ইসলামি বিপ্লব ও ইরানের বর্তমান

মোহাম্মদ জমির
 | প্রকাশিত : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১০:০০

ইরানের সঙ্গে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর শত্রæভাবাপন্ন পরিস্থিতি এখনো রয়ে গেছে। এই ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনির সর্বশেষ বক্তব্যেও তা আবার উঠে এলো। এই ৮ জানুয়ারি জাতীয় বিমানবাহিনী দিবসে বিমানবাহিনীর কমান্ডার ও সদস্যদের এক সমাবেশে তিনি বলেন, মার্কিন সরকার হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জুলুমবাজ ও নিষ্ঠুর সরকার। কিন্তু মার্কিন সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ প্রচার চালায় যে, তারা মানবাধিকার, প্রাণী অধিকার ও মজলুমদের অধিকার রক্ষার পক্ষে। অথচ তারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে তৈরি করেছে, কখনো মদদ দিয়েছে। আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে।

খামেনি সেই দিন আরো বলেন, ফিলিস্তিনি জাতির বিরুদ্ধে ৭০ বছরের জুলুম-নির্যাতনের প্রতি সমর্থন এবং ইয়েমেনের নিরপরাধ মানুষ হত্যায় সহযোগিতার ঘটনা মার্কিন সরকারের জুলুমের স্পষ্ট প্রমাণ। ইরানের ইসলামি বিপ্লবকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শত্রুরা সব ধরনের উপায় অবলম্বন করছে। তারা নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি  সাইবারস্পেসকেও ব্যবহার করছে। এসবের মাধ্যমে ইসলামি বিপ্লবের ওপর থেকে মানুষের আস্থা ধ্বংস করতে চায়। কিন্তু শত্রæরা এ ক্ষেত্রেও ব্যর্থ হয়েছে। শত্রুদের সব অপচেষ্টা সত্ত্বেও ইসলামি বিপ্লব অটুট রয়েছে এবং ক্রমেই তা আরও জোরদার হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার অনুসারী দেশগুলো অবশ্যই ইরানের বিরুদ্ধে যড়যন্ত্র করছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের সামলাতে হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের এ দেশটিকে। তারা এখন পর্যন্ত ব্যর্থ। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সমস্যা সম্প্রতি ঝাঁকুনি দিয়ে গেছে ইরানকে। বিদায়ী বছরের ২৮ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই বিক্ষোভ শুরু হয় ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে। প্রথমে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ ও জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার দাবিতে এ বিক্ষোভের সূচনা ঘটে। পক্ষান্তরে ইরান সরকারের অভিযোগ বহিঃস্থ শক্তির ইন্ধনে বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন করছে। এ পর্যায়ে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিক্ষোভকারীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নিলে আন্দোলন রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপ্লবী বাহিনীর হুঁশিয়ারি সত্তে¡ও ক্রমেই উত্তাল ও কিছুটা মারমুখী হয়ে ওঠে বিক্ষোভের রূপ। এ পর্যায়ে পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে ওঠার আগেই সেখানে ব্যাপক ধরপাকড় শুরু হয়।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী চলমান বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন বেশ কিছু সংখ্যক আন্দোলনকারী। পাশাপাশি এ বিক্ষোভে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রেসিডেন্ট আহমাদিনেজাদকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে খবর এসেছে। এই খবর সত্যি হলে ধরে নিতে হবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নাজুক। শীর্ষ নেতৃত্বে এর মধ্যে পারস্পরিক আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। অভ্যন্তরীণ এ বিষয়টি নিয়েও ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাকযুদ্ধ হয়েছে। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বিক্ষোভকারীদের মদদ দিয়েছেন। একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ইরানকে ধ্বংস করছে দেশটির শাসকরা। এ অভিযোগ এনে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এমনকি স্বয়ং প্রেসিডেন্ট বিক্ষোভকারীদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ নাকচ করে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব তখন বলেছে, ‘ওয়াশিংটন কার্যত বিক্ষোভ উস্কে দিয়ে শত্রæতামূলক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য পরাশক্তি ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর পরস্পরবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় ইরানের সাম্প্রতিক বিক্ষোভ আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।’ তবে ঘরোয়া উত্তাপ প্রশমন করতে পেরেছে ইরান। এ অবস্থার শেষে তারা এখন ইসলামি বিপ্লবের ৩৯তম বার্ষিকী পালন করছে।

এই ফাঁকে এ বিপ্লবের ইতিহাস অবতারণা করব। ইসলামি বিপ্লব বা ইরানি বিপ্লব বা ১৯৭৯ সালের বিপ্লব নামেও পরিচিত। এটি ১৯৭৯ সালে ঘটা একটি যুগান্তকারী বিপ্লব, যা ইরানকে পাশ্চাত্যপন্থি দেশ থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে। এ বিপ্লবকে বলা হয় ফরাসি ও বলশেভিক বিপ্লবের পর ইতিহাসের তৃতীয় মহান বিপ্লব। ইরানের শেষ সম্রাট মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী। তার বংশ আড়াই হাজার বছর ধরে সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিল। শুরুটা করেছিলেন তারই পূর্বপুরুষ মহান কুরুশ আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে। সেই বংশের শেষ সম্রাট ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি বিপ্লবী দেশবাসীর কাছে পরাজিত হয়ে মিসর পলায়ন করে। কয়েক দশক আগে রেজা শাহ পাহলভী ছিলেন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান। সর্বময় ক্ষমতা ছিল পার্লামেন্টের হাতে এবং নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী সেই ক্ষমতা ভোগ করতেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই ইরানে ব্যাপক আকারে তেলক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়, যার মালিক ছিল ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো। ঠিক এই সময়টিতে মোসাদ্দেক নামক জনপ্রিয় এক রাজনৈতিক নেতা দেশের সব তেল সম্পদ জাতীয়করণের প্রতিশ্রæতি দিয়ে পার্লামেন্ট নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। ব্রিটেনে তখন উইনস্টন চার্চিল ক্ষমতায় আর যুক্তরাষ্ট্রে হেনরি ট্রুম্যান। মোসাদ্দেকের জয়লাভের ফলে দুই ক্ষমতাশালীর মাথায় বাজ পড়ল। শুরু হলো মুসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করার নীলনকশা। সেই পরিকল্পনায় ইরানি সেনাবাহিনীতে ঘটানো হলো অভ্যুত্থান। প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মাদ মুসাদ্দেক পদচ্যুত হলেন। তার স্থানে আজ্ঞাবহ জেনারেল ফজলু্ল্লাহ জাহেদীকে নিয়োগ দেওয়া হলো। অভ্যুত্থান, পাল্টা-অভ্যুত্থান আরো হলো। শেষ পর্যন্ত যাতে বিজয়ী হয় মার্কিন-ব্রিটেনের নীলনকশার অনুসারী চক্র। শাহ ইরানে ফিরে আসেন। ১৯৫৩ সালে ঘটে এসব। এরপর টানা ২৬ বছর ইরানের সর্বময় ক্ষমতা ছিল শাহের হাতে। কিন্তু পশ্চিমা আধুনিকতার নামে সেই সরকার অনেকটা ইসলামবিদ্বেষী হয়ে ওঠে। যার কারণে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিন দিন ফুঁসে উঠতে থাকেন। একপর্যায়ে তাদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থানে শাহের পতন হয়। ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রæয়ারি খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবীরা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। এর মাত্র দুই মাস পর দেশটিতে ৩০ মার্চ এক ঐতিহাসিক গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ওই গণভোটের মাধ্যমে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এখন ইসলামি বিপ্লবের পরিচয় বেশি সামনে এলেও ইরান ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক দিয়ে অনেক সমৃদ্ধ। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় পারস্য উপসাগরের তীরে এর অবস্থান। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে বর্তমান ইরান ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য পারস্যের কেন্দ্র। প্রায় ২০০০ বছর ধরে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা নিজেদের দেশকে ‘ইরান’ (ইরন্) নামে ডাকত। ইরান নামটি এই এলাকায় বসতি স্থাপনকারী আর্য গোত্রের নাম থেকে নেওয়া। কিন্তু গ্রিকরা এ অঞ্চলকে পাস্র্ (বর্তমান ইরানের ফার্স প্রদেশ) বলে ডাকত। সেখান থেকে ইউরোপীয় ভাষায় এর নাম হয় পার্সিয়া বা পের্সিয়া। ১৯৩৫ সালে ইরানের শাসক দেশটিকে কেবল ‘ইরান’ বলে ডাকার অনুরোধ জানানোর পর থেকে এখন এ নামেই সারা বিশ্বে দেশটি পরিচিত। ১৫০১ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রাজতন্ত্রী ইরান হয় শাহ কিংবা রাজারা শাসন করতেন। এরপর ইরানি বিপ্লবে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে এবং ইরানে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র স্থাপিত হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আমরা যে রাজনৈতিক উত্তাপ দেখি তার পেছনে মূলত সৌদি আরব ও ইরানের বৈরী সম্পর্ক অনেকাংশে দায়ী। এর কারণ আবার সুন্নি ও শিয়াদের দ্ব›দ্ব। সৌদি আরব সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর ইরান শিয়া অধ্যুষিত। এই দুই গোত্রের দ্ব›দ্ব বহু পুরোনো। হালে যা মুসলিম অনৈক্য আরো বৃদ্ধি করেছে। তবে তুরস্ক এই দ্ব›দ্ব মিটিয়ে মুসলিমদের একই কাতারে আনতে চাইছে। এক্ষেত্রে আমরা দেখি দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান বলছেন, সুন্নি বা শিয়া নামে কোনো ধর্ম নেই, আমাদের ধর্ম একটাই, সেটা হলো ইসলাম। পশ্চিমা দেশগুলো মুসলমানদের বিভক্ত করার চেষ্টায় লেগে আছে বলে তিনি মনে করছেন। এ বিষয়টি বুঝতে হবে ইরান ও সৌদি আরব উভয়কেই। আপাতত আমরা দেখছি ইরান ও তুরস্ক সম্পর্ক ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইরান সফর করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত চাভুসওগ্লু। তিনি ৭ জানুয়ারি ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানির সঙ্গে দেখা করেন। বৈঠকে হাসান রুহানি ইরান, তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এর ফলে সিরিয়ার ঐক্য ফিরিয়ে আনা যাবে এবং সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করে দেশটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠা সহজ হবে। অন্যদিকে সেই বৈঠকে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইরান ও তুরস্কের মধ্যকার বেড়ে চলা সুসম্পর্ক নষ্ট করার জন্য আমেরিকা এ অঞ্চলে নতুন ষড়যন্ত্র করছে। মার্কিন ষড়যন্ত্র মোকাবেলার জন্য তেহরান ও আঙ্কারার মধ্যে সক্রিয় সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি বলে তিনি মনে করছেন। তবে ইরান ও তুরস্কের সম্পর্কোন্নয়ন সৌদি আরব ও ইসরাইল ভালো চোখে দেখছে না−তা নিশ্চিত করে বলা যায়।

মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব তার প্রভাব ব্যাপকভিত্তিক করতে চায়। যার প্রধান বাধা ইরান। আবার ইসরাইলও রাষ্ট্র হিসেবে প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে টিকে থাকার জন্য ইরানের ধ্বংস চায়। কারণ ইরানই তাদের জন্য চোখ রাঙানি নিয়ে সবলে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি সৌদি আরব পর্যন্ত আড়ালে-আবডালে মার্কিন বলয়ের ইসরাইলের প্রতি বিভিন্ন ইস্যুতে অনুকম্পা দেখায়। ইরান এটা আঁচ করতে পেরেই ইহুদি রাষ্ট্রটির প্রতি চাপ বজায় রাখতে চাইছে। সর্বশেষ আমরা দেখছি ইরানের ইসলামি বিপ্লবি গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি’র মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রমাজান শরিফ বলেছেন, ইসরাইল এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ইরানের সামরিক সÿমতা অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় তেহরানের মোকাবেলায় তেল আবিব অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। জেনারেল শরিফ ৭ জানুয়ারি ইসলামি বিপ্লবের ৩৯তম বিজয়বার্ষিকী উপলক্ষে সামরিক খাতে নয়া অর্জন প্রদর্শনীর এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন। শত্রæর চতুর্মুখী নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান সামরিক খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে−এই কথা উলেøখ করে জেনারেল শারিফ বলেন, বহিঃশক্তির প্রতি বিন্দুমাত্র নির্ভরশীল না হয়ে প্রতিরক্ষা শক্তি, সামরিক পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের দিক দিয়ে ইরান এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক নম্বর দেশে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের ঘটনাবলিতে ইরানের সামরিক শক্তি সম্পর্কে বিশ্ববাসী কিছুটা হলেও আঁচ করতে পেরেছে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে পরমাণু ইস্যুকে সামনে রেখে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলো ইরানকে যথারীতি চাপে রাখতে চাইছে। কিন্তু এ নিয়েও আর কোনোভাবেই মাথা নিচু করতে রাজি নয় ইরান। এ বিষয়ে গত সপ্তাহেই প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে তার দেশের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের স্বাক্ষরিত পরমাণু সমঝোতা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, এ চুক্তির বিষয়বস্তুতে একটি লাইনও বাড়ানো কিংবা কমানো হবে না। পরমাণু সমঝোতায় সংস্কার করা না হলে তা বাতিল করা হবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে ফের নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হবে বলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, তাতে ইরানের অবস্থান কী হবে−জাপানের সাংবাদিকের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেছেন, ‘তেহরান প্রথমে পরমাণু সমঝোতা লঙ্ঘন করবে না।’ তিনি বলেন, ‘চুক্তিতে একটি বাক্যও কমানো হবে না কিংবা বাড়ানোও হবে না।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত পরমাণু সমঝোতায় ইরানের স্বার্থ নিশ্চিত করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তেহরান এটি মেনে চলবে এবং আমেরিকা চুক্তিতে অটল থাকুক কিংবা বেরিয়ে যাক, তাতে ইরানের সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

পরমাণু সমঝোতায় পরিবর্তন আনা এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবের বিষয়ে আমেরিকার এনবিসি টিভি চ্যানেলের এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট রুহানি বলেন, ‘আমেরিকাসহ আরো কয়েকটি দেশ গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরির পেছনে ছুটলেও ইরানের এ ধরনের কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু আত্মরক্ষার জন্য ইরানের প্রচলিত অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে এবং তা তৈরি করা হবে। তাই এ বিষয়ে তেহরান কারো সঙ্গে কোনো সংলাপে বসবে না।’ এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১২ জানুয়ারি তৃতীয়বারের মতো পরমাণু বিষয়ে ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়াসংক্রান্ত বিলে সই করেছেন। অর্থাৎ পরমাণু সমঝোতা বহাল থাকবে। কিন্তু তিনি বলেছেন, পরবর্তী সময়ে পরমাণু সমঝোতায় পরিবর্তন আনা হলে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলে তবেই কেবল তিনি ওই সমঝোতা বহাল রাখবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরো বলেছেন, মার্কিন কংগ্রেস ও ইউরোপ যদি এ শর্তগুলো পূরণ না করে তাহলে তিনি ইরানবিরোধী নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখাসংক্রান্ত বিল নবায়ন করবেন না। অর্থাৎ পরমাণু সমঝোতা থেকে তিনি বেরিয়ে যাবেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনি প্রচারণার সময় পরমাণু সমঝোতার বিরুদ্ধে তার অবস্থান ঘোষণা করেছিলেন। তখন হুমকি দিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে তিনি পরমাণু সমঝোতা ছিঁড়ে ফেলবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি পরমাণু সমঝোতা ছিঁড়ে ফেলেন তাহলে আমরাও তাতে আগুন ধরিয়ে দেব। তারপরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট উসকানিমূলক নানা বক্তব্য দিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ইরান আপাতত তুরস্ক ও রাশিয়া বলয়ে থেকে সবল অবস্থান ধরে রাখার দিকেই নজর দিচ্ছে। এ কারণেই দেশের ভেতরে বা বাইরের চাপ সামলে ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে তাদের অবস্থা আরো অনেক দিন ধরে রাখতে পারবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে অভ্যন্তরীণ বিরোধ মোকাবেলায় তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বেকারত্ব বিমোচনে আরো বেশি পদÿেপ নিতে হবে। ইরান সরকার সে পথে হাঁটবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

মোহাম্মদ জমির: সাবেক রাষ্ট্রদূত প্রধান তথ্য কমিশনার

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত