাবে বলে বিশ্বাস করি। অনতিবিলম্বে তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র দেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।

ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বলি যে শুধু আমরা তা নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য সারা বিশ্বে প্রশংসিত পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুসলমানদের ওপর চরম নির্যাতন হচ্ছে। গো-রক্ষা আন্দোলনের নামে মুসলমানদের পিটিয়ে মারা হচ্ছে। গো-মাংসের দোকান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এসব জঘন্য কাজ করা হচ্ছে ধর্মের নামে। গরু নাকি হিন্দুদের গো-মাতা। মুসলমানরা গরু জবাই করলে মহা-অপরাধ হলেও ভারত সরকার ঠিকই গরুর মাংস রপ্তানি করে বিশে^র বিভিন্ন দেশে। গো-মাংস রপ্তানিতে বিশে^ দেশটির অবস্থান তালিকার শীর্ষে।

আবার বাংলাদেশে ফিরে আসি। কিছু উগ্রপন্থী মুসলিম বাংলাদেশকে মুসলিম রাষ্ট্র বানাতে গিয়ে রামুতে বৌদ্ধদের মূর্তি ভেঙেছে; নাছিরনগরে, রংপুরে হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে। মানবতারবিরোধী এসব অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুরা শঙ্কিত।

বৌদ্ধ ধর্মের পঞ্চশীলা নীতিতে রয়েছে- অহিংসা পরম ধর্ম, প্রাণীহত্যা মহাপাপ। তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধের দেশ মিয়ানমারে কত বড় অধর্মের ঘটনা ঘটছে।

ধর্ম মানুষের জন্য- এ চরম সত্যটি আমরা কোনো ধর্মের মানুষই বুঝতে পারছি না।

বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার বলে দাবি করে; কিন্তু তারা ১৯৭২ সালের সংবিধানের তাৎপর্য বুঝতে এবং বোঝাতে ব্যর্থ হয়ে ১৯৭২ সালের বিরোধী শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। বড় দুই দল পাকিস্তানপন্থী ও তালেবানপন্থীদের নিয়ে ভোটযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার পাঁয়তারা করছে।

প্রথম আসমানি কিতাবপ্রাপ্ত নবী হযরত মুছা (আ.)-এর প্রতি (সূরা হুদ) ১১৮ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন- “হে নবী তোমার মালিক চাইলে দুনিয়ার সব মানুষকে তিনি একই উম্মত বানিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু আল্লাহ তায়ালা কারো ওপর তাঁর ইচ্ছা চাপিয়ে দেন না। আর এভাবেই তারা হামেশাই নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ করতে থাকবে।”

ইসলাম ধর্মে মুক্তচিন্তার অবারিত সুযোগ রয়েছে। তাই এ ধর্মে বহু দল-উপদলের উপস্থিতি দেখা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বনি ইসরাইল ৭৩ দলে বিভক্ত হয়েছিল, আমার উম্মত ৭২ দলে বিভক্ত হবে। সুতরাং আদর্শিক বিরোধের ক্ষেত্রে সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার বিকল্প নেই।

ইসলামের যে প্রধান চার মূলনীতি- কোরান,  হাদিস,  ইজমা ও কিয়াস- তার প্রথম দুটি রাসুল (সা.)-এর উফাতের পর রুদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইজমা ও কিয়াসের পথ ও মত রুদ্ধ হয়নি। কিয়াস হলো যুক্তি। ইজমা ও কিয়াস যুক্তি ও গবেষণানির্ভর।

প্রথম আলোয় (১৯ জানুয়ারি ২০১৬) ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার লিখেছেন, বহুত্ববাদী ভারত হিন্দুত্ববাদী না হোক। তাঁর লেখায় উদাহরণ হিসেবে অভিনেতা আমির খানের স্ত্রীর মনের দুর্বলতা, ভয় ও আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। দেশটিতে মুসলিম বিদ্বেষ দেখে আমিরের স্ত্রীর কথা- আমাদের কি দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত?

বাংলাদেশেও সংখ্যালঘুদের মনে কি এ কথা লুকিয়ে নেই? রামুতে বৌদ্ধমন্দিরে, নাছিরনগর-রংপুরে হিন্দুবাড়িতে, গাইবান্ধার সাঁওতাল, পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া, মন্দিরে মূর্তি ভাঙা ইত্যাদি কি প্রমাণ করে না যে তোমরা অন্য ধর্মাবলম্বীরা পূজা করতে পারবে না, এ রাষ্ট্রের ধর্ম ইসলাম?

মুক্তিযুদ্ধের সময় হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ও উপজাতি সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। সংখ্যালঘু মুক্তিযোদ্ধা বলে কিছু ছিল না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় রচিত ১৯৭২ সালের সংবিধানে প্রদত্ত প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার পরবর্তী সময়ে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। বর্তমান সরকারও এর কিছু ধারণ করছে।

আমরা যারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি, তাদের যুদ্ধ কিংবা দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার খেলাপ আমরা কী করে সই! ১৯৭২ সালের সংবিধানের প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল গোষ্ঠী, ব্যক্তি সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আসুন মাঠে নামি। জনগণকে ১৯৭২ সালের সংবিধানের তাৎপর্য বোঝাতে চেষ্টা করি এবং আগামী নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিই।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক ও শিক্ষাবিদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত