নতুন সিদ্ধান্তে কোটাধারীর নিয়োগ কমবে

মহিউদ্দিন মাহী, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০৯:৫১ | প্রকাশিত : ০৯ মার্চ ২০১৮, ০৮:০৩
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন

সরকারি চাকরিতে কোটার সংখ্যা কমাতে আন্দোলনকারীদের দাবিতে সরকার সাড়া না দিলেও নতুন সিদ্ধান্তে কোটাধারীর তুলনায় সাধারণ পরীক্ষার্থীরাই বেশি নিয়োগ পাবেন।

কারণ, নানা ধরনের মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা থাকলেও সব পদে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায় না। কিন্তু এতদিন সেই পদগুলো শূন্য থাকত। তবে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী না থাকলে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই নিয়োগ দেয়া হবে। এতে কোটাধারীর চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বেশি নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে নামিয়ে আনাসহ নান দাবিতে আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা এই সিদ্ধান্তে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি, কোটা আরও কমাতে হবে।

কোটা সংস্কারে আন্দোলনের মধ্যে মঙ্গলবার এক প্রজ্ঞাপনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সাধারণ মেধা তালিকা থেকেই নিয়োগ দেয়া হবে। এতদিন এই পদগুলো শূন্য রাখা হতো। এমনকি শূন্য পদ পূরণে বিশেষ বিসিএস নিয়েও সব পর পূরণ করা যায়নি।

সরকারের নতুন সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীদের একজন হেমায়েত উদ্দিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের এই ছাত্র বলেন, ‘সরকারে সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই, আমাদের পাঁচ দাবি একটি একটি পূরণ হয়েছে। তবে আমাদের আরও চারটি দাবি রয়েছে। সেগুলোর জন্যও আন্দোলন চলবে।

তবে এই মুহূর্তে কোটা কমানো বা বাতিলের কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান। তিনি বলেন, ‘সরকারের চিন্তা কোটা বহাল থাকবে। তবে মেধাবীরা যাতে বঞ্চিত না হয় এজন্য আমরা এ সিদ্ধান্ত (কোটাধারী পাওয়া না গেলে সাধারণ পরীক্ষার্থীদের থেকে নিয়োগ) নিয়েছি।’

সাধারণ শিক্ষার্থীরা যেভাবে বেশি নিয়োগ পাবেন

গত বছরের ১৭ অক্টোবর প্রকাশ করা ৩৬ তম বিসিএসের ফলাফলে নিয়োগের সুপারিশ করা হয় দুই হাজার ৩২৩ জনকে। তবে যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি বলে কোটার ৩৬৬টি পদ শূন্য ছিল।

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী যে দুই হাজার ৬৮৯টি পদের জন্য পরীক্ষা নেয়া হয় তার মধ্যে কোটার ছিল এক হাজার ৫০৫টি। কিন্তু পাওয়া যায় ১১৩৯ জনকে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী কোটায় যোগ্য কাউকে পাওয়া না গেলে কোনো পদ ফাঁকা রাখা হবে না। ওই বছর বাকি ৩৬৬ জনকে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দেয়া হলে কোটা ছাড়া সাধারণ পরীক্ষার্থীরা নিয়োগ পেতেন এক হাজার ৫৫০ জন। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ নিয়োগ পেতেন মেধা তালিকা থেকে।

তবে সিদ্ধান্তটা নতুন হওয়ায় এই শূন্য পদগুলো পূরণ করা হবে চলমান ৩৭ তম বিসিএস থেকে।

৩৭ তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এখন মৌখিক পরীক্ষা চলছে।

এই নিয়োগ পরীক্ষায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ করা হয়েছিল এক হাজার ২২৬টি পদ পূরণে। এর সঙ্গে ৩৬তম বিসিএসের শূন্য ৩৬৬টি পদ যোগ করে মোট এক হাজার ৫৯২টি পদ ৩৭ তম বিসিএস থেকে পূরণের সুপারিশ করেছে পিএসসি।

অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রতি বছরই কোটার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন ফাঁকা থাকে। ফলে নিয়োগের এই নীতিমালা কার‌্যকর হলে মেধা তালিকা থেকেই বেশিরভাগ প্রার্থী নিয়োগ পাবেন।

সরকারি চাকরিতে চার কোটা

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে চার ধরনের কোটা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩০ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত আছে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য চাকরিগুলো সংরক্ষিত রাখা হতো। কিন্তু ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মুক্তিযোদ্ধারা সে সুযোগ পেয়েছেন কমই।

আবার ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটার আওতা বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদেরকেও সে সুযোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সেটি এখন বাড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিদেরকেও এই সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।

এর বা্ইরে ১০ শতাংশ নারী কোটা, ১০ শতাংশ জেলা কোটা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য পাঁচ শতাংশ কোটা এবং এক শতাংশ প্রতিবন্ধী কোটা রয়েছে।

সরকারের শেষ বছরে প্রায়শই এই কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন হয়ে আসছে। আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা প্রধানত মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে বলে এ নিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়াও আছে।

যারা আন্দোলনে নামছে, তাদের যুক্তি হলো, সিংহভাগ কোটায় নিয়োগ পেতে পারে না। ৫৬ শতাংশ কোটায় এবং ৪৪ শতাংশ সাধারণ পরীক্ষার্থী থেকে নিয়োগ-এই বিষয়টি মানতে চাইছে না তারা। এতে সরকারি প্রশাসনে অধিক যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীরা নিয়োগ পাচ্ছে না বলেই দাবি তাদের।  

অবশ্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, ন্যন্যতম যোগ্যতা ছাড়া কাউকে চাকরি দেয়া হয় না। কোটার পদ শূন্য থাকে, তার মানেই হলো অযোগ্য কাউকে নেয়া হয় না। 

প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘অযোগ্যরা নিয়োগ পায়, এটা পুরোপুরি ভুল ধারণা। কোটাধারী এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের নম্বরের পার্থক্য থাকে একেবারেই কম। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে ভুল প্রচার রয়েছে।’

ওই কর্মকর্তা বলেন, নতুন নীতিমালা কার‌্যকর করা হলে পরোক্ষভাবে কোটাধারীদের সংখ্যা কম থাকবে আর সাধারণ শিক্ষার্থীরাই বেশি নিয়োগ পাবে। এতে সরকার আসলে দুই পক্ষকেই খুশি রাখতে চেয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশ বর্তমান বাস্তবতায় আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় হাত দেয়া কঠিন। কিন্তু নতুন সিদ্ধান্তটি পরোক্ষভাবে কোটা কমিয়েই আনা হয়েছে।  

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোজাম্মেল হক খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘এর ফলে আর মেধাবীদের সমস্যা হবে না। কোটায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে তারা মেধা তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ পাবে। তবে কোটাধারীদেরও এক্ষেত্রে বিক্ষুব্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। তাদের কোটা সুরক্ষিত আছে।’

বাংলাদেশে ১৯৯৬ সাল থেকেই প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশ নারী কোটা রয়েছে। তবে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীরা মূলত বিসিএসের বিষয়টিই সামনে নিয়ে আসেন।

সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান সা’দত হুসাইন সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টক শোতে বলেছেন, তিনি মনে করেন বর্তমান বাস্তবতায় জেলা কোটা রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ এখন পিছিয়ে পড়া জেলা বলতে কিছু নেই। এটা বাতিল হয়ে গেলেই কোটাধারীর সংখ্যা কমে ৪৬ হয়ে যাবে। আর সাধারণ শিক্ষার্থী বেড়ে হবে ৫৪।

(ঢাকাটাইমস/০৯মার্চ/এমএম/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত