খালেদার জামিন শুনানিতে যা যা হলো

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রকাশিত : ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ২২:০৫

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের পক্ষে শুনানিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছিলেন তার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। তবে রাষ্ট্রপক্ষ বিএনপি প্রধানের স্বল্প সময়ের কারাবাসের কথা জানিয়ে জামিনের বিরোধিতা করেছে।

খালেদা জিয়া দণ্ডিত হওয়ার ১৭ দিন পর রবিবার হাইকোর্টে বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি সহিদুল করিমের বেঞ্চে এই শুনানি হয়।

শুরুতে বিএনপি নেত্রীর আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আবেদনকারীর বয়স ৭৩ বছর। তিনি শারীরিকভাবে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছেন। তিনি অসুস্থ। তিনি একজন নারী। এছাড়া এ আদালতের অনেক নজির রয়েছে লঘু সাজা হলে আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করার আবেদনের সময় জামিন আবেদন করা হয়। আদালত জামিন দিয়ে থাকেন। এ কারণে আমরা জামিন প্রার্থনা করছি।’

জামিনের পক্ষে সব যুক্তি আবেদনে উল্লেখ করা আছে জানিয়ে সেগুলো বলে আদালতের সময় নষ্ট করতে চাননি এই আইনজীবী।

এরপর জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে শুনানি করেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, ‘লঘু সাজা হওয়ায় জামিন চাওয়া হয়েছে। কিন্তু আইনগতভাবে এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমদের একটি রায় রয়েছে যে লঘু সাজা হলেই সে যুক্তিতে জামিন দেওয়া যাবে না। দুই বছর সাজা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জামিন আবেদনের বিষয়ে এ আদেশ দিয়েছিলেন আদালত।’

‘দুদকের আইনজীবী আরও কয়েকটি উদাহরণ দেন। তিনি মেডিকেল গ্রাউন্ড হিসেবে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, ‘আইনজীবীরা হলফনামা দিয়ে অসুস্থতার কথা বলেছেন। কিন্তু সপক্ষে কোনো সনদ দেননি। এ পরিস্থিতিতে জামিন না দিয়ে রেকর্ড আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করা হোক। আর আদালত মেডিকেল সনদ চাইতে পারেন। সে রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত জামিন না দেওয়ার আরজি জানাচ্ছি।’

এ সময় আদালত কাছে জানতে চান যে খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে কয়টি ধারায়। জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও দণ্ডবিধির ৪০৯/১০৯ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু আইন অনুসারে একটির বেশি ধারায় শাস্তি দেয়া যায় না। এ কারণে ৪০৯/১০৯ ধারায় পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে।’

এ সময় বিচারক দুদকের আইনজীবীর এ যুক্তির পাল্টা হিসেবে বলেন, ‘আপনার বক্তব্য সঠিক নয়। আমরা নথি থেকে আদেশের অংশে দেখেছি যে নিম্ন আদালতের রায়ে একটি ধারায় দোষী প্রমাণিত হয়েছে ও একটি ধারাতেই সাজা হয়েছে।’

এ সময় দুদকের আইনজীবী বলেন, ‘আদালতের রায়ের অভিমত অংশে দুটি ধারায় অভিযোগ প্রমাণের কথা উল্লেখ আছে। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট অংশ পাঠ করেন।

খুরশীদ বলেন, ‘এ মামলায় ২০০৮ সালে খালেদা জিয়া হাজতে ছিলেন। সেই হাজতবাস এবং গত ৮ ফেব্রুয়ারি রায়ের পর কারাগারে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত দুই মাস পাঁচ দিন জেল খাটা হয়ে গেছে। এই অল্প সময়ে জামিন দেওয়া ঠিক হবে না। যদিও জামিন দেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে আদালতের।’

এরপর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জামিন আবেদনের বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম মামলা যেখানে এতিমের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেসময়কার রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের প্রধান হিসেবে খালেদা জিয়া এর দায় এড়াতে পারেন না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল প্রধানমন্ত্রীর এতিমখানা তহবিল, ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমা হওয়া, টাকা তোলা, এফডিআর করাসহ রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তির পুরো ঘটনা সংক্ষেপে তুলে ধরেন। বলেন, ‘মামলার বিচারকালে খালেদা জিয়া এসব ঘটনা অস্বীকার করেননি। তিনি (খালেদা জিয়া) শুধুই বলেছেন যে, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে তিনি ছিলেন না। তিনি কিছু জানতেন না।’

‘তার এ বক্তব্য সত্য নয়। তিনি সব জানতেন। রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বা সরকারের প্রধান হিসেবে তিনি এর দায় এড়াতে পারেন না। তাছাড়া তিনি যে বাসায় থাকতেন, সেই বাসাতেই তার বড় ছেলে তারেক রহমান থাকতেন। এই মামলায় টাকা আত্মসাতকারীদের একজন তারেক রহমান। সুতরাং খালেদা জিয়া জানতেন না বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সত্য নয়।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এই মামলার নথি আসার পর শুনানি করা প্রয়োজন। বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট নিজস্ব ব্যস্থাপনায় দ্রুত পেপারবুক তৈরি করেছে। আধুনিক মেশিন রয়েছে। তাই আপিল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া হোক। এক মসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি করা হোক।’

মাহবুবে আলম বলেন, ‘খালেদা জিয়া মামলায় বিচারে কালক্ষেপন করেছেন। নিম্ন আদালতে নয় বছরের বেশি সময় নিয়েছেন। অথচ আদালতের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন যে রকেট গতিতে বিচার চলছে। খালেদা জিয়ার এ বক্তব্য অসত্য। তার প্রমাণ নিম্ন আদালতের রায়েই বলা হয়েছে যে এ মামলায় ২৩৭ কার্যদিবস বিচার হয়েছে। এরমধ্যে ১০৯ বার সময় নিয়েছেন খালেদা জিয়া। আর বিভিন্ন অজুহাতে ৩২ বার উচ্চ আদালতে এসেছেন। তাই একমাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হোক। এরপর জামিন বিষয়টি আসবে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের পাঁচ বছল জেল হয়েছিল। তিনি সাড়ে তিন বছর জেল খাটার পর বের হয়েছেন। একজন রাষ্ট্রপ্রধান যদি এতদিন কারাগারে থাকতে পারেন তাহলে আরেকজন কেন জেল খাটবেন না।’

এ সময় বিচারক বলেন, ‘এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না। একজন জেল খেটেছে বলে আরেকজনকে জেল খাটতে হবে-এটা কোনো যুক্তি নয়।’

জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘নিম্ন আদালতে বিচার শেষ করতে ৯ বছরের বেশি লাগছে। এখানে জামিন দিলে আর আপিল শুনানি করবে না।’

বিচারক বলেন, ‘তারা না করলেও উভয়পক্ষই দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নিতে পারেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল ভারতের লালু প্রসাদ যাদবের কারাগারে যাওয়ার বিষয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখিয়ে বলেন, ‘দুর্নীতি মামলায় লালু প্রসাদ যাদবকে কারাগারে যেতে হয়েছে। এরশাদের জনতা টাওয়ার মামলার নজির আমাদের সামনে রয়েছে।’

বিচারক বলেন, ‘ওই মামলার নথি তো আমাদের সামনে নেই।’ জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘ওই মামলার নথি তলব করুন।’

বিচারক বলেন, ‘এ নথি আমরা আনবো কেন?...এক রাষ্ট্রপ্রধান জেল খেটেছে বলে একজনকে কারাগারে থাকতে হবে এটা শুনানির কোনো যুক্তি হতে পারে না। এটা টকশোর বক্তব্য হতে পারে। কে কোন কুল গাছ লাগাল, কে কুল খেল তা আদালতের দেখার বিষয় নয়। এখানে দেখার বিষয় হলো জনতা টাওয়ার মামলায় এরশাদ জামিন চেয়েছিল কি না।’

এর পর এজে মোহাম্মদ আলীকে উদ্দেশ্য করে বিচারক বলেন, ‘দুদক ও রাষ্ট্রপক্ষ বিভিন্ন উদাহরণ দিয়েছে। জামিন না দেওয়ার স্বপক্ষে আদালতের আদেশ দেখিয়েছে। আপনার কাছে এরকম কোনো নজির আছে কি না।

জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আদালতে অনেক নজির রয়েছে। আপিল অ্যাডমিশনের সময় কম সাজার ক্ষেত্রে জামিন দেওয়া হয়। আমরাও তাই চাচ্ছি। আদালতের এখতিয়ার রয়েছে।’

এ সময় খালেদা জিয়ার আইনজীবী একটি হত্যা মামলায় জামিন দেওয়ার নজির তুলে ধরেন।

বেলা ৩টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত শুনানি হয়। এরপর দুই বিচারপতি বেশ কয়েক মিনিট নিজেদের মধ্যে সলাপরামর্শ করেন। তারপর আদালত আদেশ দিয়ে এজলাস থেকে নেমে যান।

ঢাকাটাইমস/২৫ফেব্রুয়ারি/এমএবি/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

আদালত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত