সাত কলেজের অধিভুক্তিকরণ: ভালো-মন্দের হিসাব

শেখ আদনান ফাহাদ
| আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৫:২১ | প্রকাশিত : ১৮ জানুয়ারি ২০১৮, ১৫:১৯

সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে রাজধানী ঢাকার সাত ঐতিহ্যবাহী কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার প্রক্রিয়া সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে, কলেজসমূহের ছাত্র-ছাত্রীদের গুণগত মান বৃদ্ধি পেত, এটা বলা যায় নিশ্চিতভাবেই। একইসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে পারত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কার্যকারিতা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসমূহ।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর সাতটি কলেজ ঢাবির অধিভুক্ত হয়। এগুলো হচ্ছে- ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ ও সরকারি তিতুমীর কলেজ।

এসব কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে বর্তমানে এক লাখ ৬৭ হাজার ২৩৬ জন ছাত্রছাত্রী অধ্যয়নরত আছেন। এই সাতটি কলেজের বাইরেও আগে থেকেই ১০৪টি কলেজ এবং ইন্সটিটিউট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে যাদের মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৪০ হাজার ৬৯৮ জন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ছাত্র-ছাত্রী আছে ৩১ হাজার ৯৫৫ জন। অর্থাৎ নিজস্ব ছাত্র-ছাত্রীর বাইরে ২ লাখ ৮ হাজার ছাত্র-ছাত্রীর দায়িত্ব এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।

অধিভুক্ত হওয়ার বিষয়ে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আম ম স আরেফিন সিদ্দিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, অধিভুক্ত হওয়া মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। তিনি পরিষ্কার করে বলেছিলেন, সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সনদ পেলেও সনদে স্ব স্ব কলেজ এবং বিভাগের নাম উল্লেখ থাকবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষার্থীদের সনদ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে।

১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে রাজধানী ও আশপাশের প্রায় সব সরকারি কলেজের শিক্ষা ও পরীক্ষা কার্যক্রম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই পরিচালিত হত। আগে থেকে অধিভুক্ত ১০৪টি কলেজ এবং ইন্সটিটিউট নিয়ে সমস্যা হয়নি, এখন কেন সাত কলেজ নিয়ে এত সমস্যা তৈরি হচ্ছে?

ঢাকা কলেজের এক শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানলাম, অধিভুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত আসার পর হতে পরীক্ষা কমিটিতে স্ব স্ব কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক প্রতিনিধিরা থাকছেন। সরকারি কলেজ এবং স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণ যৌথভাবে পরীক্ষার কাজ করছেন। কিন্তু তারা কি সঠিকভাবে কাজ করছেন? নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক পরীক্ষাই তো অনেক সময় সঠিক সময়ে নেয়া যায় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হতে আমার প্রায় তিন বছর বেশি সময় লেগেছিল।

আমার আপন এক ভাতিজা, সাত কলেজের অন্যতম তিতুমীর কলেজে অনার্সে পড়ছে। সে জানাল, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তার দ্বিতীয় বর্ষের বন্ধুদের পরীক্ষা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ভাতিজা আমার এখনো জানে না, পরীক্ষা কবে হবে। এই বয়সের একটা ছেলে এভাবে ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থেকে যদি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তাহলে এর দায়-দায়িত্ব নেবে কে?

নিজের পরীক্ষার দাবি জানাতে গিয়ে সিদ্দিকুর নিজের চোখ হারিয়েছেন। কতটা অসহায় হলে, এই কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নামতে পারে। রাস্তায় নেমে পুলিশের বর্বর হামলায় চোখ গেল সিদ্দিকুরের। আমরা কি আরও সিদ্দিকুরের চোখ চাইছি? না হলে পরীক্ষা-জট কেন তৈরি করা হচ্ছে? ইচ্ছে করলে কি দায়িত্বশীলগণ নিজেদের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করতে পারতেন না? সান্ধ্যকালীন নানা প্রোগ্রাম, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো কিংবা এনজিওর সাথে পরামর্শকের অর্থকরী ভূমিকা বাদ দিলেই তো এই শিক্ষকগণ অনেক সময় বের করতে পারতেন। কিন্তু এটাও কি সম্ভব!

কলেজ সমূহের দিক থেকে এক ধরনের সমস্যা। পরীক্ষা-সংক্রান্ত ও কিছুটা মর্যাদা-সংক্রান্ত সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হওয়ায় এসব কলেজের মর্যাদা ও গুণগত মান কিছুটা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলেও ঢাকা-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের দিক থেকে কিছু কথাবার্তা কলেজগুলোর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য অবশ্যই মর্যাদাহানীকর। যে সিদ্ধান্তের জন্য এসব কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো দায় নেই, সে সিদ্ধান্তের জন্য তারা কেন কটু কথা শুনবে। আর যদি ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলি, তাহলে বলব, এমন কলেজও আছে যার ইতিহাস, যার ঐতিহ্য দেশের অনেক বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেশি গৌরবের। যেমন ঢাকা কলেজ।

১৮৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ শুধু বাংলাদেশের নয়, পুরো সাউথ এশিয়ার জন্য এক গর্বের প্রতিষ্ঠান। একইভাবে বাকি সবগুলো কলেজের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আছে। এসব কলেজে পড়ে অনেক ছেলে-মেয়ে রাজধানীসহ সারাদেশে সরকারি-বেসরকারি নানা গুরুত্বপূর্ণ পেশায় নিয়োজিত আছে। বড় বড় মানুষদের সিদ্ধান্তের জন্য সৃষ্ট কোনো পরিস্থিতির জন্য এদেরকে দায়ী করা মোটেও যৌক্তিক নয়।

আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরও অধিভুক্ত-সংক্রান্ত কোনো বিষয়ে দোষারোপ করার কোনো সুযোগ নেই। মহাযুদ্ধ জয় করে এরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়। যদিও ইদানিং জালিয়াত ধরা পড়েছে কিছু। কিন্তু এসবের দায়-দায়িত্ব কেন মেধাবী, সৎ ছেলে-মেয়েরা নেবে? বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ব্যাংকে গিয়ে যদি সাত কলেজের ছেলে-মেয়েদের জন্য লাইনের অনেক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে কারো মেজাজ খারাপ হলে, কিছু বলার থাকে? সাত কলেজের কোনো কোনো ছাত্র –ছাত্রী এবং তাদের বাবা-মায়েরাও অধিভুক্তির ভুল ব্যাখা দিয়েছেন। অসুস্থ এবং অস্থির সমাজে অনেকে কেমন যেন একটু বাড়িয়ে বলার অভ্যাস রপ্ত করেছেন। যেমন ঢাকা কলেজের ছাত্রকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলার কোনো দরকার নেই। ঢাকা কলেজ নিজ নামেই পরিচিত। ঢাকা কলেজে যা আছে, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই তা নাই। এখানে উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক থেকে আমার কলেজের শিক্ষকরা ছিলেন অনেক পরিণত ও প্রজ্ঞাবান। তাই অধিভুক্ত কলেজের পরিচয় নিয়েই ঢাকা কলেজ বা অন্যান্য কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের গর্বিত থাকা উচিত।

হ্যাঁ, তারা নিজেদের উন্নয়নের জন্য কাজ করবে, কিন্তু নিজেদের ব্যক্তিত্ব বিকিয়ে দিয়ে নয়। কিন্তু এই কাজটিই কলেজগুলোর অনেক ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের বাবা-মা করেছেন, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা ভালোভাবে নেয়নি। যেমন, কোনো অভিভাবক যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কোন কলেজ থেকে এসেছ!, তখন স্বাভাবিকভাবেই ওই ছাত্রী রাগ করবে।

ব্যাংকের টাকা জমা দিতে কলেজের শিক্ষার্থীরা কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবে? এখন অনলাইন ব্যাংকিং এর যুগ। সবগুলো কলেজের ক্যাম্পাসে কোনো না কোনো ব্যাংকের শাখা আছে। সেগুলোতে টাকা জমা দিলেই হয়। তারপর এদের ভর্তি পরীক্ষার ভাইভা কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হবে। কলেজগুলোর নিজস্ব ক্যাম্পাসেই হতে পারে। পরীক্ষাও হবে সেখানে। অধিভুক্তি নিয়ে তাই আন্দোলন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা। ‘বোঝামুক্ত ঢাবি চাই, সাত কলেজ বাতিল চাই’ শ্লোগান দিয়ে ইতোমধ্যে মিছিল-মিটিং করেছে শিক্ষার্থীরা।

ছাত্র আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ডক্টর আখতারুজ্জমান সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সাত কলেজের শিক্ষার্থী সংক্রান্ত সব কাজ তাদের স্ব স্ব কলেজেই হবে। এসবের সাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।

ছাত্র আন্দোলন নিয়ে জল অনেক দূর পর্যন্ত গড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের এক পর্যায়ে নিজেদের গায়ে কাদা লাগিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাসে কোনো আন্দোলন শুরু হলে সেটি নিয়ন্ত্রণ করার কথা প্রশাসনের। এবং সে নিয়ন্ত্রণ হতে হবে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে। উপাচার্য সম্পৃক্ত হওয়ার আগে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং সহকারী প্রক্টরগণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে মিশবেন, কথা বলবেন, সমস্যার গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন। উপাচার্য এবং ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে সেতু হিসেবে কাজ করবেন ইনারা। কিন্তু আমরা দেখলাম, ছাত্রলীগ এসেছে আন্দোলন ‘নিয়ন্ত্রণ’ করতে। খবর নিয়ে জানলাম, ছাত্রলীগ আসতে চায়নি, তাদেরকে ডেকে আনা হয়েছে। ছাত্রলীগ প্রশাসন নয়। ছাত্রলীগকে ডেকে আনা ঠিক হয়নি।

প্রশাসন এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে একটা মধ্যস্ততা করতে চেয়েছে ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগ সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে একমত হয়েই মধ্যস্ততা করতে চেয়েছে। কিন্তু কোনো কোনো নেতা-কর্মীর অতি উৎসাহের ফলে পুরো বিষয়টা বিগড়ে গেছে। মোবাইলে ধারণ করা কিছু ভিডিওতে কিছু কিছু ছেলেকে যেভাবে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে হাসি-তামাশা করতে এবং ছাত্রলীগের কিছু মেয়েকে যেভাবে ছেলেদের সাথে কথা বলতে দেখলাম, তাতে তাদেরকে আমার ছাত্রলীগ বলে মনে হয়নি। এরা বঙ্গবন্ধুর কোনো আদর্শ জানে এবং মানে বলে মনে হয় না।

কিন্তু ছাত্রলীগ তো সম্পৃক্ত না হয়েও পারবে না। সাধারণের নামে অনেক ‘অসাধারণ’ ছাত্র-ছাত্রীও থাকতে পারে আন্দোলনকারীদের মাঝে। ২০১৮ সাল চলছে। আওয়ামী লীগ টানা দুইবার ক্ষমতায় থেকে সরকার পরিচালনা করে অনেক সাফল্য অর্জন করেছে। মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে অনেক ইতিবাচক অর্জন দেখিয়েছে। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যদি উত্তপ্ত করা যায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সরকারবিরোধীদের লাভ। এর আগে আমরা নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না এবং বিএনপির সাদেক হোসেন খোকার মধ্যে ‘লাশ ফেলে দেওয়ার’ ষড়যন্ত্র-সংক্রান্ত আলাপ-চারিতা দেখেছি। ফলে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীর আন্দোলনকে অন্যদিকে ধাবিত করার ষড়যন্ত্র হতেই পারে। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তবে গোঁয়ারের মত আচরণ করে নয়; বুদ্ধি ও ধৈর্য নিয়ে সবাইকে কাজ করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত