মন্ত্রণালয়ের কাজে গতি আনতে ‘সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিট’

প্রকাশ | ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:১৬

মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস

প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে গঠন করা হচ্ছে ‘সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিট’ (রিফর্ম ম্যানেজমেন্ট ইউনিট)। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারকে সার্বক্ষণিক খাপ খাওয়াতে এ ইউনিট তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ কামরুল হাসান স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশনাপত্র জারি করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

এ নির্দেশনা পত্রের সঙ্গে ইউনিট গঠনের বিষয়ে বিস্তারিত একটি ধারণাপত্র জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর পাঠানো হয়।

ধারণাপত্রে ইউনিট গঠনের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সৃষ্টিশীল ও উদ্ভাবনী এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম চিহ্নিতকরণ, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন এবং পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে নির্দিষ্টভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য এ ধরনের ইউনিট গঠিত হচ্ছে।

ইউনিট গঠনের যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, ‘বর্তমানে সরকার প্রতিনিয়ত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য সরকারের পলিসি পর্যায়ে মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের এ ইউনিটগুলো গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ ও অনুশীলনের মাধ্যমে সরকারকে আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করবে।’

এ ইউনিট নীতি ও কাঠামোগত সংস্কার কাজের মধ্যে মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতিমালা সংস্কারের উদ্যোগ নেবে এবং সরকার কর্তৃক বিভিন্ন কার্যক্রম ও সাফল্যসমূহ জনগণের সামনে তুলে ধরবে।

ধারণাপত্র পাওয়ার ৮ থেকে ৯ মাস পরে চলতি মাসের শেষের দিকে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এ ইউনিট গঠনের জন্য শুরু করেছে জোর কার্যক্রম। এ বিষয়ে প্রথমে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো থেকে ‘আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী ব্যবস্থাপনা বিষয়ে মতামত প্রদান প্রসঙ্গে’ শিরোনামে উক্ত ধারণাপত্রসহ একটি চিঠি সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, উপসচিব, মন্ত্রীর একান্ত সচিব, প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, সচিবের একান্ত সচিব, সিনিয়র সহকারী প্রধান ও সহকারী সচিবের বরাবর পাঠানো হয়।

তবে হঠাৎ করেই সরকারের এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে প্রশাসনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার প্রশাসনযন্ত্রকে কাজে লাগাতে চায়, তাই এ ধরনের সংস্কার ইউনিট করা হচ্ছে। আবার কেউ বলছেন চাকরিতে যোগ দেয়ার আগে রাজনীতি করেছেন এমন কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে এসব ইউনিট করা হচ্ছে যাতে করে তাদের দিয়ে সরকার প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে শাসন করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্মসচিব পদমর্যাদার একাধিক কর্মকর্তা এ বিষয়ে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দেখুন প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কাজ সচিবের নেতৃত্বে একটি স্ট্রাকচার মেইনটেইন করে চলে। সেখানে কোনো স্থানে কাজের ব্যত্যয় ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিটি করা হলে অফিসারদের মাঝে মনস্তাত্বিক দূরত্ব তৈরি হবে যা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাহত হবে। তবে এটা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে করা হচ্ছে এ বিষয়ে আমাদের আর কিছু বলেও লাভ হবে না।’

ধারণাপত্র অনুযায়ী প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সাথে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জসমূহ, এসডিজি বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জসমূহ চিহ্নিতকরণ, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দরকষাকষির ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে সক্ষম ও দক্ষ করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ, পিপিপি কার্যক্রম গতিশীল করার জন্য মন্ত্রণালয়ের সুপারিশসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কার্যবলী পরিচালনার জন্য এ ইউনিট কাজ করার কথা নির্দেশ দেয়া আছে।

ধারণাপত্রটিতে আরও বলা হয়েছে, ‘টেকসই উন্নয়ন অভিষ্ট অর্জনে সরকারকে সক্ষম করে তোলার জন্য নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষায়িত কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিত গবেষণাধর্মী বিশেষায়িত কার্যক্রম পরিচালনা করার লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিট কাজ করবে।’

এ ইউনিট গঠনে একজন অতিরিক্ত সচিব বা যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে দুইজন যুগ্ম সচিব বা উপসচিব সমন্বয়ে গঠন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইউনিটটি কর্মকর্তাদের ব্যবস্থাপনার ও সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামোর পরিবর্তে দলগতভাবে কাজ করবে।

জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হুসনুল মাহমুদ খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এ নির্দেশনা আমরা পেয়েছি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে। তারা কী চিন্তা করে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে এ ধরনের ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এটা তারাই বলতে পারবেন। তবে আমরা মনে করছি প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে অফিসারদের খাপ খাওয়াতেই এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত সংস্কার ব্যবস্থাপনা ইউনিটের প্রধান অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা)আশরাফ আলী ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘দেখুন এটার ক্ষতিকর দিক আমরা কিছু দেখছি না। এ সংস্কার ইউনিট যে পরিকল্পনা করবে তা সচিবের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা হবে। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রশাসনকে গতিশীল করতেই এ উদ্যোগ।’

এ ধরনের কমিটি প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের চলতি প্রশাসনের কাজের সাথে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি করবে কি না এমন প্রশ্নে এই আমলা বলেন, ‘যে ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি করবে সে ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে না এ সংস্কার ইউনিট।’

এ ধরনের সংস্কার ম্যানেজমেন্ট ইউনিট হঠাৎ করেই কেন এমন প্রশ্নে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) দাবিরুল ইসলাম ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এটা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সিদ্ধান্ত এটা ওনারাই বলতে পারবেন। এ ধরনের উদ্যোগ একটা দিক থেকে ভাল, তবে কি উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এটা আমাদের জানা নেই।’

সাবেক সচিব এসএম জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘সব সরকারই চেষ্টা করে তাদের রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে প্রশাসনকে রিফর্ম করা। এখন কিছু সময় অপেক্ষ করতে হবে এর আসল উদ্দেশ্য জানার জন্য।’

(ঢাকাটাইমস/০৫ফেব্রুয়ারি/এমএম/ডব্লিউবি)