সত্তর রকমের চা নিয়ে ‘টং ঘর’

কাজী রফিকুল ইসলাম, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৯ জানুয়ারি ২০১৮, ১৪:১৮

নিজেদের আড্ডা দেয়ার জায়গার প্রয়োজনেই খোলা হয়েছিল চায়ের দোকান। অথচ এখন নিজেদেরই আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয় খুব কম। কারণ দোকান প্রায় সারাক্ষণই লেগে থাকে চা প্রেমীদের আড্ডা। তাই নিজেরা আড্ডা দেবেন ভেবে যারা দোকানটি খুলেছিলেন, তাদের আড্ডা দিতে হয় রাত এগারোটার পর। অর্থাৎ সকল খদ্দের বিদায় নেবার পর। এলাকার এবং এলাকার বাইরের নানান প্রজন্মের মানুষের কাছে দিনদিন জনপ্রিয়তার হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুরের চায়ের দোকান ‘টং ঘর’।

মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান বেড়িবাঁধ ঢালের খানিকটা পূর্বে, “টং ঘর”।  দোকানের দেয়ালের দিকে তাকালে নজরে পড়বে উপমহাদেশে চায়ের উৎপত্তির ইতিহাস। চাইলে এক নজরে জেনে নেয়া যাবে চায়ের জন্মকথাও। বিপরীত দিকে কয়লায় আঁকা শহুরে জীবন। এখানে ওখানে ছোট ছোট কবিতা। এসব দেখতে দেখতে মাটির কাপে এককাপ চা খেতে ভালই লাগে এখানে আগত খদ্দেরদের।

কারণটি সম্ভবত এখানকার চায়ের হরেক রকম পদ আর তাদের ভিন্নতা। প্রায় আশি রকমের চা মেলে এখানে। বিচিত্র তাদের স্বাদ, চমকপ্রদ তাদের নাম।

রঙ চা, দুধ চা, মৌসুমি ফলের চা, স্পেশাল আইটেম এবং কফি, শুধু এই পাঁচ ক্যাটাগরিতেই মিলবে ৬৩ ধরনের গরম পানীয়ের স্বাদ। একই ছাদের নিচে এতগুলো আইটেমের চা পাওয়া যেমন সহজ নয়।

রঙ চায়ের মধ্যে বেশি চাহিদা আছে ‘ডাবল লেমন’ চা, ‘মাসালা’ রঙ চা, ‘হারবাল’ চা, ‘থেরাপি’ চা ও বোম্বাই মরিচ দিয়ে বানানো ‘খবরদার’ চায়ের। মোট বিশ ধরনের রং চা পাওয়া যাবে। দাম ৬ থেকে ২৫ টাকার মধ্যেই ওঠানামা করে।

দুধ চায়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে দারুণ বৈচিত্র। ২১ ধরনের দুধ চায়ের মধ্যে চাহিদায় পিছিয়ে নেই কোনোটাই। নামের কারণে হোক কিংবা স্বাদের কারণেই হোক, বেশ জনপ্রিয়তা আছে ‘মাসালা’ দুধ চা, ‘এনার্জি’ চা, ‘বুস্ট’ চা ও ‘খেজুর’ দুধ চা। এসব চায়ের দাম ১০ থেকে ৩৫ টাকার মধ্যে।
স্পেশাল আইটেমের শীর্ষে থাকা ‘সুলতান সুলেমান’ চায়ের চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম হলেও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। দাম ১০১ টাকা। ৫১ টাকায় পাওয়া যাবে ‘রজনীকান্ত’ চা।  ‘দরবার-এ-টং’ চা ৩১ টাকা। যুগলবন্দী কপত-কপতিদের জন্য ‘রোমিও-জুলিয়েট’ চা। দাম ২১ টাকা। অসম্ভবকে সম্ভব করা যে অনন্তর কাজ, তেমন কোনো অসাধ্যকে সাধন করতে যাবার  আগে টং ঘরে গিয়ে এক কাপ ‘অনন্ত জলিল’ চা চেখে দেখতে পারেন। মাত্র বিশ টাকাতেই মিলবে ‘অনন্ত জলিল’ চা।

অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে। চায়ের দোকানে যেখানে দুধ আর রঙ চা হলেই চলে সেখানে, এত আয়োজন কেন? সেকি কেবল চটকদার নাম শুনিয়ে খদ্দের টানতে? স্রেফ দোকানটিকে ব্যবসা সফল করতে? উত্তর হলো, না। এটা করেছেন দোকানের উদ্যোক্তারা নিতান্তই শখের বসে।

দোকানের পেছনে নানান রকম আইডিয়া আর চিন্তাও কাজ করেছে এর উদ্যোক্তাদের ভেতর। যেমন ধরুন ধূমপান মুক্ত একটি চায়ের দোকান হিসেবে টং ঘরকে গড়ে তোলা। যেখানে চায়ের দোকান মানেই শীতের ঘন কুয়াশার চাইতে ঘন সিগারেটের ধোয়া থাকবেই, সেদিক থেকে বেশ আলাদা ‘টং ঘর’। স্বপরিবারে চা খাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেননা চা থাকলেও এখানে নেই সিগারেটের ধোয়া।

‘টং ঘর’ নিয়ে আলাপকালে দোকানটির মালিক শাহ নেওয়াজ রাজ ঢাকাটাইমসকে জানান, ‘আড্ডা মারার প্রয়োজনেই দোকানটি খুলেছিলাম। প্রথম দিকে সিগারেট ছিল। ধীরে ধীরে কাস্টমার বাড়তে শুরু করল। আমার কাছে মনে হলো সিগারেটের কারণে পরিবেশটা নষ্ট হচ্ছে। তাই সিগারেটটা বন্ধ করে দিলাম। চায়ের আইটেম বাড়ানো শুরু করলাম। দোকানটাকে একটা লুক দেয়ার চেষ্টা করলাম। কতটুকু পেরেছি তা দেখতেই পাচ্ছেন। যতটুকু যা করা হয়েছে তা কেবল আমার একার মাথা থেকে না, এখানে আরো বেশ কিছু মাথা কাজ করেছে এবং করছে। তবে, আমি এইটুকু নিশ্চিত করতে পারি, অন্তত ঢাকা শহরে ‘টং ঘর’ একমাত্র চায়ের দোকান যেখানে আপনি স্বপরিবারে বসে চা খেতে পারবেন।’

মানের ব্যাপারে কতটা সচেতন টং ঘর? পরিচিতি পাওয়ার পর মান কি আদৌ অক্ষুন্ন থাকবে? কিংবা লাভ করাটাই কি এ দোকানের একমাত্র উদ্দেশ্য?

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ব্যাপারটা এমন না যে, এখান থেকে যা আয় আসবে তা দিয়ে আমাকে বাসার বাজার করতে হবে কিংবা বাসা ভাড়া দিতে হবে। আমি আয় করার জন্য দোকানটি খুলিনি। বলতে পারেন এটা হলো শখ। আমি দোকানটিকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। প্রয়োজনে আরো শাখা হবে। আর এটা নিশ্চিত করতে চাই যে, টং ঘরের মান বাড়াতে পারি বা না পারি, এখন যা আছে তার থেকে কখনোই কমবে না।’

টং ঘরে চা খেতে এসেছিলেন মো. সুজন ইসলাম ও তার বন্ধুরা। চা খাওয়ার ফাঁকে সুজন ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘চা তো খাওয়াই হয়। সব দোকানের চাইতে এ দোকানটা বেশ আলাদা। সাজানো গোছানো, পরিষ্কার, পরিপাটি। এখানে যারা আসে সবাই একটা নিয়ম মেনে চলে। অন্য সব দোকানে যেটা হয়, আশপাশে কে আছে দেখার দরকার নেই। বাজে কথা বাজে আচরণ করে বসে। এখানে সেটা নেই। সিগারেট না থাকার ব্যাপারটা আরো ভাল। ফলে ফ্যামিলি নিয়েও আসার সুযোগ আছে।’

টং ঘরে নিয়মিত চা খেতে আসেন ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র রেহান খান। কখনো একা, কখনো বা দল বেধে। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘জায়গাটা সুন্দর। আসতে ভাল লাগে। মূল ভালোবাসাটা চায়ের প্রতি। এখানে যতগুলো আইটেম আছে। তার অধিকাংশ আমার টেস্ট করা আছে। ফ্রেন্ডদের নিয়ে আসি। ফ্যামিলি নিয়েও আসা হয়।’

চা ভক্তদের চাহিদা পূরণেও হিমশিম খেতে হয় এখানকার চায়ের কারিগরদের। এখানে চা বানানোর প্রধান কারিগর মো. আলি আজগর। তার সহকারী হিসেবে আছেন মো. বিল্লাল। প্রতিদিন সকালে নয়টা থেকে চা বানানো শুরু। শেষ হয় রাত বারোটায়। মাঝখানে দুপুরের দুঘণ্টা বিরতি। সকালে খদ্দের কম থাকলেও, মধ্যাহ্ন বিরতির পর দোকান খোলার আগেই চা খেতে ভিড় জমে।

ঢাকাটাইমস/ ১৯ জানুয়ারি /কারই/ কেএস

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত