শেষের পথে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৯:২৪ | প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:০৫

প্রায় ১০ বছর ধরে চলা একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার শেষ হওয়ার পথে। ৪৯ আসামির মধ্যে এরই মধ্যে ২১ জনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। যুক্তি দিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষও। প্রতি সপ্তাহেই দুই বা তিনটি কার‌্যদিবস যুক্তি উপস্থাপন করা হচ্ছে। আর বেশিরভাগ আসামিপক্ষে এক দিনেই শেষ হচ্ছে যুক্তি উপস্থাপন।

এই মামলার ৫২ আসামির মধ্যে তিন জনের মৃত্যুদণ্ড কার‌্যকর হয়েছে অন্য মামলায়। এখন আর ২৮ জন আসামির পক্ষে যুক্তি দেয়া বাকি আছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা ঘটে। প্রকাশ্য জনসভায় নজিরবিহীন হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং কয়েকশ নেতা-কর্মী আহত হন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সে সময়কার বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য ছোড়া গ্রেনেড থেকে নেতারা তাকে রক্ষা করেন মানববর্ম বানিয়ে। নেত্রীকে বাঁচাতে গিয়ে জীবন দেন তার একজন দেহরক্ষী।

শুরু থেকেই এই হামলার জন্য সে সময় ক্ষমতায় থাকা বিএনপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ করে আসছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু ওই আমলে সরকার মামলাটি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সে সময় জজ মিয়া নামে নিরীহ একজনকে আসামি সাজিয়ে তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা ফাঁস হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমছে। এ ছাড়া তখন সরকারের বিরুদ্ধে মামলার আলামত ইচ্ছা করেই নষ্ট করার অভিযোগ উঠে। সে সময়ের জোট সরকার যুক্তরাজ্যের তদন্ত সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানালেও তারা সরকারের অসহযোগিতায় বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যায়।

পরে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তদন্তের জট খুলতে শুরু করে। ২০০৮ সালের ১১ জুন ২২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে প্রথম অভিযোগপত্র দাখিল করে সিআইডি। এতে শেষে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুর সালাম মিণ্টু ও তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিনকে আসামি করা হয়।

ওই বছর ২৯ অক্টোবর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে ট্রাইব্যুনাল। ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনে অধিকতর তদন্তের নির্দশ দেয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ২০১১ সালের ৩ জুলাই তদন্ত শেষে তারেক রহমাসসহ আরও ৩০ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি।

২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ৩০ আসামির অভিযোগ গঠন করে ফের সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।

অর্থাৎ প্রকাশ্যে ঘটা এই ঘটনার বিচার শুরু হতেই লেগে যায় প্রায় চার বছর। আর আরও সাড়ে নয় বছর শুনানি চলার পর শুরু হয় যুক্তি উপস্থাপন।

তবে যুক্তি উপস্থাপন ‍শুরু হওয়ার পর বেশ গতি পেয়েছে মামলাটি।

গত বুধবার ছিল এ মামলায় যুক্তিতর্ক পেশ করার ৪৫ তম দিন। এ মামলার আসামি হোসাইন আহমেদ তামিমের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন তার আইনজীবী মোহাম্মদ আহসান। আর এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো ২১ জনের যুক্তি। মামলার পরবর্তী তারিখ ঠিক করা হয়েছে আগামী ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি।

রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিনের আদালতে এ মামলার বিচার চলছে।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর থেকে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক শুরু হয় এ মামলায়। গত ১ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২৬ দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি সৈয়দ রেজাউর রহমান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। মামলাটিতে ৪৯ আসামির সবার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।

যাদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই পলাতক মাওলানা তাজউদ্দিন, প্রমুখ।

রেজাউর রহমান বলেন, ‘আমরা আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছি। সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।’

রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী বলেন, ‘এই হামলার সঙ্গে চারটি জঙ্গি সংগঠন জড়িত। বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই এই হামলা হয়।’

যুক্তিতর্কে রাষ্ট্রপক্ষ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক, বিভিন্ন সরকারি ও প্রশাসনিক সহযোগিতার তথ্য-প্রমাণ পেশ করে। তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় বনানীর হাওয়া ভবন, বিএনপি-জামায়াত সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর সরকারি বাসভবনসহ ষড়যন্ত্রমূলক সভার স্থানসমূহ তথ্য-প্রমাণের আলোকে তুলে ধরা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি উপস্থাপন শেষ করার পর ১৯ কার‌্যদিবসে যুক্তি উপস্থাপন করেছে ২১ জন। এতে সময় লেগেছে দেড় মাসের মতো। অর্থাৎ কোনো কোনো দিন দুই জনের পক্ষেও যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে বাকি ২৮ জনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন আরও দুই থেকে আড়াই মাসের মধ্যে শেষ করা যাবে।

আর যুক্তি উপস্থাপন শেষ হলে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তাদের বক্তব্য রাখার সুযোগ পাবে। এরপর ঘোষণা করা হবে রায়ের তারিখ।

মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ২২৫ জন সাক্ষী (পিডব্লিউ) ও আসামিপক্ষে ২০ জনের সাফাই সাক্ষ্য (ডিডব্লিউ) পর্যালোচনা করে আদালতে যুক্তিতর্ক পেশ করেন।

এই মামলার আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা তারেক রহমানসহ ১৮ জন আসামি পলাতক। আর যেহেতু মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তাই তাদের পক্ষে রাষ্ট্র আইনজীবী নিয়োগ করেছে।

তারেক রহমানের পক্ষেও এই মামলায় যুক্তি দিয়েছে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আবুল কালাম মো. আকতার। তিনি তারেকের খালাস দাবি করেছেন।

মামলাটিতে আসামি খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, শহিদুল হক ও খোদা বক্স চৌধুরী এবং মামলাটির তিন তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক বিশেষ পুলিশ সুপার রুহুল আমিন, সিআইডির সিনিয়র এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমান, এএসপি আব্দুর রশীদ ও সাবেক ওয়ার্ড কমিশনার আরিফুল ইসলাম জামিনে রয়েছেন।

অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ২৩ জন কারাগারে রয়েছে। মামলার আসামি জামায়াত নেতা আলী আহসান মুহাম্মাদ মুজাহিদের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এবং হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি হান্নান ও শরিফ শাহেদুল ইসলাম বিপুলের ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর উপর হামলার মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে।

(ঢাকাটাইমস/১৬ফেব্রুয়ারি/এমএবি/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত