এক টাকায় সিঙ্গাড়া পিঁয়াজু!

ব্যুরো প্রধান, রাজশাহী
| আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:৫৯ | প্রকাশিত : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:০৪

বাড়ির উঠানকে দোকান বানিয়েছেন শাহেদা বিবি। তার দোকানে পাওয়া যায় সিঙ্গাড়া, পিঁয়াজু, চপ, বেগুনি, নিমকি আর ছোলাভাজা। শাহেদার দোকান যতক্ষণ খোলা, ততক্ষণই ক্রেতাদের ভিড়। খাবারগুলো যেমন সুস্বাদু, তেমনি দামও একবারেই কম।  যেমন প্রতিটি সিঙ্গাড়া ও পিঁয়াজু পাওয়া যায় এক টাকায়।

অন্য খাবারগুলোর দামও অনেক কম। শাহেদা নিজেই তৈরি করেন এসব খাবার। সঙ্গে চলতে থাকে বেচাবিক্রিও। দিন দিন বাড়ছে তার দোকানে ক্রেতার ভিড়।

রাজশাহী শহর থেকে তিন কিলোমিটার পশ্চিমে পদ্মা নদীর পারের একটি গ্রাম নবগঙ্গা।  পবা উপজেলার গ্রামটি রাজশাহী মহানগরীর রাজপাড়া থানা এলাকাধীন। এ গ্রামেরই বাসিন্দা শাহেদা বিবি। স্বামী আশরাফ আলী মারা গেছেন প্রায় দেড় যুগ আগে। তখন থেকে বাড়িতে ভাজাপোড়া খাবার তৈরি করে বিক্রি করছেন তিনি।

সোমবার বিকালে এই প্রতিবেদক সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসেন শাহেদার ব্যবসা-বাণিজ্য।  বিকাল সাড়ে ৪টা বাজতেই ঘরের দরজা ঠেলে উঠানে বেরিয়ে আসেন শাহেদা বিবি। একটি মাত্র চুলাতে তৈরি করতে শুরু করেন সিঙ্গাড়া, পিঁয়াজুসহ অন্যান্য খাবার।

সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজু ভাজা শেষ হওয়ার আগেই দোকানে ক্রেতারা এসে হাজির। দোকানের সামনে পেতে রাখা দুটি বেঞ্চে বসে তারা অপেক্ষা করতে থাকেন কড়াই থেকে ভাজা সিঙ্গাড়-পিঁয়াজু নামার। ইতিমধ্যে বেঞ্চ দুটি পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেকে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।

শাহেদা বিবি উঠানে পেতে দিলেন কার্পেটের বস্তা। সেখানেও বসে পড়লেন ক্রেতারা। কিছুক্ষণের মধ্যে শাহেদা বিবির সিঙ্গাড়া, পিঁয়াজু ভাজা শেষ হলো। সবার হাতে হাতে তিনি তুলে দিলেন খাবারগুলো। শাহেদা বিবি জানান, এমন চিত্র এক দিনের নয়, প্রতিদিনের। দোকানের নামডাক ছড়িয়ে পড়ায় ইদানীং শহর থেকেও অনেকে তার কাছে আসছেন  সিঙ্গাড়া খেতে।

এক টাকার সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজু ছাড়াও কম দামে চপ, নিমকি, বেগুনি আর ছোলাভাজা পাওয়া যায় শাহেদার দোকানে। প্রতিটি আলুর চপের দাম নেওয়া হয় তিন টাকা। আর রসুনের চপ পাঁচ টাকা। দোকানে প্রতিটি বেগুনির দাম দুই টাকা। এ ছাড়া নিমকি এবং ছোলাভাজা একসঙ্গে মিশিয়ে এক প্লেটের দাম নেওয়া হয় পাঁচ টাকা। সিঙ্গাড়ার পাশাপাশি শাহেদার দোকানের এই খাবারটিও বেশ জনপ্রিয়।

কাজের ফাঁকে ফাঁকে শাহেদা বিবি জানান, তার স্বামী রিকশা চালাতেন। একবার কদিনের অসুস্থ্যতায় তিনি মারা গেলেন। মারা যাওয়ার আগে তিনি কোনো সম্পদ রেখে যেতে পারেননি। তাদের বাড়িটিও সরকারি খাসজমিতে। স্বামীর মৃত্যুর পর মেয়ে রাশেদা খাতুনকে নিয়ে শাহেদা পড়েন বেকায়দায়। ওই সময় জীবিকার তাগিদে ছোট্ট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাড়িতে ভাজাপোড়া খাবার তৈরি ও বিক্রি শুরু করেন।

তখন বাড়ির সামনে অন্য কোনো দোকানপাট ছিল না। ধীরে ধীরে বেশকিছু দোকান গজিয়ে উঠল। এখন জায়গাটি ‘নবগঙ্গা মোড়’ নামে পরিচিত। কয়েক বছর হলো শাহেদা তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র মেয়েকে তিনি অবশ্য শ্বশুরবাড়ি যেতে দেননি। জামাইসহ মেয়েকে বাড়িতেই রেখেছেন। জামাই বাজার থেকে শাহেদার দোকানের মালসামানা কিনে এনে দেন। বাড়িতে সহযোগিতা করেন মেয়ে। আর দোকান চালান পঞ্চোশোর্ধ্ব শাহেদা।

শাহেদা জানান, শুরু থেকেই তার দোকানের সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজুর দাম এক টাকা। অন্য খাবারগুলোর দামও তাই ছিল। কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলোর দাম আর এক টাকা রাখা যায়নি। তবে সিঙ্গাড়া আর পিঁয়াজুর আকার একটু ছোট করে সেগুলোর দাম এক টাকাই রাখা হয়েছে। আকার কিছুটা ছোট হলেও তার ক্রেতার সংখ্যা কমেনি।

সোমবার বিকালে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কাশিয়াডাঙ্গা এলাকা থেকে শাহেদার দোকানে সিঙ্গাড়া খেতে এসেছিলেন জামিল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমরা দোকানটির নাম রেখেছি ‘এক টাকার বাজার’। আগে প্রতিদিন আসতাম। বিকেল হলেই বন্ধুদের বলতাম- চল, এক টাকার বাজার থেকে ঘুরে আসি। ব্যস্ততার কারণে এখন একটু কম আসা হয়।’

এক টাকায় সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজু পাওয়া যায় শুনে দোকানে প্রথম গিয়েছিলেন রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়াপাড়ার কলেজছাত্র শাহরিয়ার শাকিল। তিনি বলেন, ‘এক টাকায় এখন কী পাওয়া যায়! এক টাকার যুগ আছে! দোকানটির কথা জানতে পেরে কৌতূহল নিয়ে বন্ধুরা সব একসঙ্গে এসেছি। খাবারগুলোর স্বাদও ভালো। সময় পেলে আবার আসব।’

প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শাহেদার দোকান খোলা থাকে। শাহেদা প্রতিদিন বিক্রি করেন প্রায় ৩০০ সিঙ্গাড়া, রসুনের চপ ৩০টি, আলুর চপ ৫০টি, ৪০টি বেগুনি, এক কেজি ছোলাভাজা এবং কিছু নিমকি। বেচাবিক্রি হয় প্রায় এক হাজার ৪০০ টাকার। এর মধ্যে শাহেদার লাভ থাকে প্রায় ৩০০ টাকা। এ আয় দিয়ে মেয়ে-জামাইয়ের সংসারে সহায়তা করেন শাহেদা।

সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজুর দাম এক টাকা ধরে রাখতে পারাটা একটা আনন্দের ব্যাপার বলে জানান সংগ্রামী এই নারী। তিনি বলেন, ‘একটা সময় যখন খুব অসহায় ছিনু, তখন এই ব্যবসাটাই জীবন চালাইছে। তাই এখুনও ব্যবসাটা চালাছি। দাম কমের কারণে লাভ হয় একটু কম। কিন্তু লাভ যাই হোক, এ দিয়ে সংসারে ঠেকা দিতে পারছি, এটাই বড় কথা।’

শাহেদার ব্যস্ততা দেখতে দেখতে বাড়ির সামনের আট ফুট উঁচু বাঁধের রাস্তাটার ওপাশে হারিয়ে যায় ক্লান্ত সূর্যটা। নেমে আসে অন্ধকার। আরও ব্যস্ততা বাড়ে শাহেদার। জমে ওঠে বিকিকিনি। শাহেদার সামনে ১০ টাকার একটা নোট ধরে একজন বললেন, ‘পাঁচটা-পাঁচটা সিঙ্গাড়া-পিঁয়াজি দ্যাও খালা, বাড়ি লিয়্যা যাবো।’

(ঢাকাটাইমস/৭ফেব্রুয়ারি/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত