শচীন দেব বর্মণ

তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন

হাসান জাবির
 | প্রকাশিত : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১২:১৭

বাংলা গানের কিংবদন্তিতুল্য জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী শচীন দেব বর্মণ। যিনি একই সঙ্গে বাংলা ও হিন্দি গানের সুরকার ও সংগীত পরিচালক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন।

তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের চন্দ্রবংশীয় রাজ পরিবারের সন্তান শচীন দেব বর্মণ। সংক্ষেপে এস ডি বর্মণ যিনি ছোট কর্তা নামেই সমধিক পরিচিত।

পয়েলা অক্টোবর ১৯০৬ সালে কুমিল্লা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই সংগীত প্রতিভা। মাত্র দুই বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। ত্রিপুরার মনিপুরী রাজকন্যা নিরুপমা দেবী ছিলেন তার মা।

এই সংগীত প্রতিভার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হয় ত্রিপুরায় একটি বোর্ডিং স্কুলে। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে কুমিল্লা জিলা স্কুলে ভর্তি করা হয়।

১৯২০ সালে মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এর দুই বছর পর ১৯২২ সালে তিনি কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আইএ ও ১৯২৪ সালে একই কলেজ থেকে বিএ পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ ভর্তি হন। কিন্তু সংগীতের প্রতি অপার টানে তিনি এমএ পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। এসময় তিনি সংগীতের ওপর আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু করেন। স্থায়ী বসতি গড়েন কলকাতায়।

এসময় তিনি একটানা প্রায় দীর্ঘ পাঁচ বছর ওস্তাদ কে সি দে-র তত্ত্বাবধানে সংগীত শিক্ষা গ্রহণ করেন। যদিও ওস্তাদ বাদল খান ও ওস্তাদ বিশ্বদেব চট্টোপাধ্যায়ের ছাত্র এস ডি বর্মণ পরবর্তীতে ওস্তাদ আফতাব উদ্দিন খানের খানের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন।

এর আগে শৈশবে পারিবারিক পরিম-ল তার সংগীত অনুরাগের বিকাশ ঘটাতে সহায়তা করেছিল। তার বাবা সেতারাবাদক নবদ্বীপ চন্দ্র বর্মণের কাছেই এস ডি বর্মণের সংগীত শিক্ষার হাতেখড়ি হয়।

তিনি ১৯২৩ সালে প্রথম বেতারে গান গেয়েছিলেন আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে। সংগীতের ওপর বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ শেষে ১৯৩২ সালে এস ডি বর্মণ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান গাওয়া শুরু করেন।

ওই বছরই প্রথম শচীন দেব বর্মণের গান রেকর্ড করা হয়। তার প্রথম রেকর্ডকৃত গান দুটি ছিল-‘ডাকিলে কোকিল রোজ বিহানে’ ও ‘এ পথে আজ এসো প্রিয়।’ গান দুটির গীতিকার ছিলেন যথাক্রমে এইচ কুমার রায় ও শৈলেন রায়।

এর মাত্র দুই বছর পর ১৯৩৪ সালে ইন্ডিয়ান ক্লাসিক্যাল মিউজিক কনফারেন্সে গান গেয়ে এস ডি বর্মণ নিজের সংগীত প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে তার পারফরম্যান্স উপস্থিত দর্শক- শ্রোতা সংগীত বোদ্ধাদের অবাক করে দেয়। এরপর থেকেই তার নাম ছড়িয়ে পড়তে থাকে ভারতীয় সংগীতাঙ্গনে।

অন্যদিকে ১৯৩৭ সালে বাংলা সিনেমায় প্লেব্যাক করার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীত ক্যারিয়ার শুরু করেন এই মিউজিক লিজেন্ড। পরবর্তীতে বলিউডের সিনেমায় তিনি নিয়মিত মিউজিক পরিচালনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।

১৯৩৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারে প্রায় একশ সিনেমার সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। এই সময়ে তিনি গেয়েছেন বিভিন্ন ভাষার অসংখ্য গান। এছাড়াও তিনি ১৪টি হিন্দি ও ১৩টি বাংলা সিনেমায় গান করেছেন।

ব্যতিক্রম সুর, ছন্দ আর যন্ত্রের অন্যান্য ব্যবহার ইত্যাদি কারণে শ্রোতাদের কাছে এস ডি বর্মণের গানের স্বাদ বরাবরই ভিন্ন। যে কারণে সবসময়ের শ্রোতাদের কাছে সমান জনপ্রিয় শচীন দেব বর্মণের গান বাংলা সংগীতকে করেছে সমৃদ্ধ। ভরাট কণ্ঠে তার জাদুকরি সুরে প্রেম আর বিরহের সব গান শ্রোতাদের আজও বিমুগ্ধ করে রাখে...।

বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে... তুমি যে ফাগুন রঙেরও আগুন
তুমি যে রসেরও ধারা
তুমি এসেছিলে পড়শু কাল কেন আসনি
নিশীতে যাইও ফুলও বনে
তাকদুম তাকদুম বাজাই
শোন গো দখিনু হাওয়া অথবা
বিরহ বড় ভালো লাগে...

এই গানগুলো আজো শ্রোতাদের মনের গভীরতর আবেগকে নাড়া দিয়ে সব বয়সী মানুষের কাছে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে। অসাধারণ এই সংগীত প্রতিভার প্রতিটি গানই বৈচিত্র্যতায় পরিপূর্ণ। অন্যদিকে শিল্পীর গাওয়া বিখ্যাত ‘নিশীতে যাইও ফুল বনে’ দেহতত্ত্বের এই গানটি প্রেমের গানে রূপান্তর করে দিয়েছিলেন পল্লীকবি জসীম উদদীন। শিল্পী এস ডি বর্মণের বিশেষ আগ্রহ ছিল উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের পল্লীগীতির ওপর। ত্রিশের দশকে বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি আকাশবাণী কলকাতায় নিয়মিত পল্লীগীতি গাইতেন। সমসাময়িক সংগীতের রথী-মহারথীদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।

কৈশোরের উত্তাল সময়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত আড্ডা দিতেন কুমিল্লার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। ওই সময়ে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক পরিম-ল বিকাশে ঠাকুরপাড়ার সুরলোক, কান্দিরপাড়ার সবুজ সংঘ নাট্যদলের ছিল অগ্রণী ভূমিকা। এস ডি বর্মণ ছাড়াও কুমিল্লার এসব সাংস্কৃতিক ক্লাবের আড্ডায় নিয়মিত আসতেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, হিমাংশু দত্ত, মোহিনী চৌধুরী ও চলচ্চিত্র পরিচালক সুশীল মজুমদার।

তিনি নিজ বাড়িতেও বেশ কিছুদিন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্য পেয়েছেন। ব্যক্তিজীবনে নির্লোভী, নিরহংকারী এস ডি বর্মণ সংগীতের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসার কারণে জীবনে অনেক কিছুই ত্যাগ করেছেন। নিজে রাজ পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও খুব সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি।

১৯৩১ সালে তার পিতা তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্য সরকারের প্রধানমন্ত্রী নবদ্বীপ চন্দ্র বর্মণ মারা যান। এসময় এস ডি বর্মণকে বড় সরকারি পদে কাজ করার প্রস্তাব দেওয়া হলে তিনি সানন্দে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। এমনকি সে সময় তিনি সরকারি সুবিধায় পাওয়া নিজের বাড়িটি পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে উঠেছিলেন ভাড়া বাড়িতে। তার নিজের লেখা ‘সরগমের নিখাদ’ আত্মজীবনী গ্রন্থে তিনি অবলীলায় জীবনের এইসব দিক তুলে ধরেছেন। তিনি আত্মজীবনী গ্রন্থে আরও লিখেছেন যে, ভাইদের ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি রাজনীতিতে জড়াননি। এর চেয়ে সংগীত ভালোবেসে নিজের উপার্জনের মাধ্যমে সাধারণ জীবনই আমার আরাধ্য।’ সংগীত ভালোবেসে পৈতৃক রাজ সুবিধা থেকে নিজেকে স্বেচ্ছায় বঞ্চিত করে অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন এই মানবিক গায়ক।

১৯৩৭ সালে এস ডি বর্মণ নিজের ছাত্রী বিখ্যাত গীতিকার ও শিল্পী মীরা দেবীকে বিয়ে করেন। তাদের সন্তান রাহুল দেব বর্মণও একজন জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী। এস ডি বর্মণ স্ত্রী মিরা দেব বর্মণের লেখা গান নিয়মিত গেয়েছেন। কে যায়রে ভাটির নাও বাইয়া, শোন গো দখিনু হাওয়া, বর্ণে গন্ধে ছন্দে গীতিতে ইত্যাদি জনপ্রিয় গানের গীতিকার তার স্ত্রী মীরা দেব বর্মণ।

১৯৭৫ সালের ৩১ অক্টোবর এই গুণী সংগীত শিল্পীর জীবনাবসান ঘটে। এর আগে একটি জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি দীর্ঘ পাঁচ মাস কোমায় ছিলেন। মৃত্যুর আগে প্রায় ৪২ বছরের সংগীত ক্যারিয়ারের স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। ১৯৭০ ও ১৯৭৪ সালে দুবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে পেয়েছিলেন এশিয়া ফিল্ম সোসাইটি পুরস্কার। ১৯৫৮ সালে জিতেছিলেন সংগীত একাডেমি পুরস্কার। কিংবদন্তি এই শিল্পী আমাদের সম্পদ। তার গান বাংলা গানের আর্কাইভসকে সমৃদ্ধ করে রেখেছে। জনপ্রিয় এই গায়ক-সংগীত পরিচালকের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

হাসান জাবির: কবি ও কলামিস্ট

(ঢাকাটাইমস/১১ফেব্রুয়ারি/এজেড)

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত