চিড়িয়াখানায় বাঘ-সিংহ নেই, আছে ভাগাড়!

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
| আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:৫৪ | প্রকাশিত : ২০ জানুয়ারি ২০১৮, ১০:২৯

সাজানো-গোছানো ছিমছিমে পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতেই মানুষ যান পার্ক-চিড়িয়াখানায়। বিনোদনের খোরাক মেটান বাঘ-ভালুক আর সিংহ ছাড়াও নানা বন্য পশু-পাখি দেখেন। কিন্তু রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায় বাঘ-সিংহ নেই। বরং চিড়িয়াখানায় ঢুকতেই চোখে পড়ছে আবর্জনার ভাগাড় আর কাঠের গুড়ির স্তুপ।

এ নিয়ে হতাশ দর্শনার্থীরা। তারা বলছেন, বাঘ-সিংহ না থাকলে এটা কিসের চিড়িয়াখানা! এটাকে এখন শুধু পার্ক বলা যায়। কিন্তু চিড়িয়াখানার ভেতর আবর্জনার ভাগাড় এবং কাঠের গুড়ির স্তুপ পার্কের পরিবেশকেও নষ্ট করেছে। এছাড়াও চিড়িয়াখানার ভেতর অনেক জায়গায় জন্মেছে বড় বড় ঘাস। সেসব পরিষ্কারের উদ্যোগ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে দিনকে দিন কমতে থাকবে দর্শনার্থীর সংখ্যা।

গত বুধবার দুপুরে চিড়িয়াখানার প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই হাতের বাম পাশে চোখে পড়ে আবর্জনার ভাগাড়। প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্যাকেট-সবই পড়ে আছে সেখানে। এরপাশেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে বেশকিছু কাঠের গুড়ি। আশপাশে ঝোপঝাড়ের জঙ্গল। এ এলাকায় দর্শনার্থীদের বসার জন্য কয়েকটি গাছের গোড়া কংক্রিট দিয়ে বেধে রাখা হলেও কাঠের গুড়ি আর আবর্জনার স্তুপের কারণে সেখানে কারও বসার সুযোগ নেই।

চিড়িয়াখানার ভেতর এমন পরিবেশ দেখিয়ে মারিফুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থী বললেন, চিড়িয়াখানার ভেতর এ ধরনের পরিবেশ আশা করা যায় না। এগুলো ‘রুচির’ ব্যাপার। এ ধরনের পরিবেশ এখানকার কর্মকর্তাদের অদক্ষতা প্রমাণ করে। টাকা দিয়ে টিকেট কেটে আমরা আবর্জনার ভেতর সময় কাটাতে আসিনি।

জানতে চাইলে চিড়িয়াখানার মনিটরিং অফিসার শেখ আবু জাফর বলেন, বিভিন্ন সময় ঝড়ে পড়া গাছগুলো কেটে স্তুপ করে রাখা হচ্ছে। অচিরেই নিলামের মাধ্যমে সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হবে। তখন জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাবে। আর ময়লা-আবর্জনা চিড়িয়াখানার বিভিন্ন স্থান থেকে কর্মীরা তুলে নিয়ে গিয়ে সেখানে জড়ো করেন। পরে প্রতিদিন সকালেই সেগুলো বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি।

আবর্জনার ভাগাড় আর কাঠের স্তুপ থেকে কিছুটা পশ্চিমেই পশু-পাখির খাঁচা। তবে বাঘ-সিংহ নেই। দুর্লভ পশু-পাখির সংখ্যাও কম। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখানে সবচেয়ে বেশি আছে কবুতর আর রাজহাঁস। এর বাইরে রয়েছে মেছোবাঘ, বেবুন, গন্ধগোকুল, গিনিপিগ, চীনামুরগি, বাজ, টিয়া ও চিল।

পশু-পাখির মধ্যে আরও রয়েছে ওয়াক, বাজরিকা, বালিহাঁস, ঘুঘু, ঘোড়া, হরিণ, ভালুক, উদবিড়াল, হনুমান, বানর, খরগোশ, মাছমুরাল, নলবক, হাড়গিলা, পেলিক্যান, সাদাবক, ধুসরবক, পেলিক্যান, গাধা, মাছমুরাল ও কালিমপাখি। এছাড়া রয়েছে দুটি করে ঘড়িয়াল ও কচ্ছপ এবং একটি অজগর।

চিড়িয়াখানার কর্মীরা জানান, ১৯৯৭ সালে ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে প্রায় সাড়ে ছয় বছর বয়সী একটি বাঘ এখানে আনা হয়। সম্রাট নামের ওই বাঘটি ১২ বছর নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে ২০০৮ সালের ২৯ নভেম্বর মারা যায়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বাঘটি পুরনো খাঁচাতেই ছিল। এখন বাঘের জন্য নতুন খাঁচা বানানো হলেও আর বাঘ আনা হয়নি। আগে চিড়িয়াখানায় এক জোড়া সিংহ-সিংহীও ছিল। ২০১৩ সালে ১৪ বছর বয়সে সিংহীটি মারা যায়। ওই বছর সিংহটিও মারা যায়। এরপর চিড়িয়াখানায় আর কোনো সিংহও আনা হয়নি।

বাঘ-সিংহ না থাকায় জান্নাতুল ফেরদৌস নামে এক অভিভাবক বলেন, তার বাচ্চা শুধু বাঘ-সিংহ দেখতে চায়। কিন্তু চিড়িয়াখানায় তা নেই। অধিকাংশ খাঁচাই প্রাণীশূন্য। যেগুলোতে প্রাণী রয়েছে সেগুলো নোংরা আর দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। শিশুদের ধারণা দেওয়া যাবে, এমন কোনো প্রাণী এখন আর চিড়িয়াখানায় নেই। বিরল সব পশুপাখি না থাকায় শিশুরাও হতাশ। আর বাঘ-সিংহের মতো প্রাণী না থাকায় চিড়িয়াখানাটি ‘প্রাণহীন’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ নিয়ে জানতে চাইলে চিড়িয়াখানার কিউরেটর ফরহাদ উদ্দিন বলেন, বাঘ-সিংহ নয়; চিড়িয়াখানায় জিরাফ আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জিরাফ পেতে গত সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে চাহিদা দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের চিঠির জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। জিরাফ পাওয়া গেলে চিড়িয়াখানাটি দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করবে। তখন চিড়িয়াখানার দর্শনার্থী যেমন বাড়বে তেমন আয়ও বাড়বে।

সরেজমিনে দেখা যায়, চিড়িয়াখানাটিতে দর্শনার্থীদের সংখ্যা কম। যারা এসেছেন, তাদের অধিকাংশই রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। বিভিন্ন স্থান থেকে বনভোজনেও এসেছেন কেউ কেউ। বাঘ-সিংহ ছাড়াও বিরল বিভিন্ন প্রাণী না থাকায় তারা হতাশ। দর্শনার্থীরা জানিয়েছেন, ১০ বছর আগেও চিড়িয়াখানায় নানা প্রজাতির প্রাণী ছিল। এখন তার কিছুই নেই। তাই এখন শিশুদের বিনোদন শুধু রাইডনির্ভর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজশাহী চিড়িয়াখানাটি এক সময় রেসকোর্স ছিল। ঘোড়দৌড় খেলা চলতো সেখানে। জনপ্রিয় এই খেলা এক সময় বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত ছিল রেসকোর্স ময়দান। পরে ১৯৭২ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক জাতীয় চার নেতার অন্যতম শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের প্রচেষ্টায় ৩২ দশমিক ৭৬ একর এই জমিটির ওপর উদ্যান নির্মাণ করা হয়।

১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এটি জেলা পরিষদের অধীনে ছিল। ১৯৯৬ সালে উদ্যানটি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) আওতায় দেওয়া হয়। তারপর থেকেই চিড়িয়াখানাটির রক্ষণাবেক্ষণে নিজস্ব বরাদ্দ থেকে ব্যয় করে আসছে সিটি করপোরেশন। কিন্তু প্রাণী সংকট আর আধুনিকায়নের অভাবে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে ৪২ বছরের পুরনো এ বিনোদন কেন্দ্রটি।

কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও রাসিকের ওয়ার্ড কাউন্সিলর কামরুজ্জামান কামরু বলেন, চিড়িয়াখানার অবকাঠামোগত উন্নয়নে এখন কোনো প্রকল্পের কাজ চলছে না। তবে নতুন নতুন প্রাণী আনার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে আটক হওয়া ভারতীয় কয়েকটি উট তারা চিড়িয়াখানায় আনার চেষ্টা করছেন। এ জন্য কাস্টমসের সঙ্গে কথাবার্তা চলছে।

ঢাকাটাইমস/২০জানুয়ারি/আরআর/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
Close