বিএনপি ভোটে এলে আবার আ.লীগ-জাপা জোট

মহিউদ্দিন মাহী ও তানিম আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৮, ১৮:০৪ | প্রকাশিত : ১২ মার্চ ২০১৮, ০৮:০০

আগামী নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট অংশ নিলে ২০০৮ সালের মতোই জাতীয় পার্টিকে নিয়েই আওয়ামী লীগ ভোটের লড়াইয়ে নামবে। দল দুটির নেতারা এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

গত ৩০ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দেয়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপির বর্জন অথবা অংশগ্রহণ- দুটি বিকল্পকে সামনে রেখেই আগাচ্ছে।

বিএনপি না এলে নির্বাচনী মাঠে কোনো চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে না বলেই ভাবছে আওয়ামী লীগ। আর বিএনপি এলেও যেন সমস্যায় পড়তে না হয়, সে জন্যই আবার মহাজোট করার চিন্তা।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকদণ্ডলীর একাধিক সদস্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। একজন বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে আসলে আমরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে জোটগতভাবেই অংশ নেব। আর বিএনপি না আসলে জাতীয় পার্টি আলাদা নির্বাচন করবে।’

মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির সদস্য শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল জক চুন্নুও বলেন, ‘জোট তো এক প্রকার হয়েই আছে (আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি), আর থাকবে কীভাবে?। বিএনপি ভোটে এলে এক সঙ্গেই লড়াই করব আমরা।’

যে কারণে জোটের চিন্তা

২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে জামায়াত দেশে ভোট পায় যথাক্রমে ৪.২৬ ও ৪.৬ শতাংশ। এই ভোটে দুই-চারটি আসনে হয়ত ভোটে জেতা সম্ভব। কিন্তু যদি কোনো বড় দলের বাক্সে এটি পড়ে, তাহলে তা জয় পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দিতে পারে।

২০০১ সালে ৬২ আসনে জেতা আওয়ামী লীগ ৮৫টি আসনে হারে পাঁচ থেকে ১০ হাজার ভোটের ব্যবধানে। অর্থাৎ তখন জোটের সুবিধা পেয়েছিল বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দল।

অপরদিকে জাতীয় পার্টির ভোট জামায়াতের চেয়ে বেশি। ১৯৯১ সালে তারা ১১.৯ শতাংশ, ১৯৯৬ সালের ১২ জুনে ১৬.৪ শতাংশ, ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ থাকা নিয়ে দলে ভাঙন ধরার পর ৭.২২ শতাংশ এবং ২০০৮ সালে ৭ শতাংশ ভোট পায়।

বিএনপি-জামায়াতের বর্জনের মুখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি ভোট পায় ১১.৩১ শতাংশ।

অর্থাৎ সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ৭ শতাংশ ভোট আওয়ামী লীগের বাক্সে পড়লে এই জোট আবারও জিততে পারবে বলে আশা করছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা।

বিএনপি না এলে ৩০০ আসনে জাপার প্রার্থী

এবারও বিএনপি বর্জন করলে ২০১৩ ও ২০১৪ সালের মতো পরিস্থিতি আর তারা তৈরি করতে পারবে বলে বিশ্বাস করে না ক্ষমতাসীন দল এবং জাতীয় পার্টি। আর সে ক্ষেত্রে কোনো আসনেই একে অপরকে ছাড় দেয়া হবে না বলে জানান নেতারা।

জাতীয় পার্টির নেতা মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘বিএনপি এবারও নির্বাচনে না আসলে জাতীয় পার্টি ২০১৪ সালের মতো সমঝোতা করে কিছু আসনে ভোট করবে না। তখন জাতীয় পার্টি আলাদাভাবে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে।’

তবে চুন্নুর ধারণা এবার আর বিএনপি ভোট বর্জন করবে না। তিনি বলেন, ‘বিএনপির নির্বাচনে না এসে উপায় নেই। তারা দেখেছে, ভোট ছাড়াই ১৫৩ জনএমপি পাঁচ বছর থেকেছে।’

‘জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ আলাদাভাবে যদি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয় তাহলে তো নির্বাচন বৈধ হবে। বিশ্বের কোনো দেশই দেখবে না বিএনপি নির্বাচন করেছে কি না।’

জাতীয় পার্টিকে কত আসনে ছাড়?

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল হওয়া নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ৫০টিরও বেশি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। প্রায় দুই বছরের জরুরি অবস্থা শেষে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ৩৫টির মতো আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। আর কয়েকটি আসন দুই দলের জন্যই উন্মুক্ত রাখা হয়।

দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি বিভিন্ন আসনে একে অন্যের বিরুদ্ধে লড়াই করলেও কিছু আসনে আবার হয় সমঝোতা। আর আওয়ামী লীগ যেসব আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছিল, মূলত সেগুলোতেই তারা জিতে আসতে পেরেছে।

জাতীয় পার্টির সূত্র জানায়, এবার তারা একত্রে নির্বাচন করলে নবম সংসদ নির্বাচনে যে কয়টি আসনে জোটের মনোনয়ন পেয়েছিল, এবার তার চেয়ে বেশি আসন চাইবে।

তবে আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, জাতীয় পার্টিকে রংপুর বিভাগে বেশি ছাড় দেয়া হবে। এর বাইরে বগুড়ায় এক বা একাধিক, রাজশাহী বিভাগে দুই বা তিনটি, কিশোরগঞ্জে একটি, ঢাকায় এক বা দুটি, নারায়ণগঞ্জে একটি, সিলেট বিভাগে একাধিক, চট্টগ্রামে একটি বা দুটি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটি, কুমিল্লায় এক বা একাধিক, খুলনা বিভাগে একাধিক, ময়মনসিংহে দুই বা তিনটি, টাঙ্গাইলে একটি আসনে ছাড় দেয়া হতে পারে।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর একজন সদস্য বলেন, ‘যেসব আসনে এখন জাতীয় পার্টির সংসদ আছেন, তাদেরকে ছাড় দেয়ার হবে, এটা অনেকটা নিশ্চিত। তবে দুই এক জনের ভাগ্য পুড়তে পারে।’

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক দর কষাকষি হবে বলেও জানান আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতারা।

এরশাদের মহাজোট ত্যাগ

২০০৮ সালে জোটবন্ধ হয়ে ভোট করে জাতীয় পার্টি ২৭ আসনে জিতে আওয়ামী লীগ সরকারেরও অংশীদার হয়। তবে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ১৮ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে মহাজোট ছাড়ার ঘোষণা দেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

ওই সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু পরে নিজেই আবার নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। তবে রওশনের নেতৃত্বে দলের একাংশ আবার ভোটে যায়।

এক পর্যায়ে এরশাদকে ভর্তি করা হয় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে। ‘অনিচ্ছায়’ রংপুর-৩ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ নেবেন না বলে প্রথমে জানান এরশাদ। তবে ভোটের ছয় দিন পর ১১ জানুয়ারি অনেকটা নাটকীয়তার সঙ্গেই শপথ নেন তিনি।

পরদিন বঙ্গভবনে মন্ত্রিসভার শপথের পর এক প্রজ্ঞাপনে এরশাদকে মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত করা হয়।

জোটের ভোট

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বিএনপি জোট করার বিষয়ে আলোচনা করেছিল বলে ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান তার একটি বইয়ে লিখেছেন। কিন্তু সে সময় জামায়াত ১০০ আসনে ছাড় দাবি করায় বিষয়টি আর আগায়নি।

পরে জামায়াতকে ৩০টির মতো আসনে ছাড় দেয়ার শর্তে তারা বাকি আসনগুলোতে বিএনপিকে ছাড় দেয়ার গোপন সমঝোতা করে। আর অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দলীয় জোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে সাত দলীয় জোট হয়। পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ওই জোটের প্রভাব অবশ্য সেভাবে ছিল না। 

১৯৯৬ সালেই সবকটি দল একক শক্তিতে লড়াই করে এবং ভোটে জিতে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। আর বিএনপিও বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসনে জিতে।   

১৯৯৯ সালে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি এবং কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রীক দল ইসলামী ঐক্যজোটকে নিয়ে জোট করে বিএনপি। নির্বাচনের আগে এরশাদ জোট ছেড়ে গেলেও নাজিউর রহমান মঞ্জুর এবং এম এ মতিনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি নামে জোটে থেকে যায়।

এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ে ১.৩৮ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে বিএনপি আসন বেশি পায় ১৫৯টি। আওয়ামী লীগ যেখানে পায় ৬২ আসন, সেখানে বিএনপি পায় ১৯৩টি।

২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বাতিল হওয়া নির্বাচনের আগে বামপন্থীদের জোট ১৪ দল, জাতীয় পার্টি, বিএনপি ভেঙে বের হয়ে আসা এলডিপি নিয়ে মহাজোট করে আওয়ামী লীগ।

পরে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে এলডিপিকে বাদ দিয়ে মহাজোট নির্বাচনে ভূমিধস জয় পায়। আওয়ামী লীগ ভোট পায় ৪৯ শতাংশ, আসন পায় ২৩০টি। বিএনপি ভোট পায় ৩৩ শতাংশ, আসন পায় ৩০টি।

ঢাকাটাইমস/১২মার্চ/এমএম/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত