‘৪৩ বছর ধরে আমরা অহেতুক এলডিসির গ্লানি সয়েছি’

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৮, ১২:৫২

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসির তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘গত ৪৩ বছর ধরে আমরা অহেতুক একটা গ্লানি বহন করে চলেছি। এটা আমাদের নিজেদের দোষে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশে ছিলাম না। আমরা অ্যাপ্লাই করে যেচে এলডিসিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছি সাহায্যের আশায়। আমরা ওই ক্রাইটিরিয়ায় পড়তাম না। ৭৫ মিলিয়ন বা তার চেয়ে বেশি মানুষ হলে তাদের এ ধরনের ক্রাইটিরিয়ায় নেয়া হয় না। বাংলাদেশটা ছিল একটা ব্যতিক্রম। এরপরে আমরা জাতিসংঘের যে সূচকগুলো আছে সেগুলো আর অতিক্রম করতে পারিনি। আমাদের চেয়ে খারাপ অবস্থায় থেকেও কিন্তু ভিয়েতনাম এলডিসি কান্ট্রি হয়নি। তারা তাদের মর্যাদা নিয়ে চলেছে, তারা অনেক সূচকে আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে।’

বুধবার মধ্যরাতে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ের ‘আজকের সংবাদপত্র’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী।

মহিউদ্দিন আহমদ একাধারে লেখক ও গবেষক। বাংলাদেশের চলমান রাজনীতির ওপর তার পাঁচটি বই রয়েছে বাজারে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের সুফল হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমাদের ভিখারি বলে অনেকে তামাশা করতো, সেটা হয়তো বন্ধ হবে। যদি আমরা নিজেদের মর্যাদাটা নিজেরা রক্ষা করতে পারি। এখনই কিন্তু তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ঋণে সুদ বেশি নিতে হবে। আমাদের অসুবিধা হবে। আমরা বিভিন্ন দেশ থেকে যে সুবিধা বাণিজ্যিক এই আহজারি শুরু হয়ে গেছে। এটার কিন্তু প্রয়োজন ছিল না। আমি উন্নয়নশীল দেশ তখনোই হবো যখন আমার ইকোনোমিক সক্ষমতাটা বাড়বে। আমি যদি সক্ষম হই তাহলে ওই জিনিসগুলোতো মোকাবেলা করতে পারবো। আমার প্রতিবেশী দেশগুলো মোকাবেলা করছে, ভারত করছে, পাকিস্তান করছে, শ্রীলঙ্কা করছে, মালদ্বীপ করছে, তাহলে আমরা কেন পারবো না।’

বাংলাদেশের রাজনীতির বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিকে দেখতে হলে মোটা দাগে কয়েকটি পর্বে ভাগ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের মধ্যে এক ধরনের আবেগ কাজ করছিল। আমরা স্বাধীনতা চাই, আমাদেরকে আমরাই নিয়ন্ত্রণ করবো, আমরাই ম্যানেজ করবো- এ রকম একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু দূরবর্তী কোনো ভিশন ছিল না আসলে। মুক্তিযুদ্ধের পরে পরেই আমরা এমন একটা অগোছালো অবস্থার মধ্যে পড়লাম। ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি, সবকিছু, ওর মধ্য থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। এই সময়টা একটা ডামাঢোলের মধ্যে দিয়ে গেছে। যে আমরা উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। সেটার একটা ছন্দপতন হলো ১৯৭৫ সালে এবং বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হলেন।’

রাজনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, ‘এরপর টানা ১৫ বছর দেখলাম একধরনের শাসন। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার, এক ব্যক্তির হাতে সবকিছুর ক্ষমতা। একবারে রেডিমেন্ট গভর্নমেন্ট বলা চলে এক সেন্সে। সামরিক-বেসামরিক মিলে। এটা আসলে সামরিক-বেসামরিক আমলাদেরই জোটবদ্ধ সরকার বলা যায়। তারা রাজনীতিবিদদের নিয়ে পরে দলও করেছেন। সেটা এক ধরনের স্থিতিশীলতা দিয়েছিল দেশটাকে।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘৭৫ এর পরে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতন্ত্র, সেটা হলো সংসদীয় গণতন্ত্র। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কিন্তু আশির দশক জুড়ে আমরা দেখেছি এ দেশে ছাত্র গণআন্দোলন। তার ফলে ১৯৯০ সালে যখন এরশাদ সরকারের পরিবর্তন হলো তখন কিন্তু সংসদীয় ধারায় আমরা এলাম। ১৯৯১ থেকে শুরু করে ২০০৬ পর্যন্ত একটা ধারায় চলেছিল। ওই সময় একটা জিনিস দেখলাম যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা। তারাই একদল আরেক দলকে বিশ্বাস করে না। একদল আরেক দলকে চোর বলে, ফ্যাসিস্ট বলে।’

এই বিশ্লেষক বলেন, ‘এখন মুশকিল হয়ে গেছে এখানে যে, এই অবস্থায় নির্বাচনটি হয়ে গেছে প্রশ্নবিদ্ধ। সেই বাস্তবতায় কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি এসেছিল। তাকে জনপ্রিয় করেছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বেনিফিটও পেয়েছিল ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে। তারপরও কিন্তু পরাজিত পক্ষ ভোটের রেজাল্ট মনে প্রাণে মেনে নেয়নি। পরস্পরের মুখোমুখি বড় দুইটি রাজনৈতিক শক্তি। কেউ কারো ওপর আস্থা রাখছে না।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘২০০৭ সালে আমরা দেখলাম এক এগারোর পালাবদলটা হলো। ওই দুই বছরও কিন্তু আমাদের পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিরাট ঝাঁকুনি খেয়েছে। এরপরে জনমনে একটা স্বস্তি এসেছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরে। আবার আমরা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় গেলাম। যে ঝাঁকুনিটা খেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো এখান থেকে তারা কিছু শিক্ষা নেবে এটা আমাদের একটা ধারণা ছিল। আমার মনে হলো শিক্ষা তারা নেননি। সুতরাং আমরা কিন্তু আগের থেকেও খারাপ অবস্থায় গেছি।’

বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ‘এখন আওয়ামী লীগ ১০ বছর একটানা সরকারে আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে তারা পরপর দুই মেয়াদে ক্ষমতায় আছে। এক্ষেত্রে আমি বলবো, রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে এক ধরনের স্থিতিশীলতা আছে। তারা নীতিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারছে। মিডট্রাম যে প্রোগ্রামগুলো ছিল তারা বিনা বাধায় ইমপ্লিম্যান্ট করতে পেরেছে। একই সঙ্গে আমরা দেখছি যে দীর্ঘদিন একটানা ক্ষমতায় থাকার কারণে, ক্ষমতা কিন্তু এদেশে সব সময় রাজনীতিবিদদের বিনয়ী করে না। তাদেরকে আরও এরোগেন্ট করে দেয়। সেই এরোগেন্টেসের লক্ষণ কিন্তু পুরোপুরি স্পষ্ট।’

রাজনীতির এই বিশ্লেষক বলেন, ‘আমরা জানি এবার নির্বাচনের বছর। নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের কাছে আসে এবং ওই সময়টা রাজনীতিবিদরা আরও বিনয়ী হবে এটাই কিন্তু আমরা আশা করি। আমরা কিন্তু সেরকম কোনো লক্ষণ দেখছি না।  অনেক ক্ষেত্রে আমি বলবো একদিকে উন্নয়ন আমরা দেখছি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, এই প্রবৃদ্ধির হার আগের চেয়ে অনেক স্টেডি, একনাগারে ৬ থেকে ৭ শতাংশ কখনো কখনো ৭ শতাংশের বেশি। এটা একটা ইতিবাচক দিক আমাদের অর্থনীতির ক্ষেত্রে।’

তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে আমরা দেখছি মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ। কারণ লাভজনক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বেকারত্ব অসম্ভব বেড়ে গেছে। বেকারত্ব কী পরিমাণ বেড়েছে তার একটা প্রমাণ আমরা কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম। মানুষ বেপরোয়া হয়ে নৌকায় করে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার দিকে রওনা দিয়েছে। অর্থাৎ দেশে কাজ নাই, বাইরে কাজের সুযোগটুকু মুনাফাখোরদের পকেটে চলে যাচ্ছে। এজন্য মানুষ বেপরোয়া হয়।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘এই রকম অবস্থা কিন্তু বেশিদিন চলতে পারে না। কিছুদিন আগে একটা জরিপের রিপোর্ট প্রকাশিত হলো গণমাধ্যমে, আমরা দেখলাম যে ৮২ শতাংশ তরুণ দেশে থাকতে চায় না। এটা আমাদের জন্য অশনি সংকেত। তরুণরাই দেশের ভবিষৎ, জাতির ভবিষৎ। তাদের মনে যদি এই চিন্তাটা আসে তার মানেটা কী, এই হতাশার জায়গাটাতো আমরা খোঁজে দেখার চেষ্টা করছি না। আমরা গণতন্ত্র বলে বলে মুখে ফেনা তোলে ফেলছি, সামগ্রিক অবস্থা আমার কাছে খুব একটা অনুকূল মনে হচ্ছে না।’

বিশিষ্ট এই লেখক বলেন, ‘সবকিছু চলছে, কিন্তু কথা হচ্ছে যেভাবে চলছে সেখাকে বলে এক ধরনের ইটালিয়ান সিস্টেমের মতো। সরকার কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় ভুলভ্রান্তি করে থাকে। সেই ভুলটি ধরিয়ে দেয়ার দায়িত্ব হচ্ছে বিরোধী দলের, গণমাধ্যমের ও নাগরিক সমাজের। কিন্তু সরকার এমন একটা অবস্থায় এসেছে, সরকার কিন্তু গণমাধ্যমকে বৈরী মনে করে অনেক ক্ষেত্রে। আমরা দেখি অসহিঞ্চু আচরণ। নাগরিক সমাজকেতো পুরোপুরি বৈরী মনে করে এখন। নাগরিক সমাজ যেটুকু আছে তার মধ্যে একটা রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে। তারপরও যারা একটু শব্দ-টব্দ করেন রাষ্ট্র তাদের সঙ্গে খুবই বৈরী আচরণ করে। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের মনে করা হয় তারা গণতান্ত্রিক শক্তির বিপক্ষে। তৃতীয় শক্তির পক্ষে উকালতি করছে। তৃতীয় শক্তি মানে হচ্ছে সামরিক শক্তি এই জাতীয় কিছু। এই ধরনের একটা প্রচার কিন্তু আছে। এটা কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য, নাগরিক সমাজের জন্য কারো জন্য শুভ না।’

(ঢাকাটাইমস/২২মার্চ/এমএবি/জেবি)      

 

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত