‘প্রথমবার মেলায় বিক্রি হয়েছিল এক কপি বই’

বোরহান উদ্দিন ও জহির রায়হান
 | প্রকাশিত : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৬:৩৬

প্রতিদিন দুই ঘণ্টা না লিখলে কাজে মন বসে না। তাই আমাকে লিখতেই হয়। কেউ কেউ আমাকে বলে আমার নাকি ‍২২ ঘণ্টায় দিন। কারণ দুই ঘণ্টাতো লেখাতেই আটকে থাকে। এমনটাই বললেন, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি লেখায় বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭ পাওয়া মোশতাক আহমেদ। তিনি  ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার। বাংলাদেশ পুলিশে তিনিই প্রথম কর্মকর্তা যিনি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। বইমেলা প্রাঙ্গণে ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন এত ব্যস্ততার মধ্যেও কিভাবে নিয়মিত কিভাবে লেখা হয়। সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া সম্পর্কেও কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিনজহির রায়হান

ঢাকাটাইমস: বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭ পাওয়ার অনুভূতি কেমন?

মোশতাক আহমেদ: এ প্রাপ্তিটা অনেক বড় স্বীকৃতি। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সাহিত্য পুরস্কার। আমার কাছে আনন্দের বিষয় সাহিত্যিক হিসেবে এই প্রাপ্তিটা যতটা না বড়, তার চেয়ে বড় প্রাপ্তি সায়েন্স ফিকশনকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। যেটা আমাদের দরকার ছিল। অনেকে বলেন সায়েন্স ফিকশন আসলে সাহিত্য কি না? আমরা তো বলি সায়েন্স ফিকশন সাহিত্য। কারণ রোবট এখন আমার ডানে, বামে কম্পিউটার, ক্লোনের কথা শুনতে পাচ্ছি। আজ থেকে ৫০ বছর পর এগুলো জীবনের অংশ হয়ে যাবে। কাজেই আমরা সাহিত্য থেকে তাদের বের করতে পারবো না। সুতরাং যে স্বীকৃতি পেলাম এই স্বীকৃতি একজন লেখক হিসেবে অনেক বড় প্রাপ্তি।

ঢাকাটাইমস: নিজের বই  প্রকাশের শুরুর কথা সম্পর্কে জানতে চাই

মোশতাক আহমেদ: ২০০৪ সালে আমার প্রথম বই আসছিল ‘জকি’। প্রথম প্রকাশিত বইটি মেলায় মাত্র একটি বিক্রি হলো। মন খারাপ। তখন দেখলাম সায়েন্স ফিকশন অনেকে লিখছেন। আমি লেখার চেষ্টা করলাম। সায়েন্স ফিকশনের ওপর প্রথম বই লিখলাম ‘ক্লিটি ভাইরাস’ ও ২০০৫ সালে লিখলাম রোবটিজম। অনেকের কাছে ক্লিটি ভাইরাস ও রোবটিজম নাম একটু কঠিন কঠিন মনে হলো। আমাকে প্রকাশক বললেন,  একটু ভালোবাসা নিয়ে বই লিখ। এরপর লিখলাম ‘নিলির ভালোবাসা’ যেটা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এরপর আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

ঢাকাটাইমস: আপনার ক্লাসিক সায়েন্স ফিকশনরিবিট’, অনিন্দ্য প্রকাশনীর প্যাভিলয়নে এবার দেখলাম অনেকে রিবিটের সঙ্গে কথা বলছে?

মোশতাক আহমেদ: হ্যাঁ। ‘রিবিট’ হলো সায়েন্স ফিকশন সিরিজের বই। আমি চাকরি করি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে সামাজিক বিভিন্ন বিষয় কীভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা যায়। তখন মনে হলো আমি একটা রোবট তৈরি করি। যেই রোবটটা ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। এ রোবট বিভিন্ন মানবিক কাজ করবে। সেই চিন্তা থেকে ২০০৮ কি ২০০৯ সালে রিবিটের ধারণা আসে। বুয়েটের একজন প্রফেসর রিবিট তৈরি করে (একটি চরিত্র)।  সে কখনো পঙ্গু ছেলেদের নিয়ে কাজ করে, কখনো যাদের পাচার করা হয় তাদের নিয়ে কাজ করে। কখনো এলিয়েনদের নিয়ে কাজ করে। তারপর একেকটা পর্ব নিয়ে রিবিট লিখি। এরপর মনে হলো যে রিবিটকে আমরা স্বপ্নে দেখতাম সেই রিবিটকে বাস্তবে আনা যায় কি না। তারই ধারাবাহিকতা চলছে। প্রথম ধাপ এবার দেখালাম। হিউমেনেটিব রোবট তৈরি করেছি যেটা টুকটাক কথা বলছে। এর নাম ‘রিবিট’। আমরা আশা করি পাঁচ ছয় বছরের মধ্যে বই মেলায় রিবিট হাঁটবে। আমরা সায়েন্স ফিকশন লেখকরা যেটা চিন্তা করতে পারি সেটা যে বাস্তবে হতে পারে এটা কিন্তু আমাদের সাফল্য। কল্পনাকে সাফল্যে নিয়ে আসা, সে প্রচেষ্টারই ধারাবাহিকতাই এই রিবিট।

ঢাকাটাইমস: নতুন লেখকদের উদ্দেশে কিছু বলুন

মোশতাক আহমেদ: আমি মনে করি লেখালেখিটা আসলে মন থেকে আসে। লেখক সত্তা সৃষ্টি করা অনেক কঠিন কাজ। সবার মধ্যেই কম বেশি লেখালেখি যোগ্যতা থাকে। কেউ প্রকাশ করতে পারেন, কেউ পারেন না। যারা প্রকাশ করতে পারেন তারাই লেখক হন। এখন পারার ক্ষেত্রেও কিছু প্রশ্ন থাকে? অবশ্যই তাকে জ্ঞানী হতে হবে। জানতে হবে এবং গল্পটাকে জমিয়ে লেখার মতো একটা ক্ষমতা তার থাকতে হবে। চর্চা করতে হবে এবং গুছিয়ে লিখতে হবে। হতাশা আসবে, হতাশাকে কাটিয়ে সাফল্যকে ধরে রেখে আপ্রাণ চেষ্টা করতে হবে। লেখার চর্চাটা একজন লেখকের ধারাবাহিকভাবে করে যেতে হবে। কারণ প্রচুর পাঠক আছে আমাদের দেশে। বাংলাদেশ ছাড়াও কলকাতা কথা চিন্তা করলে দুই বাংলা মিলে প্রায় ৩৫ কোটি মানুষ বাংলা ভাষার। এটা আমাদের শক্তি।  যেখানে কিছু দেশ আছে তাদের ২০টা দেশ মিলেও ৩৫ কোটি লোক একই ভাষায় কথা বলছে না।

ঢাকাটাইমস: পাঠকেদের উদ্দেশে কী বলার আছে?

মোশতাক আহমেদ: আসলে একেকজন পাঠক একেক রকম বই কিনবে। কেউ উপন্যাস, কেউ কবিতার বই পছন্দ করে। শেখার জন্য, বিনোদনের জন্য বই কিনে। পাঠক তার পছন্দের বই কিনবে। আমার লেখক হিসেবে পাঠকদের কাছে অনুরোধ ‘পাইরেট’ বই (বেআইনি নকল বই) কিনবেন না। পাইরেসি ছেয়ে গেছে। পাইরেসি আমাদের বন্ধ করতে হবে। পাঠককে উৎসাহিত করতে হবে ‘মৌলিক’ বই কেনার জন্য, এর ফিডব্যাক লেখককে দেয়ার জন্য।

ঢাকাটাইমস: বইমেলার পরিবেশ কেমন?

মোশতাক আহমেদ: ১৯৯২ সাল থেকে আমি ঢাকায় থাকি। বইমেলার সময়ের সঙ্গে যে বিকাশ এটা অভূতপূর্ব। এটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেলা। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে হয়। একুশের চেতনা, দেশপ্রেম, লাখ লাখ মানুষের সমাগম। এটা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এবার মেলা যেভাবে সাজানো হয়েছে অপূর্ব। এই ভালোর ধারাবাহিকতা ধরে রাখবে বাংলা একাডেমি, এই আশা আমার। আমাদের প্রাণের মেলা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই মেলা হিসেবে স্বীকৃতি পারে, এই কামনা।

ঢাকাটাইমস: আপনার লেখা নিয়ে পরিকল্পনা কী?

মোশতাক আহমেদ: লেখাটা আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আমি প্রতিদিন দুই ঘণ্টা লিখি। না লিখলে আমি কোনো কাজ করতে পারি না। অনেকে আমাকে বলে আমার দিন ২২ ঘণ্টা। কারণ দুই ঘণ্টাতো লেখালেখির জন্য। এটা আমাকে লিখতেই হয়। আমাদের শিল্প, সৃষ্টি, সংস্কৃতি অবশ্যই আমরা ছড়িয়ে দেব সারাবিশ্বে। বিশ্বমানের সাহিত্য আমরা রচনা করবো। আমরা আমাদের সাহিত্যকে রপ্তানি করবো। আমরা ভালো অনুবাদ নিয়ে আসবো। অবশ্যই পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দেব আমাদের সাহিত্য। আমরা খেলাধুলাসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছি। সাহিত্যেও আমরা এগিয়ে যাবো ।

বিশ্ব সাহিত্যে আমাদের ভালো অবস্থান করে নিতে সময় লাগবে না। কারণ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস কিন্তু আমাদেরই ভাষার। এই ভাষার জোরেই আমরা তা পারবো।  আমরা অনুবাদ যদি সুন্দরভাবে করতে পারি। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমরা অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান করে নিতে পারবো। এটা আমরা করবোই করবো।

ঢাকাটাইমস: আপনার পর্যন্ত কতটি বই প্রকাশ হয়েছে?

মোশতাক আহমেদ: এ পর্যন্ত আমার ৮৫টির মতো বই বের হয়েছে। এবারের বই মেলায় নতুন বই এসেছে ভৌতিক উপন্যাস ‘রক্তসাধনা’, প্যারাসাইকোলজি ‘ছায়াস্বর্গ’, সায়েন্স ফিকশন ‘অমর মানব’। সবগুলো বইই প্রকাশ করেছে অনিন্দ্য প্রকাশনী।

লেখক পরিচিতি

১৯৭৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মোশতাক আহমেদ । তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে এম ফার্ম ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ এবং ইংল্যান্ডের লেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রিমিনোলোজিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ২০তম বিসিএস (পুলিশ) ব্যাচে চাকরিতে যোগদান করেন।

বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ছাড়াও তিনি ২০১৩ সালে কালিকলম সাহিত্য পুরস্কার, ২০১৪ সালে ছোটদের মেলা সাহিত্য পুরস্কার, কৃষ্ণকলি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ ও সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার ২০১৫ অর্জন করেছেন। বহুমুখী প্রতিভাসম্পন্ন এ লেখক তার লেখনির মাধ্যমে পাঠক মহলে বেশ সমাদৃত ও প্রশংসিত।

তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে- সায়েন্স ফিকশন, ভৌতিক, গোয়েন্দা এবং অ্যাডভেঞ্চার, প্যারাসাইকোলজি, ভ্রমণ উপন্যাস, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, মুক্তিযুদ্ধ।

রোরটিজম, ক্লিটি ভাইরাস, নিহির ভালোবাসা, লাল শৈবাল, ক্রিকি, পাইথিনের মত দুর্দান্ত সায়েন্স ফিকশনগুলো তাকে সায়েন্স ফিকশন জগতে শক্ত ভিত তৈরি করে দেয়। এরই মধ্যে ভৌতিক এবং গোয়েন্দা ক্ষেত্রেও তিনি পাঠকের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকেন। তার ক্লাসিক সায়েন্স ফিকশন ‘রিবিট’ কিশোর কিশোরীদের মাঝে দারুণ জনপ্রিয়। প্রকাশিত হচ্ছে একটির পর একটি রিবিট সিরিজ – রিবিট, রিবিট এবং ওরা, রিবিটের দুঃখ, রিবিট ও কালো মানুষ, শান্তিতে রিবিট। তার জনপ্রিয়তায় বাড়তি মাত্রা যোগ করে ‘ববির ভ্রমণ’ আর কিশোর গোয়েন্দা ‘শিশিলিন’ সিরিজ।

 (ঢাকাটাইমস/২২ফেব্রুয়ারি/জেআর/বিইউ/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত