বিএসএমএমইউর ভোগান্তি রোগনির্ণয় ফি নিয়ে ছোটাছুটি

জহির ‍রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২১:৩২ | প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৭:৪১

ফরিদপুর থেকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) পায়ের চিকিৎসা নিতে এসেছেন যুবক মো. ফারুখ হোসেন। তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ছোটাছুটি করছেন এই ব্লক ওই ব্লক। সকাল থেকে এভাবে ছুটছেন তিনি।

কখনো পরীক্ষার জন্য, কখনো টাকা জমা দেয়ার জন্য। তার আগে সেই ভোর থেকে ফি জমা দেয়ার লাইন আর চিকিৎসক দেখানোর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মেঝেতে বসেই পড়েছিলেন। 

ফারুখ হোসেন বলেন, ‘সকাল থেকে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে গেছে। এসেছি পায়ের চিকিৎসা নিতে, ডাক্তার দেখাতে, এখন তো চিকিৎসা নেয়ার প্রস্তুতিতেই কাহিল হয়ে পড়লাম্।’

চিকিৎসকের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় সব জেনে তিনি কতগুলো পরীক্ষা করাতে দিয়েছেন ফারুখকে। তার সঙ্গে আর কেউ নেই। তাই সেগুলোর টাকা জমা দিতে নিজেই ছোটেন। একেকটা পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদা জায়গা। টাকা জমাও দিতে হয় ভিন্ন জায়গায়। তার আগে পরীক্ষার ফি কত তা জানতে হয় আরেক জায়গায়।

এসব ভিন্ন জায়গার ব্যবস্থা যে একই ভবনে তা নয়। এক ভবন থেকে আরেক ভবনে, নানা গলিঘুপচি, এ মাথা থেকে ও-মাথা।

দেশের একমাত্র চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়টির চিকিৎসার মান নিয়ে অনেক ভরসা সাধারণ মানুষের। প্রতিদিন ভোরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বহু মানুষ এখানে আসে নানা রোগের চিকিৎসা নিতে। সকাল থেকে দুপুর পর‌্যন্ত সেখানে একটি নিত্যচিত্র- নানা বয়সী মানুষের হন্তদন্ত ছোটাছুটি।

সোমবার সকাল থেকে এই প্রতিবেদক সরেজমিনে ছিলেন দুপুর পর‌্যন্ত। এই সময়ে তিনি মূলত রোগীদের এই ভোগান্তিই প্রত্যক্ষ করেছেন। হাসপাতালের বি ব্লক থেকে এ ব্লকের দিকে এক নারী তার সন্তানকে কোলে নিয়ে ছুটছেন। হাতে ধরা একটি প্রেসক্রিপশন। পথে পানি পড়ে থাকায় সেখানে পিছলে পড়ে যান তিনি। এক হাতে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আরেক হাতে ডান পা চেপে ধরেন। পাশে পড়ে থাকে প্রেসক্রিপশন আর কটি রঙিন পাতা, রোগপরীক্ষার তালিকা। খানিক এভাবে বসে থেকে পরে উঠে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যেতে থাকেন।

লেখার শুরুতে যে ফারুক হোসেনের কথা বলেছি, তিনি পড়াশোনা শেষ করে এখন চাকরি খুঁজছেন। তিনি বলেন, ‘২০০০ সাল থেকে আমার পা মাঝে মাঝেই ফুলে উঠত। আজ এখানে চিকিৎসা নিতে এসেছি। এ হাসপাতালের চিকিৎসা ভালো। কিন্তু সে চিকিৎসা নিতে কত যে ভোগান্তি পোহাতে হয়! টাকা জমা দিতেই যেতে হয় কয়েক জায়গায়।’

ভোরে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করে সেটা নিয়ে আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো ডাক্তার দেখানোর জন্য। কোনো পরীক্ষা না দিলে তো ভালো, যদি একাধিক পরীক্ষার পরামর্শ দেয়া হয়, তাহলে শুরু হয় দ্বিতীয দফা ভোগান্তি। কোন রিপোর্টের জন্য কত টাকা লাগবে, সেই কাগজের জন্য আবার লাইনে দাঁড়ানো। এই কাগজ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফির টাকা জমা দিতে আরেক জায়গায় লাইনে দাঁড়ানো। আবার রক্ত পরীক্ষার জন্য এক জায়গায় টাকা জমা, এক্সরের জন্য এক জায়গায়- এভাবে বিভিন্ন পরীক্ষার জন্য আলাদা আলাদা জায়গায় ব্যাংকে টাকা জমা দিতে গিয়ে  সেখানেও দীর্ঘ লাইন। এরপর আলাদা আলাদা জায়গায় গিয়ে আবার রক্তের নমুনা জমা, রিপোর্ট সংগ্রহ করা।

রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে করানোর ঝক্কিটা দেখুন। রক্ত পরীক্ষা করতে হয় আউটডোর বিল্ডিংয়ের আন্ডার গ্রাউন্ডে (আজিজ সুপার মার্কেট সংলগ্ন), সেখানে টাকা জমা দেয়ার জন্য বুথ আছে। আর এক্স-রের জন্য যেতে হয় সেখান থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে বি-ব্লকের পূর্বে রেডিওলজি বিভাগে। সেখানে এক্স-রের টাকা জমা নেওয়া হয় ও পরীক্ষা করতে হয়। আর এ এক্স-রের রিপোর্ট নিতে যেতে হয় সেখান থেকে ২০০ মিটার দূরে কেবিন ব্লকের পেছনের দিকে, যেখানে নতুন টিনশেট ভবন করা হয়েছে।

এভাবে অন্যান্য পরীক্ষার জন্য টাকা জমা, পরীক্ষা আর রিপোর্ট নিতে নানা ভবনে ছুটতে হয় রোগী ও তার স্বজনদের।

একের জন্য তিন

এই ভোগান্তি থেকে বাঁচতে কেউ কেউ কোশলী হন। তাদের বেশির ভাগ পূর্ব-অভিজ্ঞতা পাওয়া। যেমন মাহবুবুর রহমান। তিনি সঙ্গে তিনজন নিয়ে এসেছেন। তারা সবাই একেক জায়গায় লাইন মেনটেইন করেন।

মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘বেসরকারি মেডিকেলের চেয়ে তুলনামূলক কম টাকায় রোগ নির্ণয় ও পরীক্ষা করানো যায় এখানে। কদিন আগে আমার চোখের অপারেশন হয়। তখন অপারেশনের আগের সব পরীক্ষা এখানে করেছি। সে সময় তিনজন এসেছিলাম আমরা। বিভিন্ন রিপোর্ট করার জন্য তিনজন লাইন মেনটেইন করি।’

বিএসএমএমইউতে চিকিৎসা নিয়ে খুব একটা অভিযোগ না থাকলেও এই রোগ নির্ণয়ের ছোটাছুটি নিয়ে ক্ষুব্ধ রোগী ও স্বজনরা।

সরেজমিনে এই প্রতিবেদক যতজন রোগী ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছেন, সবাই রোগ নির্ণয় আর টাকা জমা দেয়ার ছোটাছুটিকে বলছেন সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা। তাদের দাবি অন্তত সব ধরনের রোগনির্ণয় ও পরীক্ষার ফি জমা নেয়ার ব্যবস্থা করা হোক একই জায়গায়।

দালাল নেই ‘দালাল’ আছে

এটা ঠিক যে অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বিএসএমএমইউতে দালালের উৎপাত কম। তবে অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগে কোথাও কোথাও দালালি মাথা চাড়া দিতে দেখা যায়। এই হাসপাতালে প্রায় প্রতিটি রোগ নির্ণয় কেন্দ্রে রোগী ও স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা যায় রক্ত পরীক্ষা ও এক্স-রে বিভাগে।

দুপুরে কেবিন ব্লকের সামনের ভবনে যেখানে এক্স-রে করা হয় সেখানে হাঁটার মতো জায়গা নেই এমন অবস্থা। এরই ভেতর কাউকে কাউকে দেখা যায় লাইন ভেঙে পরীক্ষা করিয়ে নিতে।

তবে এক্স-রে বিভাগে কিছু অনিয়ম আর ‘দালালের’ও দেখা মেলে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় এই প্রতিবেদককে একজন প্রস্তাব করে কিছু বাড়তি টাকা দিলে তিনি কম সময়ে এক্স-রের ব্যবস্থা করে দেবেন। লাইন ধরে রশিদ নেয়া, সেই কাগজ নিয়ে ব্যাংকে টাকা জমা দেয়া, এরপর এক্স-রের জন্য লাইন- এত ঝক্কি পোহাতে হবে না।

রোগ নির্ণয় ও বিভিন্ন পরীক্ষা করাতে গিয়ে রোগী ও স্বজনদের নানা জায়গায় ছোটাছুটির দুর্ভোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ডা. এম শরফুদ্দিন আহমেদ ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘রোগ নির্ণয় করার জন্য যে ফি নেওয়া হয় সেটা যেন এক জায়গায় নেয়া যায় সে ব্যবস্থা আমরা করব। এ নিয়ে আমরা পরিকল্পনা করছি।’

(ঢাকাটাইমস/২০ফেব্রুয়ারি/জেআর/মোআ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত