উপমহাদেশে ভাষার তিন সংগ্রাম

বাংলার পর তামিলের জন্য আত্মাহুতি

আপেল মাহমুদ
| আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:৩৯ | প্রকাশিত : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৮:৩৪

ভাষার জন্য বাঙালির সংগ্রাম পৃথিবীর ইতিহাসের সোনার হরফে লেখা হয়েছে অনেক আগেই। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০০০ সাল থেকে তাই জাতিসংঘের সদস্য হিসেবে থাকা প্রায় দুই শত দেশ এ দিনটি উদযাপন করছে। এতে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা বাঙালিসহ প্রায় ৩০ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষ গর্ব করতে পারে।

পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু হবে এমন ঘোষণার পরপরই বাঙালিরা এর প্রতিবাদে রাজপথে নেমে পড়ে। যে দেশের শতকরা ৯৮ ভাগ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে, সে দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা হবে উর্দু। ফলে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান ওঠে ‘উর্দু নয়, রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলা চাই।’ ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মায়ের ভাষা রক্ষা করতে ঢাকার রাজপথে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষ নামতে বাধ্য হয়। ঠিক তখনই ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর পাকিস্তানি পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। এতে রফিক, জব্বার, সালাম, শফিউর, বরকত, ওলিউল্লাসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। তাঁদের তপ্ত রক্তের ওপর গড়ে উঠেছে শহীদ মিনার। প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারি সে শহীদ মিনারের বেদি ফুলে ফুলে ভরে ওঠে।

এবার বলব ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় ইতিহাসের কাহিনি। ঢাকায় মায়ের ভাষা রক্ষায় পিচঢালা পথ রক্তে রঞ্জিত হওয়ার মাত্র ৮ বছর পর ভারতবর্ষের আসাম রাজ্যের কাছাড়ে বাংলা ভাষার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার জন্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাঙালিরা। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে বাঙালি আর বাংলা ভাষার ওপর অবিচার চলছিল। ঢাকায় যেমন বাংলার ওপর উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, তেমনি আসামে বাংলার ওপর অসমিয়া ভাষাকে চাপানোর চেষ্টা হয়। এমনকি এমন উদ্ভট কথাও বলা হয় বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে অসমিয়া ভাষা থেকে। তাই বাঙালিরা অসমিয়া ভাষার কথা বললে দোষের কিছু হবে না। যার  পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালের ২১ ও ২২ এপ্রিল আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি অসমিয়া ভাষাকে একমাত্র রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব করে। কাছাড় জেলার সদস্য নিবারণ চন্দ্র লস্কর, মইনুল হক, নন্দকুমার সিংহ, জ্যোৎস্নাচন্দ, বৈদ্যনাথ মুখার্জি, মনীন্দ্র দাস, হেমচন্দ্র চক্রবর্তী, রামপ্রসাদ চৌবে, অরুণ লাল রায় ও আলতাফ হোসেন মজুমদার এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন। এর মধ্যে নন্দকিশোর সিংহ সভায় একটি সংশোধনী প্রস্তাব আনলেও তা ৫০-১০ ভোটে পরাজিত হয়। অসমিয়া ভাষাই আসামের একমাত্র রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

তা রোধ করার জন্য বাঙালিরা ‘নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ১৯৬০ সালের ২১ জুন শিলচরের নরসিংটোলায় নিখিল আসাম বাঙ্গালা ভাষা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন লোকসভার সদস্য দ্বারকানাথ তেওয়ারি। বক্তারা অসমিয়াদের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। একই বছর ২ ও ৩ জুলাই শিলচর গান্ধীবাগ ময়দানে ২৫ হাজার বাঙালি সমবেত হয়ে বাংলা ভাষা রক্ষার অঙ্গীকার করে। গেয়ে ওঠে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’

এমনই আন্দোলন ও কর্মসূচি চলার সময় ১৯৬১ সালের ১৯ মে ২টা ৩৫ মিনিটে বাংলা ভাষা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয় আসামের ডিআইজির নেতৃত্বে। শহীদ হন সুনীল সরকার, কুমুদ দাস, হিতেশ বিশ্বাস, বীরেন্দ্র সূত্রধর, চণ্ডীচরণ সূত্রধর, কুমারী কমলা ভট্টাচার্য, শচীন্দ্র পাল, কানাই লাল নিয়োগী, তরণী দেবনাথ, সত্যেন্দ্র দেব ও সুকোমল পুরকায়স্থ। পুলিশি নির্যাতনে দেড় শতাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়। করিমগঞ্জ শহরে সান্ধ্য আইন জারি করা হয়। আসামের করিমগঞ্জ, শিলচর ও হাইলাকান্দি শোকের নগরে পরিণত হয়। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ ভাষা আন্দোলনে নিহত ৯জন শহীদের শেষকৃত্যে অংশ নেয়। পরে আরও দুজন শহীদ হন। ফলে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১১। এভাবে আসামের বাঙালিরা বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে তাদের ভাষার হেফাজত করেছিল। তা না হলে আসামে বাঙালি এবং বাংলা ভাষার কোনোটারই অস্তিত্ব থাকত না।

ভারতবর্ষে আরেকটি ভাষা আন্দোলনের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। আর তা হলো মায়ের ভাষা হিসেবে তামিল ভাষা রক্ষার জন্য ৯ জন আত্মাহুতি দিয়েছিল। এ আন্দোলনটি ছিল মায়ের ভাষা রক্ষার একটি ব্যতিক্রমধর্মী আন্দোলন। আত্মাহুতির মাধ্যমে তামিলরা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল তামিলরা হয়তো বাঁচবে না, কিন্তু তাদের ভাষা কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। তামিলরা তাদের রাজ্যে হিন্দির আগ্রাসন রোধ করার জন্য আত্মাহুতির ঘটনা ঘটিয়েছিল। ১৯৬৪ সালের জানুয়ারি মাসে স্ত্রী-সন্তান রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যান চিনাস্বামী। তিরুচির পল্লী রেলস্টেশনের কাছে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মাহুতি দেন তিনি। অগ্নিদগ্ধ অবস্থায় তিনি চিৎকার করে বলতে থাকেন ‘ইস্ত্রি ওড়িকা তমিড় বাড়কা’ অর্থাৎ ‘হিন্দি নিপাত যাক, তামিল ভাষা দীর্ঘজীবী হোক’।

১৯৬৫ সালে একই উদ্দেশ্যে আরও পাঁচজন তামিল আত্মাহুতি দেয়। সে সঙ্গে আরও তিন তামিল আত্মবিসর্জন দেয় কীটনাশক পান করে। মাতৃভাষার প্রতি কতটা গভীর মমত্ববোধ থাকলে এভাবে আত্মাহুতির পথ বেছে নেওয়া যায়। হয়তো তারা ১৯৫২ সালে ঢাকা এবং ১৯৬১ সালে কাছাড়ের অমর শহীদদের কাছ থেকে আত্মোৎসর্গের অনুপ্রেরণা পেয়েছিল।

আপেল মাহমুদ: সাংবাদিক ও গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত