আরেক মায়ের বিদায়

শেখ রাজজাক
 | প্রকাশিত : ১৩ মার্চ ২০১৮, ১৫:৫৩

ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীকে আমরা মায়ের মতো শ্রদ্ধা করি। তিনি মুক্তিযোদ্ধা। বীরাঙ্গনা-বীরমাতা। কিন্তু আমরা এভাবে ভাবি যে, আমাদের পতাকার যে রং সে রংটাই উনি সব সময় ধারণ করতেন। আমার স্ত্রী যখন তাঁর কপালে টিপ পরিয়ে দিতেন ঠিক সে সময় আমরা মনে করতাম, বাংলাদেশের লাল রং। উনি যখন কোথাও যেতেন তখন সবসময় বাংলাদেশের পতাকা লাল-সবুজের রঙে নিজেকে ধারণ করতেন। সেই লাল-সবুজের একটি পতাকা যেন আজ হারিয়ে গেল।

আমার সঙ্গে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর সম্পর্কের সূচনা যশোরের সোহরাব ভাইয়ের পরিবারকে ঘিরে। তিনি এখন শিল্পকলা একাডেমির পরিচালক। সোহরাব ভাইয়ের সূত্রে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর গত প্রায় ২৫ বছর ধরে উঠাবসা ছিল। তাদের বিষয়গুলো দেখে আসছি বলা চলে। ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণীর চিকিৎসার জন্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ভাই যেদিন সরকারের তরফ থেকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে আসলেন, এর দুদিন আগে মা (ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী) আমাকে ফোন করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো আমাকে কিছু টাকা দিচ্ছে। এগুলো কি করি। কোথায় রাখি। সম্পর্কটা ঠিক এরকম একটা পারিবারিক জায়গায় ছিল। তাকে সারা জীবন মা ভেবেছি। মা জেনেছি। সেভাবেই তার শিল্পকর্ম বিক্রয়ে সহায়তা করেছি বিভিন্ন সময়ে।

মা অসুস্থ ছিলেন। আমার সর্বশেষ অনুষ্ঠানে যখন উনি যান, তখন বললেন, ‘রাজজাক আমি তো দোতলায় প্রোগ্রাম করতে পারব না। তুমি নিচে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কর।’ তখন শুধুমাত্র তার জন্যই নিচতলায় প্রোগ্রাম করলাম। এ সময় উনি বললেন, ‘ফুলকে তুমি বেঁধে দিয়ো না। খুলে রেখ। আমি হাত থেকে ফুল ছিটিয়ে দেব। ফুল কাটব না। ফুল কাটার জন্য নয়।’ এ রকম চলার পথে অনেক স্মৃতি অনেক কথাবার্তা আছে। এসব বিষয় আমাকে এখন খুব বেশি আবেগতাড়িত করছে। আসলে তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা আবেগের জায়গার। আত্মার জায়গা থেকে একটা আত্মিক বন্ধন ছিল। মা-ছেলের সম্পর্ক। তার চলে যাওয়াটা বেদনাদায়ক। গত দুই মাস আমরা লড়াই করেছি তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভবপর হবে নাÑ এটা আমি জানি ১৫ দিন আগে থেকেই। মৃত্যুর আগের দিন রাতেও আমাকে বলেছিলেন, যেকোনো সময় খারাপ সংবাদ আসতে পারে।

অনেক স্মৃতিই এখন মনে পড়ছে। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন আর বলতেনÑ ‘তোর তো মাথায় চুল নাই। কোথায় আদর করব।’ তো মায়ের বাসাটা ছিল খুব নান্দনিক। তার ভাস্কর্য দিয়ে সাজানো-গোছানো। তার কাছ থেকে খুব আদর- স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি, ঠিক সেরকম করে যেমন একজন মা তার সন্তানকে আদর করে। তিনি এমন একজন নারী যাকে নিয়ে পুরো দেশ গর্ব করতে পারে।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি তিনি আমাদের প্রতিনিয়ত বলতেন। উনি যখন খুলনা থেকে নওয়াপাড়ার দিকে চলে আসেন, গাড়ি করে পালাচ্ছিলেন। তখন পুরো গাড়ির লোকজনকে পাকিস্তানি আর্মিরা তুলে নিয়ে যায়। সন্ধ্যায় সবচেয়ে সুন্দরী একটি মেয়েকে পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের কাছে দেওয়া হয়। তিনিই ছিলেন ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী। সেখানে তিনি তিনদিন বন্দি ছিলেন। এরপর তিনি এক সময় কারো কাছে সাহায্য চান। তিনিও ছিলেন একজন ক্যাপ্টেন। বিষয়টা এমন ছিল ওই ক্যাপ্টেন তাকে প্রতিদিন রেপ করতেন। তিনি ভাবলেন দশজন মানুষের কাছে রেপট হওয়ার চেয়ে একজন মানুষের কাছে রেপট হওয়া ভালো। তিনি কখনো কখনো সেই ক্যাপ্টেনের গাড়িতেও চড়েছেন। এসব কথাও তিনি আমাদের বলেছেন। কিন্তু তার ভিতরে খুব দহন কাজ করত। স্বামী-সন্তান কোথায় আছেন, কেমন আছে তারা। জুট মিলের যে চাকরি ছিল। সেখানে যেতে পারেন না। তিনি বিভিন্ন সময়ে বলতেন।

তার শিল্পকর্ম নিয়ে কথা বলতে গেলে বলা যায় তিনি জাতশিল্পী। সব নিজের চিন্তা- চেতনা থেকে করতেন। তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। তিনি ভাস্কর্যের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া করে শিক্ষিত ছিলেন না। তার বাড়িতে গেলে যে কেউ বুঝতে পারবে তার শিল্প পরিচয়। তার চিন্তা-চেতনা। তার ঢংটা ছিল আলাদা। তবে কাজ দেখার সৌভাগ্য আমার সেই অর্থে হয়নি। দেখা যাচ্ছে, আমি গিয়েছি তখন একটা কাজ শেষ হয়ে গেছে এমন। যেমন বারান্দা সাজাবে। সেজন্য কাজ করছে বা করে ফেলেছে। কোনো কাজের শুরু থেকে একদম শেষ আমার সেভাবে দেখা হয়নি। কষ্টের কথা হচ্ছে, তিনি মারা গেছেন। এখন তার শিল্পকর্মের মূল্যায়ন করা হবে। জীবদ্দশায় আরো বেশি মুল্লায়িত হওয়ার দরকার ছিল। তার শিল্পকর্ম নিয়ে আসলে কোনো রকমই স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। কোনো রকম সম্মানই জানানো হয়নি। আমরা শুধুমাত্র কিনেছি। বিক্রি করার চেষ্টা করেছি। তাকে বীরাঙ্গনা থেকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। উনি কিন্তু নিতে চাননি কখনো। আমি নিজে জোর করে দরখাস্ত করিয়েছি। তিনি দরখাস্তও করবেন না। প্রথমে কিন্তু তাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। এমন আরো একজন, রমা চৌধুরী। তিনি বেঁচে আছেন। যেকোনো সময় মারা যাবেন। উনিও আবেদন করার চেষ্টা করেননি। তাকে স্বীকৃতি দেওয়ারও কোনোরূপ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উনি বলেছেন, ‘এই ১০ হাজার টাকা ভাতা আমার লাগবে না। এগুলো দিয়ে আমি কি করবো।’ পরে যখন আমি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বললাম তার স্বীকৃতি হলো না। কি লিস্ট বের করলেন আপনারা। তালিকা দেখলে দেখতে পাবেন যে কত নম্বরে তার নাম আছে। অনেক পরে আসছে। এক থেকে তিন চারের ভেতর উনি নেই।

দুই.
মায়ের (ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী) কোনো চাওয়া পাওয়া ছিল না। খুব ভালোভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন আরো কিছু দিন। আরো কিছু শিল্পকর্ম করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাঁর অনেক কিছ লেখার বা বলার ছিল। উনি শেষ দিকে একাত্তরের সেই ভয়াবহতা ভিতরে লালন-ধারণ করতে গিয়ে এমন হয়ে গিয়েছিলেন যে, খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি শুরু থেকেই অসুস্থ ছিলেন। কোনোভাবেই এটা কন্ট্রোল করা যাচ্ছিল না। উনি বসতে, দাঁড়াতে, ঘুমাতে পারতেন না। তার নানা রকম যন্ত্রণা হতো। তার লেখা নিয়ে মাসুক শাহীন নামে আমার এক বন্ধু, আমি এবং আরো কয়েকজন মিলে তাকে নিয়ে ডকুমেন্টারি করার চেষ্টা করছিলাম। কিছু দৃশ্য চিত্রায়িত করা আছে। উনি অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর গত দুই বছর আর সেই কাজটা এগিয়ে নেয়া যায়নি।

আমার মা (ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিণী) এবার অসুস্থ হলে সংগীতশিল্পী মিতা হকের মাধ্য আমি তা জানতে পারি। ফোনে তিনি বললেন, আপা তো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তারপর আমরা গেলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে পিজি হাসপাতালে (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) নেওয়া হলো। সেভাবেই চিকিৎসা চলছিল। আমাদের যারা (বন্ধুরা) আছে তারা তাদের জায়গা থেকে সহযোগিতা করছিলেন। আমিও করেছি। তিনি অসুস্থ হলে শেষের দিকে আমাকে একটি কথা বলেছিলেন। আমার সঙ্গে সর্বশেষ যে কথা হয়েছিল সেটা হচ্ছে ‘দেশটাকে একাত্তরের শক্তিবিহীন হতে দিয়ো না। একাত্তরকে যারা ধারণ করে চলে তাদের হাতেই যেন দেশটা থাকে।’ আমি বলেছিলাম, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব নিজেদের জায়গা থেকে।’ আমি তাকে কখনো কখনো দুষ্টুমি করে ‘মম’ বলতাম, তিনি বাধা দিতেন। বলতেন ‘মা’-ই বলিস। এই হচ্ছেনÑ আমার মা।

শেখ রাজজাক: কবি ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত