জমির মাপজোক শেখাতে এসিল্যান্ডের ব্যতিক্রমী উদ্যোগ

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৮, ১১:১৩ | প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৮, ১০:২২

জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে হামলা, মামলা, খুনোখুনির ঘটনার কথা প্রায়ই শোনা যায়। আবার নিয়মকানুন না জানায় অনেক সময় নিজের জমিও হাতছাড়া হয়ে যায়। অথচ ভূমি সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো জানা থাকলে অনেক সময় বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এমন চিন্তা থেকে স্কুল শিক্ষার্থীদের ভূমির মাপজোক শেখানোর উদ্যোগ নিয়েছেন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আক্তার হোসেন শাহিন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভূমি বিষয়ে পাঠদানের বেশ কিছু ছবি পোস্ট করে এই উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। পাঁচ মাসের অভিজ্ঞতায় যেসব সমস্যা নজরে এসেছে তা তুলে ধরেছেন গত বছরের ২২ অক্টোবর থেকে মুকসুদপুরে কর্মরত আক্তার হোসেন।

ঢাকাটাইমসকে তিনি জানান, জমিজমা সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণাগুলো যেন শিক্ষার্থীরা জানতে পারেন সেজন্য অনেক দিন ধরে তিনি পরিকল্পনা করছিলেন। কিভাবে এই পরিকল্পনা করলেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরে কর্মরত অবস্থায় আমাদের অগ্রজ তখনকার চিরিরবন্দরের এসিল্যান্ড মো. মাশফাকুর রহমান স্যারের এমন উদ্যোগ দেখে অনেকটা অনুপ্রাণিত হয়েছি। তিনি সেখানে স্কুলে এমন কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। তার কাছ থেকেই এমন অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’

আক্তার হোসেন জানান, জমিজমার প্রাথমিক ধারণা দিতে তিনি ইতোমধ্যে এস জে উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাশ নিয়েছেন। এছাড়া পৌরসভাসহ উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের বেশিরভাগ স্কুলে এমন কার্যক্রম পরিচালনা করার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

আক্তার হোসেন বলেন, অনেকে চিন্তা করে টাকা পয়সা দিলে কাজটা হয়ে যাবে। আবার কখনো কখনো দালালের খপ্পরেও পরেন অনেকে। ফলে ভূমি অফিসের সঙ্গে দূরত্ব আরেক ধাপ বেড়ে যায়। আর যারা অফিসে আসেন তাদের বয়স কমপক্ষে চল্লিশের উপরে। তারা এত কিছু বুঝতে চায় না, এ বয়সে আইন বোঝাও বিরক্তিকর। তাদের আইন শেখানোও কিছুটা জটিল। তাই আমি টার্গেট করেছি স্কুল ও কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের।

তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো জানার পর যখন পরিবারের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে জমিজমার সমস্যা এবং এর থেকে উত্তরণের বিষয়ে জানতে চাইবে তাতে তথ্যের বিস্তার ঘটবে। এরফলে যার চূড়ান্ত ফল হবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভূমি অফিসের সম্পর্ক উন্নয়ন। এরই অংশ হিসেবে উপজেলার এস জে উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম ক্লাস নিয়েছি।

ক্লাশে জমির খতিয়ান, দলিল, জমি ক্রয় বিক্রয়ের কোন বিষয়গুলোতে বেশি মনযোগ দেয়া উচিত, নামজারি কিভাবে করতে হয় এসব বিষয়সহ প্রাথমিক বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের বুঝানো হয়েছে বলে জানান আক্তার হোসেন শাহিন।

অন্য পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এই সহকারী কমিশনার বলেন, ‘নানা কারণে গ্রাম পর্যায় থেকে অনেকে উপজেলা ভূমি অফিসে আসতে চান না। বাৎসরিক খাজনা দেয়াসহ এ সংক্রান্ত কাজে নাগরিকদের মধ্যে অলসতা কাজ করে। যে কারণে চিন্তা করেছি প্রতিমাসে চারবার ইউনিয়ন ভূমি অফিস করব। যেখানে ভূমি সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করব। এছাড়াও  একটি ওয়েবসাইট তৈরি করব। যেখানে উপজেলার সব জমির লোকেশনসহ ছবি থাকবে। থাকবে যাবতীয় সব তথ্য। ইতিমধ্যে ওয়েবসাইট তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে।’

আক্তার হোসেন বলেন,সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসাবে প্রায় পাঁচ মাস সাধারণ মানুষের কথা শুনতে চেষ্টা করেছি। সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করেছি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে ধরণের জটিলতা নিয়ে হাজির হয় তা হলো- দলিলের দাতা যে পরিমাণ জমি দিয়েছে, হিস্যা অনুসারে তিনি তা পান না, খতিয়ানের দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণের সঙ্গে দলিলের মিল নেই, দলিলের দাগ নম্বর ও জমির পরিমাণ যেখানে যেখানে লেখা সেখানে ঘষে তুলে পুনর্লিখন করা, প্রাপ্যতার চেয়ে দলিলে জমির পরিমাণ বেশি, দলিলে জমির মালিকানা ইতিহাস বর্ণনায় গোজামিল দেওয়া, অনেকগুলো দাগের জমি বিক্রি হয়, দলিলে দাগের বিপরীতে হিস্যা অনুসারে জমির পরিমাণ না লিখে মোট হস্তারিত জমির পরিমাণ লেখা হয়।

এছাড়া খতিয়ানে উল্লেখিত জমির মালিকের নামের সাথে দলিল বা জাতীয় পরিচয় পত্রের নামের বিস্তর পার্থক্য, যেমন: খতিয়ানে মালিকের নাম অভিলাষ কারিকর, পিং বলয় মোল্লা, দলিলে আছে অভিমন্যু কারিকর, পিং বলয় মোল্লা অথবা একাধিক খতিয়ানে নামের ভিন্নতা পাওয়া যায়, পারস্পরিক বিনিময় বা এওয়াজ বদল করা সম্পত্তির লিখিত দলিল না থাকা, দীর্ঘ ৫০ বছর যাবৎ অর্পিত সম্পত্তির সেলামি পরিশোধ না করে হঠাৎ হাল সনের (তিনি চান যেন দুই এক বছরের সেলামি নিয়ে ডিসিআর দেওয়ার ব্যবস্থা করি) নবায়ন চাওয়া, রাস্তার পাশে তার নিজস্ব জমি থেকে বালু তোলার ব্যবস্থা করে দেওয়া, সরকারি হালটের উপর লাগানো গাছ কেটে নেওয়ার অনুমতি দেওয়া ইত্যাদি। বিষয়গুলোর সমাধান আইন অনুসারে করতে গেলে অনেক কাজ আটকে যায়। যার ফলে জনগণের সঙ্গে ভূমি অফিসের দূরত্ব তৈরি হয় বলে মনে করেন এই কর্মকর্তা।

(ঢাকাটাইমস/২০মার্চ/বিইউ/এমআর)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত