কাঁকন বিবি নয়, কাঁকাত হেনিনচিতা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৮, ১১:৪৬ | প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৮, ১০:৪২

কাঁকন বিবি নামে পরিচিতি পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার আসল নাম কাঁকাত হেনিনচিতা। নামটি খাসিয়া। তার পূর্বপুরুষেরা মেঘালয় থেকে সুনামগঞ্জে আসেন।

কাকাঁত হেনিনচিতার জন্ম ব্রিটিশ শাসনের অধীন থাকা ভারতের সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে। শৈশবে সেখানেই বেড়ে ওঠেন তিনি।

১৯৭১ সালে কাঁকাতের বয়স চুয়াল্লিশ এর মতো। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন সেক্টর পাঁচে। সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন শত্রুক্যাম্পের খবরাখবর নিয়ে আসার।

পাঁচবার সফল হয়েছিলেন, একবার পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। এপর যে নির্মম অত্যাচার চলেছে, কৃষ্ণবর্ণের শরীরে ৯০ বছর বয়সেও দাগগুলো ছিল স্পষ্ট।

কাকাঁত লড়েছেন সম্মুখ সমরেও, একটি নয়, তিন তিনটি। একটি অপারেশনে গেরিলা যোদ্ধারা যখন গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু উড়িয়ে দিতে পারছে না তখন কাঁকাত কলার ভেলায় করে ডিনামাইটগুলো সেতুর কাছে যান এবং পরে সেটি উড়িয়ে দেয়া হয়।

সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ‘ডুয়েল এজেন্ট’ হিসেবে বিভিন্ন তথ্য সরবরাহ করেছেন।

সুনামগঞ্জের টেংরাটিলা, আমবাড়ী, বাংলাবাজার, টেবুর, আন্দরটিলা, দূরবীণ প্রভৃতি অঞ্চলের যুদ্ধে তার বিশেষ বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

কাকাঁত বা কাঁকনের প্রথমে বিয়ে হয়েছিল ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের সেনা পাঞ্জাব প্রদেশের আব্দুল মজিদ খানকে। সেটি সম্ভবত ১৯৫৮ কি ১৯৫৯ সালে।

বিয়ের পর কাঁকন বিবি হিসেবে নাম হয়। মজিদ খান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বদলিও হতেন। কাঁকন বিবিকেও তিনি সাথে নিয়ে যেতেন তখন। বিবাহিত জীবনের আট বছরে ঘরে তিনটি সন্তান জন্ম নেয়। কিন্তু জন্মের পরপরই মরা যায় তারা। এক পর্ায়ে মজিদ খান সিলেট আখালিয়া ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কাঁকন বিবিকে ছেড়ে উধাও হয়ে যান।

পরে কাঁকন ফিরে আসেন ভগ্নিপতি ও বোনের সংসারে। মজিদ খানও তাঁর কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। তবে তাঁর কারণেই পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার পর জীবন বাঁচে কাঁকনের।

যদ্ধের আগে কাঁকন বিবির আবার বিয়ে হয় কৃষক শাহেদ আলীর সঙ্গে। জন্ম নেয় সন্তান সখিনা বিবি।

এর মধ্যেই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলটি ছিল পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। আবার এই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই ছিল পাকিস্তানীদের ক্যাম্প। যা স্থানীয়ভাবে টেংরা ক্যাম্প নামে পরিচিত।

মীর শওকত আলী একদিন মুক্তিযোদ্ধার ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে কাঁকন বিবিকে পাকিস্তানীদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে লাগানোর জন্য উৎসাহিত করেন। রাজি হয়ে যান কাঁকন।

বুদ্ধি খাটিয়ে একটি ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে একদিন দিনের বেলায় ভিক্ষা করার নাম করে ঢুকেন টেংরা ক্যাম্পে। কৌশলে তথ্য সংগ্রহ করেন। পাকিস্তানি সেনারা কিছু ময়দা ও আটা ভিক্ষা দেয়।

পরের দিন কাঁকন বিবি একই কায়দায় ঢুকেন টেংরা ক্যাম্পে। এ সময় তাকে আটকে ফেলা হয়। কিন্তু নির্যাতন শেষে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এর মধ্যে পাকিস্তানি ক্যাম্পে যাওয়ায় স্বামী শাহেদ আলী ছেড়ে দেন কাঁকনকে।

টেংরা ছাড়াও সুনামগঞ্জ, সিলেট,গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার ক্যাম্পে গিয়ে সব তথ্য এনে মুক্তিযোদ্ধাদের জানাতে থাকেন কাঁকন। আর তার দেয়া তথ্যে চালানো হয় বেশ কিছু অভিযান।

এর মধ্যে টেংরা ক্যাম্পে রাজাকাররা টেংরা ক্যাম্পে কাঁকনের বিষয়ে তাদের সন্দেহের কথা জানিয়ে দেয় পাকিস্তানিদের। তার ভগ্নিপতি মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হওয়ায় তাকে হত্যার কথাও জানায় তারা।

আর টেংরা ক্যাম্পে ঢুকার পর আটক করা হয় কাঁকনকে। পাকিস্তানি সেনারা কাঁকনের উরুতে লোহার শিক ঢুকিয়ে তাকে অজ্ঞান করে ফেলে। তারপরও জ্ঞান ফেরার পর জিজ্ঞাসাবাদে কিছুই স্বীকার করেননি কাঁকন। জানান প্রথম স্বামী মজিদ খানের খোঁজে ক্যাম্পে এসেছেন তিনি।

মজিদ খান সিলেটে থাকেন জানার পর ক্যাম্প কমান্ডার ওয়্যারলেসে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং মজিদ খান স্বীকার করেন যে, কাঁকন বিবি নামে তার স্ত্রী আছেন। সে সুবাদেই বেঁচে যান তিনি। তবে মজিদ খানের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হয়নি।

যুদ্ধ শেষে স্বামীহারা কাঁকাত হেনিনচিতা বা কাঁকন বিবি ঢাকায় চলে আসেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়িও খুঁজে বের করেন। কথা হয় জাতির জনকের সঙ্গে। নিজের পরিবারেই তাকে আশ্রয় দেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর আপত্তি থাকলেও ’৭৫-এর শুরুর দিকে কাকাঁত ফিরে যান গ্রামেন। ওই বছরই হত্যা করা হয় জাতির জনককে। অভিভাবক হারায় বাংলাদেশ, কাকাঁতও।

এরপর কাকাঁতের এই কীর্তির কথা যুদ্ধ শেষে ভুলে যেতে থাকে সবাই। তবে পত্রিকার পাতায় ১৯৯৬ সালে উঠে আসে তার বীরত্ব। আর প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সাথে দেখা কেরেন। দেয়া হয় খাস জমি, সেখানে উঠে বাড়ি। সরকারি ভাতার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগে মাসোহারার ব্যবস্থাও হয়।

২০০৭ সালে সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বেসরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকাটাইমস/২২মার্চ/ডব্লিউবি

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত