সুপারহিট নায়িকাদের যতো ‘প্রথম’

বিনোদন ডেস্ক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৮, ১৭:৪২ | প্রকাশিত : ২০ মার্চ ২০১৮, ১৫:৪৫

তাদের কেউ নিছক শখের বশে, কেউবা অভিনয় জীবনের পাশাপাশি সিনেজগতে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে নাম লিখিয়েছেন ছবি প্রযোজনায়। বাংলাদেশ স্বাধীনের আগে এ তালিকায় প্রথম যুক্ত হন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের ‘মিষ্টিমেয়ে’ খ্যাত কবরী। পরে কবরীর পথ ধরে ধারাবাহিকভাবে এসেছেন বেশ ক’জন সুপারহিট নায়িকা। যাদের মধ্যে হালের সেনসেশন মাহি, পরীমনিও রয়েছেন। তুলে ধরা হলো সেসব গুণী অভিনেত্রীদের বৃত্তান্ত।

সুজাতা: ১৯৬৪ সালে সহ-নায়িকা হিসেবে বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছিলেন সুজাতা।  ১৯৬৫ সালে ‘রূপবান’  ছবিতে তিনি মূল নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন।  সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ছবিটি। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে রূপবান সুজাতার নাম। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়িকা ছিলেন তিনি। ক্যারিয়ারে মোট ৭০টি ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন সুজাতা। ১৯৬৫ সালে তিনি অভিনেতা ও পরিচালক আজিমকে বিয়ে করেন।

১৯৭৬ সালে প্রথম ছবি প্রযোজনায় নামেন সুজাতা। ওই বছর নিজ নামে প্রতিষ্ঠিত সুজাতা প্রোডাকশনের ব্যানারে নির্মিত হয় তার ‘প্রতিনিধি’ ছবিটি। তার পরিচালিত একমাত্র চলচ্চিত্র ‘অর্পণ’। এই ছবির প্রযোজকও ছিলেন তিনি।  সুজাতা প্রোডাকশনস ছাড়াও সুজাতা-আজিম মিলে ‘এস এ ফিল্মস’ও ‘সুফল কথাচিত্র’নামের আরও দুটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। তিনটি প্রযোজনা সংস্থার ব্যানারে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু হিট ছবি।

কবরী সারোয়ার:  ১৯৬৪ সালে কিংবদন্তী পরিচালক সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ছবিতে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে আবির্ভাব হয়েছিল নায়িকা কবরীর।  প্রথম ছবিতেই তাকে নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা। ক্যারিয়ারে তিনি জহির রায়হান ও ঋত্বিক ঘটকের মতো চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সঙ্গেও কাজ করেছেন। তার সঙ্গে নায়ক রাজ রাজ্জাকের জুটি ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। প্রথম ছবি মুক্তির পাঁচ বছরের মাথায় অর্থাৎ ১৯৬৯ সালে প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন কবরী। নিজ নাম কবরী প্রোডাকশনের ব্যানারে ওই বছর ‘শীত-বসন্ত’ ছবিটি প্রযোজনা করেন তিনি। তার প্রযোজিত শেষ ছবি ছিল ‘গুন্ডা’। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন কবরী।

সুচন্দা: সুচন্দা ১৯৬৫ সালে প্রখ্যাত অভিনেতা কাজী খালেকের একটা প্রামাণ্যচিত্র দিয়ে অভিনয় শুরু করেন সুচন্দা। এরপর সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘কাগজের নৌকা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ১৯৬৬ সালে তার চলচ্চিত্রে অভিষেক ঘটে। তার অভিনীত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি ‘জীবন থেকে নেয়া’। এছাড়াও ষাটের দশকের শেষ দিকে গোলাম মুস্তফার বিপরীতে ‘চাওয়া পাওয়া’, নায়ক আজিমের বিপরীতে ‘নয়নতারা’, রাজ্জাকের বিপরীতে ‘সুয়োরানী দুয়োরানী’ এবং সত্তরের দশকে ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘কাচের স্বর্গ’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’ ছবিগুলোতে তিনি অভিনয় করেন। তবে কোনো জাতীয় পুরস্কার পাননি এই নায়িকা।

অভিনয়ের পাশপাশি সুচন্দা চলচ্চিত্র প্রযোজনাও করেছেন। তার স্বামী ছিলেন বিখ্যাত পরিচালক ও সাহিত্যিক জহির রায়হান। তার জীবদ্দশায় ‘টাকা আনা পাই’ ও ‘প্রতিশোধ’ চলচ্চিত্র দুটি তিনি প্রযোজনা করেন। এছাড়াও ‘তিনকন্যা’, ‘বেহুলা লখীন্দর’, ‘বাসনা’ ও ‘প্রেমপ্রীতি’ চলচ্চিত্রগুলোর প্রযোজকও তিনি। তার পরিচালিত প্রথম সিনেমা ‘সবুজ কোট কালো চশমা’। ২০০৫ সালে স্বামী জহির রায়হানের ব্যিখাত ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের আলোকে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। যেটাতে অভিনয় করেন তার চাচাতো ভাই নায়ক রিয়াজ। এই ছবিটির জন্য সেরা প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান সুচন্দা।

ববিতা:  তিনিও একজন ষাটের দশকের অভিনেত্রী। ১৯৬৮ সালে ১৪ বছর বয়সে জহির রায়হানের ‘সংসার’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে প্রথম অভিনয় করেন ববিতা। তার চলচ্চিত্রে আসার পেছনে অনুপ্রেরণা ছিলেন বড় বোন সুচন্দা। পরের বছরই ‘শেষ পর্যন্ত’নামের ছবিতে নায়িকা হিসেবে প্রথম অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। এরপর খুব দ্রুতই তিনি দেশের শীর্ষ নায়িকাদের একজন হয়ে ওঠেন। তার সঙ্গে প্রয়াত নায়ক জাফর ইকবালের জুটি ছিল তখনকার সুপারহিট। অভিনয় দক্ষতা দিয়ে ১৯৭৬ সালে ‘নয়নমনি’ ছবিটির জন্য প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঝুলিতে পোরেন তিনি। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে ক্যারিয়ারে মোট তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। এছাড়া সেরা পার্শ্ব-অভিনেত্রী হিসেবে পেয়েছেন আরও দুটি।

১৯৯৬ সালে প্রযোজনায় নামেন নায়িকা ববিতা। ১৯৮৬ সালে ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেনের প্রকাশিত ‘পোকামাকড়ের ঘরবসতি’উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ছবিটি ববিতা মুভিজের ব্যানারে তিনি প্রযোজনা করেন। পরিচালক ছিলেন আখতারুজ্জামান। ছবিটি প্রযোজনার পাশাপাশি তিনি এটিতে অভিনয়ও করেন। ওই বছর শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ কয়েকটি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে ছবিটি। যার ফলে, প্রথমবারের মতো প্রযোজক হিসেবেও একটি জাতীয় পুরস্কার হাতে তোলেন নায়িকা ববিতা।

শাবানা: নামকরা অভিনেত্রী শাবানা ১৯৬১ সালে মাত্র আট বছর বয়সে ‘নতুন সুর’ ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ের বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছিলেন। ছবিটির পরিচালক ছিলেন তার চাচা এহতেশাম। ১৯৬৭ সালে ‘চকোরী’ ছবিতে প্রথম নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেন। ক্যারিয়ারে মোট ২৯৯টি ছবিতে সুনামের সঙ্গে অভিনয় করেছেন তিনি। যার মধ্যে ১৩০টিতেই তার নায়ক ছিলেন আলমগীর। বিখ্যাত এই অভিনেত্রী ১৯৮০ সালে ‘সখী তুমি কার’ ছবির জন্য ক্যারিযারের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারটি হাতে তোলেন। ওই বছর থেকে টানা চার বারসহ রেকর্ড মোট নয় বার এই পুরস্কার জিতেছেন তিনি।

২২ বছর ধরে টানা অভিনয়ের পর চলচ্চিত্র প্রযোজনায় নাম লেখান শাবানা। ১৯৭৯ সালে স্বামী ওয়াহিদ সাদিককে সঙ্গী করে তিনি গড়ে তোলেন এসএস প্রোডাকশন হাউস। এটির ব্যানারেই নিজের প্রযোজিত প্রথম ছবি ‘মাটির ঘর’তাকে প্রযোজক হিসেবেও খ্যাতি এনে দেয়। ১৯৯০ সালে ‘গরীবের বউ’ ছবিটি প্রযোজনা করে প্রযোজক হিসেবেও একটি জাতীয় পুরস্কার ঘরে তোলেন শাবানা। মোট ২৫টিরও বেশি ছবি প্রযোজনা করেছেন তিনি। ২০১৭ সালে লাভ করেন আজীবন সম্মাননা। গত ১৮ বছর অভিনয় থেকে দূরে রয়েছেন চলচ্চিত্রের গুণী এই অভিনয়শিল্পী।

মৌসুমীমৌসুমীকে বলা হয় বাংলা চলচ্চিত্রের ‘প্রিয়দর্শিণী’। ১৯৯৩ সালে সুপারহিট নায়ক সালমান শাহর বিপরীতে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ছবিটির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আসেন তিনি। নায়ক সালমান শাহরও অভিষেক ছবি ছিল এটি। প্রথম ছবিতেই আলোড়ন তোলেন মৌসুমী।  ক্যারিয়ারে দুই শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি। শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনটি। প্রথম পুরস্কারটি হাতে তোলেন ২০০১ সালে, মেঘলা আকাশ ছবিতে অভিনয়ের জন্য। বাকি দুটি পুরস্কার পেয়েছেন ২০১৩ ও ২০১৪ সালে।

অভিনয়ে আসার কয়েক বছরের মাথায় প্রযোজক বনে যান মৌসুমী। ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় তার প্রযোজিত প্রথম ছবি ‘গরিবের রানি’। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘কপোতাক্ষ চলচ্চিত্র’ এর ব্যানারে এই ছবিটি নির্মাণ করেছিলেন তিনি। যেটিতে স্বামী ওমর সানীর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে অভিনয়ও করেছিলেন মৌসুমী। এর পরও একাধিক ছবি তিনি প্রযোজনা করেছেন। তবে প্রযোজক হিসেবে কোনো পুরস্কার এখনও পর্যন্ত ঘরে তুলতে পারেননি বাংলা চলচ্চিত্রের এই প্রিয়দর্শিণী।

মাহিয়া মাহী: নতুন প্রজন্মের এই নায়িকা চলচ্চিত্রে আসেন ২০১২ সালে। ওই বছর জাজ মাল্টিমিডিয়া প্রযোজিত ‘ভালোবাসার রঙ’ ছবিতে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। এরপর খুব কম সময়েই তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এরই মধ্যে মাহি অভিনয় করেছেন বেশকিছু হিট ছবিতে। অভিনয়ের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে প্রথমবারের মতো মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার জিতলেও এখনও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘরে তুলতে পারেননি তিনি।

অভিনয়ের মাত্র আড়াই বছরের মাথায় মাহি ছবি প্রযোজনার ঘোষণা দেন। সেই মতো ‘স্করপিয়ন’নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান খুলেও ফেলেন নায়িকা। তখন জানিয়েছিলেন, তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের প্রথম ছবির পরিচালক হবেন জাকির হোসেন রাজু। কিন্তু মাস পেরিয়ে বছর চলে গেলেও সেই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আজও কোনো ছবি নির্মিত হয়নি। দেশের নামকরা প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর জন্যই মাহির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো ছবি নির্মাণ হচ্ছে না বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান যখন খুলেছেন কদিন দেরিতে হলেও সেখান থেকে ছবি নির্মাণ হবে বলেও মনে করছেন অনেকে।

পরীমনি:  ২০১৫ সালে ‘ভালোবাসা সীমাহীন’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হালের সেনসেশন নায়িকা পরীমনির। মাত্র তিন বছরেই তিনি অভিনয় করে ফেলেছেন ২৩টি ছবিতে। এই মুহূর্তে হাতে রয়েছে আরও বেশি কয়েকটি ছবির কাজ। এরই মধ্যে আবার নেমে পড়লেন ছবি প্রযোজনায়। গত ১৬ মার্চ বেশ ঢাকঢোল পিটিয়ে এফডিসির ৭ নম্বর ফ্লোরে নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের ঘোষণা দেন তিনি। নাম দিয়েছেন ‘সোনার তরী’। এপ্রিলের মাঝামাঝি এই ‘সোনার তরী’ থেকেই নির্মাণ শুরু হবে প্রযোজক পরীর প্রথম ছবি ‘ক্ষত’। শামীম আহমেদের পরিচালনায় এই ছবিতে নায়িকাও থাকবেন তিনি।

শাবানা, ববিতা ও এ প্রজেন্মর পরীমনিরা ছাড়াও অভিনয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে আরও বেশ কয়েকজন নায়িকা প্রযোজক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। সেই তালিকায় আছে সুমিতা দেবী, মালতি দে, সুলতানা জামান, নীলুফার খায়ের, জোহরা কাজী, রোজিনা, অঞ্জু ঘোষ, এবং এ প্রজন্মের ববি ছাড়াও আরো কয়েকটি নাম। কালের খেয়ায় হয়তো দিনে দিনে আরো সমৃদ্ধ হবে এই তালিকা। অভিনয়ের পাশাপাশি পরিচালক-প্রযোজক হিসেবেও দ্যূতি ছড়াবেন সেসব গুণী অভিনেত্রীরা।

ঢাকাটাইমস/ ২০মার্চ/এএইচ/ডিএম

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত