‘মুক্তিযোদ্ধা’ মজনু মিয়া গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা

জাভেদ হোসেন, গাইবান্ধা
 | প্রকাশিত : ২১ মার্চ ২০১৮, ২১:১৪

জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করে মুক্তিযোদ্ধা মজনু মিয়া এখন গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা।

১৯৭১ সাল, মজনু মিয়া ছিলেন তখন টগবগে একজন যুবক। সে সময় দেশটা ছিল উত্তাল, বাংলাকে নিজের রূপে রূপ দেয়ার নেশায় কাঁপছিল পুরো দেশ। পাকিস্তানিদের শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন এদেশের আপামর জনগণ।

ঠিক তখনই মজনু মিয়ার মতো অনেকে জীবনের মায়া ত্যাগ করে দেশ রক্ষার্থে ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বাধিকার আন্দোলনে। মজনু মিয়া তার অদম্য সাহস আর দেশপ্রেমে নিজেকে সপে দেন মুক্তিযুদ্ধে।

গাইবান্ধা জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের জয়েনপুর গ্রামের মৃত খবির উদ্দিনের ছেলে মজনু মিয়া। তার বয়স প্রায় ৬৩ বছর। বসতভিটা সর্বস্ব হারিয়ে বর্তমানে জয়েনপুরস্থ গুচ্ছগ্রামে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

যুদ্ধকালীন ১১নং সেক্টরে মজনু মিয়ার সহযোদ্ধা ছিলেন- আবেদ আলী, সুলতান গিয়াস ও আলতাফ হোসেন। এই যুদ্ধবীরের অনেক সফল সাহসী অভিযানে তখন মুক্ত হয়েছিল এদেশের অনেক অঞ্চল। দেশ হয়েছিল স্বাধীন। আমরা পেয়েছি স্বাধীনতার সুখ। তৎকালীন সময়ের অধিনায়ক মহম্মদ আতাউল গনি ওসমানী স্বাক্ষরিত দেশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র প্রাপ্ত হয় মজনু মিয়া। যার সনদ নম্বর ১৬৫৮৮৫। অতি দুঃখের বিষয় যে, মজনু মিয়া সংগ্রামের সনদ পেলেও অদ্যাবধি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি।

যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করলেও জীবনযুদ্ধে তিনি আজ পরাজিত সৈনিক। দেশ স্বাধীনের ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সরকারি সুযোগ-সুবিধা কিংবা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি এই যুদ্ধবীর।

মজনু মিয়া জানান, ভারতের কাকড়ীপাড়ায় আজিম মাহবুরের নিকট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার পর নিজ জেলা গাইবান্ধার কামারজানি, কঞ্চিবাড়ী ও দক্ষিণ দুর্গাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অধিনায়ক আ. হামিদ পালোয়ান ও ক্যাপ্টেন হামিদ উল্টার নেতৃত্বে সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি। এ যুদ্ধে সফলভাবে অংশগ্রহণ করায় মজনু মিয়াকে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন- বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলা ইউনিটিরে সাবেক কমান্ডার নাজমুল আরেফিন তারেক, সাদুল্যাপুর উপজেলা ইউনিট কমান্ডার মেছের উদ্দিন সরকার ও ইউপি চেয়ারম্যান শাহীন সরকার। এরপর মজনু মিয়া ওই যুদ্ধের সকল প্রমাণপত্রাদি দিয়ে গেজেটধারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেতে অনলাইন আবেদনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে আবেদন করেন। এরই প্রেক্ষিতে সাদুল্যাপুর উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটি কর্তৃক বাছাইয়ে মজনু মিয়াকে বাতিল করা হয়।

এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রহিমা খাতুন ঢাকাটাইমসকে বলেন, মজনু মিয়ার সংগ্রামী সনদপত্র থাকলেও ক্রমিক নম্বর ছিল না। এ কারণে তাকে বাতিল করা হয়েছে।

মজনু মিয়া বলেন, ওই সনদপত্রের অপর পৃষ্ঠায় ক্রমিক নম্বর ছিল। যার নম্বর ১৬৫৮৮৫। বাধ্য হয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আপিল আবেদন করেন মজনু মিয়া। যার আবেদন নম্বর ২২০০৮। তিনি আপিল আবেদন করলেও অদ্যাবধি কোনো ফল পাননি। শেষ বয়সে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পেয়ে মৃত্যুবরণ করতে চান- এটাই যুদ্ধবীর মজনু মিয়ার আঁকুতি।

বর্তমানে এই বীরযোদ্ধা মজনু মিয়া স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে গুচ্ছগ্রামে অসহায় জীবনযাপন করছেন এমনকি ছয় সন্তানের মধ্যে তার প্রাপ্ত বয়সের মেয়ে মোছা. মমতাজ খাতুনকে অর্থাভাবে বিয়েও দিতে পারছেন না। বয়সের ভারে ন্যুয়েপড়া মজনু মিয়া পেটের তাগিদে স্ত্রী লাইলী বেগমকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে শ্রম বিক্রি করে কোনো মতে দিনাতিপাত করছেন। যেন থমকে গেছে তার জীবন। মজনু মিয়া দেশ স্বাধীন করেও শুধু পেয়েছেন একটি সার্টিফিকেট। এটাই এখন তার স্মৃতি হয়ে আছে।

(ঢাকাটাইমস/২১ফেব্রুয়ারি/প্রতিনিধি/এলএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত