‘খালেদাকে আরেকটু ভালো জায়গায় রাখা যেত’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৩:১৪ | প্রকাশিত : ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১১:৩৫

দুর্নীতি মামলায় দণ্ড পাওয়া বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে এখন যেখানে রাখা হয়েছে এর চেয়ে ভালো জায়গায় রাখলে সরকারে ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হতো বলে মনে করেন ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় দায়িত্বপ্রাপ্ত আলোচিত ডিআইজি প্রিজন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী

সাবেক ডিআইজি প্রিজন বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে প্রথমে যেখানে রাখা হয় সেটা কারাগারের প্রশাসনিক এলাকা ছিল। আমার জানামতে সেখানে আগে কোনো বন্দীকে রাখা হয়নি। পরে যেখানে তাকে নেয়া হয় সেই জায়গাটি আগের চেয়ে ভালো। তবে তাকে আরেকটু ভালো জায়গায় রাখলে কোনো সমালোচনা হতো না এবং এতে সরকারের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হতো।’

বৃহস্পতিবার রাতে বেসরকারি টেলিভিশন ডিবিসি নিউজের ‘রাজকাহন’ নামের একটি টক শোতে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনায় আরও অংশ নেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশিদ এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন নবনিতা চৌধুরী।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন,কারাগারের কাজ হলো আদালতের আদেশ পালন করা। তাদের নিজেদের কিছু করার নেই। কারাগারের সবচেয়ে বড় দিক হলো মানবিক। কারাগারে আমরা বলে থাকি পাপকে ঘৃণা কর পাপীকে নয়।’

সাবেক এই কারা কর্মকর্তা বলেন, ‘তা সত্ত্বেও সব আইনে লেখা থাকে না। ব্যক্তিগত শ্রদ্ধাবোধ বলে একটা জিনিস আছে। কারা কর্তৃপক্ষ কখনও পক্ষপাতিত্ব করার কথা না। তবে অনেক সময় চাইলেও পারে না।’ তিনি বলেন, ‘জেলখানা সম্পর্কে মানুষের ততটা ধারণা নেই। এজন্য নিজের মতো করে বলে। অনেক সময় গুজবও ছড়ায়।’

একজন মন্ত্রীর জামাতা কারাগারে আছেন। তিনি সোফা-টিভি থেকে শুরু করে সব সুবিধা পাচ্ছেন। এটা কোনো বিধিতে পড়ে কি না? এমন প্রশ্নে সাবেক এই ডিআইজি প্রিজন বলেন, ‘এটা কোনোভাবেই জেল কোডে পড়ে না।’

তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াও ডিভিশন পেয়েছেন তিন দিন পরে। এটা আইনের কারণে হয়ত। তবে এটা না হলে ভালো হতো।’

ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের সময় দুই নেত্রীকে বন্দী করা হয়। তাদেরকে রাখা জাতীয় সংসদ ভবন এলাকার সাব জেলে। তাদের দায়িত্বে ছিলেন মেজর শামসুল হায়দার সিদ্দিকী। তিনি সেই সময়ের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে গিয়ে বলেন, ‘ওয়ান ইলেভেনের সময় তৎকালীন সরকার কখনও আমাকে বলেনি দুই নেত্রীকে কষ্টে রাখ। আশা করি এই সরকারও খালেদা জিয়াকে কষ্টে রাখতে বলেনি।’

‘কেমন আছেন খালেদা জিয়া’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে উপস্থাপক জানতে চান কয়েদিকে সবকিছু জানানোর বিধান আছে কি না? জবাব সাবেক এই ডিআইজি প্রিজন বলেন, ‘খালেদা জিয়া কারগারে থাকা অবস্থায় একবার তার বড়ছেলে তারেক রহমানের কপাল ফেটে গেল পড়ে গিয়ে। আমি সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে তাকে বিষয়টি জানাই। তাকে স্যার ও ম্যাডাম দুটিই বলতাম। বললাম, স্যার এই ঘটনা ঘটেছে। আপনি আতঙ্কিত হবেন না। আগে এভাবে বলে দেয়ার কারণ হলো পরদিন হয়ত তিনি সংবাদপত্রে এই খবর দেখে আতঙ্কিত হয়ে যেতেন।’

মেজর সিদ্দিকী বলেন, ‘এসব বন্দীর ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ যত ক্লিয়ার করবে তত মানুষের মন থেকে সন্দেহ দূর হবে। যা জানালে সমাজের বা রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি হবে না সেটা জানাতে সমস্যা কোথায়?’ তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, সবকিছু কারাবিধিতে উল্লেখ নেই। অনেক কিছু তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে করতে হয়।’

খালেদা জিয়ার ডিভিশন পাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৯২ সালের ২৮ ডিসেম্বরের একটা চিঠি আছে সেখানে বলা হয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ডিভিশন দেবে। এই নির্দেশনা অনুযায়ী কারা কর্তৃপক্ষ নিজে ডিভিশন দেয়ার অধিকার রাখত না। তবে বছরখানেক আগে একটি চিঠি এসেছে সেখানে প্রথম শ্রেণির কোনো নাগরিক জেলে এলে কারা কর্তৃপক্ষ ডিভিশন দিতে পারবে বলে উল্লেখ আছে।’

খালেদা জিয়াকে কেন কাশিমপুর বা কেরানীগঞ্জের কারাগারে নেয়া হয়নি এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়ে মেজর সিদ্দিকী বলেন, ‘খালেদা জিয়া একটি বড় দলের নেত্রী। তার লাখো-কোটি সমর্থক আছে। এত দূরে তাকে আনা-নেয়া করতে সমস্যা হতে পারে বিবেচনা করেই হয়ত কাছে রাখা হয়েছে।’

সরকার চাইলে বাসাকেও সাব জেল বানাতে পারত: ফিরোজ

আলোচনায় অংশ নিয়ে কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘সরকার ইচ্ছে করলে খালেদা জিয়ার বাসাকে জেল বানাতে পারত। আমরা ওয়ান ইলেভেনের সরকারকে অনেক গালাগাল করি। তারা কিন্তু তো দুই নেত্রীকে আলাদা জায়গায় রেখেছে। এটা সম্পূর্ণ নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছার ওপর।’

ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘আমাদের দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকেও জেলা নেয়া হয়েছিল। তার সঙ্গেও ভালো আচরণ করা হয়নি। তার সঙ্গে স্ত্রীকে পর্যন্ত অনেক সময় দেখা করতে দেয়া হতো না।’ রওশন এরশাদকে কারাগারে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

নিজের কারাজীবনের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে ফিরোজ রশিদ বলেন, ‘আমি স্বাধীন দেশের কারাগার আর পাকিস্তানের কারাগারেও গিয়েছি।  পাকিস্তান আমলে ১৯৬৮ সালে জেলে গেলাম। আমাকে একটা সেলে দিলো। যেখানে ফাঁসির আসামিদের রাখা হয়। পরীক্ষা দেব এই কথা বলায় আরেকটি সেলে দিলো। তখন আমা মা মারা গেছেন, স্ত্রীও আট মাসের মধ্যে আসেননি বা আসতে পারেননি। একবার স্ত্রী এলেন দেখা করতে। কারাগারে দায়িত্বরত একজন পুরো সময় আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। অথচ কারাগারের নিয়ম হলো স্ত্রী দেখা করতে এলে কাছে দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।’

পুরো রায়েই সরকারের হস্তক্ষেপ: ফারুক

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে যে রায় হয়েছে এর পুরোটাতেই সরকারের হস্তক্ষেপ রয়েছে বলে দাবি করেন জয়নুল আবদিন ফারুক। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে কথা বলতে অনেক কষ্ট হয়। একটা সার্টিফাইড কপি নিয়ে সরকার কী করছে তা সবাই দেখছে। বৃহস্পতিবার রায় দিয়েছে যাতে শুক্র ও শনিবার কিছু করতে না পারে। রবিবার কপির জন্য আমাদের আইনজীবী আবেদন করেছেন। সেই কপি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আমাদের বিশ্বাস সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া রায়ের কপি পেতে এত দেরি হওয়ার কথা না। মূলত এই রায়ের পুরোটাজুড়েই রয়েছে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ।’

খালেদা জিয়ার ডিভিশন পাওয়া নিয়ে তিনি বলেন, ‘কারা কর্তৃপক্ষ বলছে অনুমতি পেতে দেরি হয়েছে তাই ডিভিশন দিতে দেরি। কিন্তু তারা রায়ের আগেই সরকারি দলের নেতাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কারাগার প্রস্তুত করে রেখেছেন। এতেই বোঝা যায় কতটুকু হস্তক্ষেপ ছিল।’

ফারুক বলেন, ‘আমাদের নেত্রী আমাদের মা। তিনি কোটি কোটি বিএনপির নেতাকর্মীর মা। মাকে জেলে রেখে কেউ ভালো থাকতে পারে না। আমরাও ভালো নেই। আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছি। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই নেত্রী ও মাকে কারামুক্ত করবো।’

(ঢাকাটাইমস/১৬ফেব্রুয়ারি/জেবি) 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত