সব কৃতিত্ব জনগণের: প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৮, ২০:৩১ | প্রকাশিত : ২২ মার্চ ২০১৮, ১৪:১৮

বুভুক্ষু মানুষের বাংলাদেশ কীভাবে পাল্টে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তর হলো, সেই চেষ্টার কথা তুল ধরলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে এখন যত সহজে সব কিছু বলা যায়, যাত্রা পথ যে ততটা সহজ ছিল না, সেটিও মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের সব কৃতিত্ব দিয়েছেন দেশের জনগণকে। বলেছেন, সরকার প্রথ প্রদর্শন মাত্র।

উন্নয়নের ধারা যেন থমকে না যায়, অর্জন যেন ধরে রাখা যায়, তারও তাগাদা দেন প্রধানমন্ত্রী।

স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের স্বীকৃতিপত্র পেয়েছে বাংলাদেশ। গত ১৬ মার্চ জাতিসংঘ এই স্বীকৃতিপত্র হস্তান্তর করে বাংলাদেশকে। আর এই আনন্দে আজ বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানমালা।

সকালে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রীকে এই অর্জনের জন্য সংবর্ধনা দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিষয়ে একটি ভিডিওচিত্র উপস্থাপন করা হয়। এরপর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত পুরো প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে জাতিসংঘের স্বীকৃতিপত্র তুলে দেন অর্থমন্ত্রী। পরে প্রধানমন্ত্রী একটি স্মারক ডাক টিকিট এবং পরে ৭০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক নোট উদ্বোধন করেন।

এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিরোধীদলীয় নেতা, ১৪ দল, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী, শিল্পী, সাহিত্যিক খেলোয়াড়, তিন বাহিনীর প্রধান শিশু, প্রতিবন্ধী, শ্রমজীবীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বাঙালিকে দেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। আজকে আমাদের যে উত্তরণ, আমরা যে উন্নয়নশীল দেশ, আমার সেই কথাটাই আমার বারবার মনে পড়ে।’

উন্নয়নের জনগণকে সব ‍কৃতিত্ব দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি মনে করি বাংলাদেশের জনগণই হচ্ছে মূল শক্তি। তারা পারে সব ধরনের অর্জন করতে।’

‘আমরা সরকারে থেকে পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছি, পথ দেখিয়েছি। কিন্তু যারা কাজ করেছে, কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষ থেকে শুরু করে, আমাদের পেশাজীবী, সরকারি কর্মচারীরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে যে উন্নয়নের ধারাটা শুরু হয়েছে, এটা যেন অব্যাহত থাকে, সেটাই কামনা করি।’

‘আমি বিশ্বাস করি আমরা ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে এই দেশকে আমরা গড়ে তুলতে সক্ষম হব।’

বাংলাদেশকে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে বলেও আশাবাদী শেখ হাসিনা। বলেন, ‘তখন তো আর বেঁচে থাকব না। আজকের আজকের প্রজন্ম, নিশ্চয় তারা এগিয়ে নেবে, ২০৪১ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ হবে শ্রেষ্ঠ দেশ।’

‘ক্ষমতায় আসার আগেই পরিকল্পনা ছিল .লীগের’

বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগের যে পরিকল্পনা, সেটাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে মনে করে রাজনৈতিক দল মানে শুধু স্লোগান দেয়া, মিছিল করা আর বক্তৃতা দেয়া। আওয়ামী লীগ কিন্তু তা না। আমরা সব সময় চিন্তা করেছি, আমরা কীভাবে দেশকে উন্নত করব। জাতির পিতার যে চিন্তা ভাবনা তার প্রতিফলন কীভাব ঘটাব।’

১৯৯৬ সাল এবং ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার আগেই দলের উপকমিটি গঠন করে বিভিন্ন সেমিনার করে অর্থনৈতিক নীতিমালা গ্রহণ করার কথাও জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি।

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও মশিউর রহমানকে নিয়ে কমিটি করে ক্ষমতায় গেলে কীভাবে কাজ করা হবে, সেই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

‘কী কী কাজ কীভাবে করব, তারও একটা পদক্ষেপ আমরা করে রেখেছিলাম। নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমরা একে একে বাস্তবায়ন করতে শুরু করলাম।’

গ্রামমুখী উন্নয়ন পরিকল্পনায় এগিয়েছে বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রী জানান, তার সরকার গ্রামকে প্রাধান্য দিয়ে উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করেছে বলেই বাংলাদেশ সাফল্য পেয়েছে।

‘সে কারণেই ৯৬ সালে এসেই সামাজিক নিরাপত্তা, যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী পরিত্যাক্তা ভাতা-এগুলো দিতে শুরু করলাম।’

‘উদ্দেশ্যটা ছিল, আমরা এমন দেব না যেন মানুষ কর্মবিমুখ হয়। এমনভাবে দেব, অন্তত যেন তারা এক বেলা যেন খেতে পারে, একেবারে যেন নিরন্ন না থাকে। আবার যেন তাদের কর্মক্ষমতাটাও যেন কাজে লাগাতে পারে, সেটা হিসাব করে।’

ভূমিহীন মানুষদের জন্য গুচ্ছগ্রাম করা, ভিটেমাটি আছে, কিন্তু টাকা নেই, এমন মানুষদের জন্য গৃহায়ণ তহবিল করে বাড়ি করার ব্যবস্থা করে দেয়ার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

দুঃস্থ মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধীর জন্য ভাতার পাশাপাশি যুবকরা যেন বিনা জামানতে দুই লক্ষ টাকা নিয়ে ব্যবসা করতে পারে সে জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক ও তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বিশেষায়িত কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক, গ্রামের মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, উৎপাদন বৃদ্ধি করতে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।

কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতালে শয্যা, ডাক্তার ও নার্সদের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে চিকিৎসা সেবা যেমন জনগণের দোড়গোড়ায় পৌঁছেছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে পয়সায় বই, বৃত্তি দেয়া, তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার ব্যবস্থা করা, বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার কথাও জানান শেখ হাসিনা।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয় টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে বহুমুখী কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বেসরকারি খাত কর্মসংস্থানকে প্রাধান্য

প্রধানমন্ত্রী তার উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বেসরকারি খাতকে প্রাধান্য দেয়ার কথা বলেন।

‘বেসরকারি খাতকে আমরা গুরুত্ব দিলাম এ কারণে যে সরকারের একার পক্ষে সব কাজ করা সম্ভব নয়। বিদ্যুৎ, ব্যাংক, বিমা, বিমান, টেলিভিশন, রেডিও থেকে শুরু করে সকল খাতে বেসরকারি খাতে যেন বেসরকারি বিনিয়োগ হতে পারে, সে উদ্যোগ নিলাম।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে কাজই করেছি একটা চিন্তাই মাথায় রেখেছি, কর্মসংস্থান যাতে বেশি করে হতে পারে।’

শিক্ষাতেও বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘সরকারি বেসরকারি খাত মিলিয়ে আমরা বহুমুখী শিক্ষার সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করলাম যেন আমাদের ছেলে মেয়েরা লেখাপড়ার দিকে আরও ঝুঁকে আসে।’

‘আমরা ন্যাশনাল সার্ভিসের মাধ্যমে ছেলে মেয়েদেরকে ট্রেইনিং দিচ্ছি যেন কর্মসংস্থান হয়।’

সর্বোপরি পাঁচ বছর মেয়াদী পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং ১০ বছর মেয়াদী পরিপ্রেক্ষিত পরিকল্পনা নিয়ে সরকার কাজ করেছে বলেই সাফল্য এসেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

পথ ছিল কঠিন

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কথাগুলো যত সহজে বললাম, সময় কিন্তু এত সহজে যায়নি।’

‘অনেক চড়াই উৎড়াই পার হতে হয়েছে। অনেক বাধা বিঘ্ন অতিক্রম করতে হয়েছে। অনেক পথের কাঁটা পায়ে ঠেলে এগিয়ে যেতে হয়েছে। বারবার আঘাত এসেছে।’

‘গ্রেনেড হামলা থেকে শুরু করে বারাবর মৃত্যুকে দেখেছি। ভয় পাইনি কখনও, মৃত্যুকে কখনও ভয় পাই না।’

‘আমার পিতা-মাতা ভাইদের খুনিদের ইনডেমনিটি দেয়া হয়েছিল, বিচার হবে না। তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে, রাজনীতি করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে, তারা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছে, ভোট চুরি করে পার্লামেন্টেও বসার সুযোগ পাচ্ছে।’

‘যুদ্ধাপরাধী, যারা এ দেশে গণহত্যা চালিয়েছে, যারা ৭৫ এর পর ক্ষমতায় আসার সুযোগ পেয়েছিল, তাদের অবস্থানম সব কিছু মিলিয়ে একটা বৈরী পরিবেশে আমি দেশে এসেছিলাম।’

যেমন ছিল বাংলাদেশ

১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ফেরার সময় বাংলাদেশ কেমন ছিল তা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যখন ২১ বছর পর সরকার গঠন করলাম, তখন এই দেশে একটা এলিট শ্রেণি তৈরি হয়েছে, কিন্তু দরিদ্র মানুষ দরিদ্রই রয়ে গেছে, বুভুক্ষুই রয়ে গেছে।’

‘এমন একটা অবস্থা ছিল আমার দেশের মানুষ এক বেলা খেতে পেত না, আমি নিজে দেখেছি অনেক গ্রামে গ্রামে দিয়ে হাড্ডিসার, কঙ্কালসার মানুষ, এক বেলা খেতে পায় না, পরনে জীর্ণ কাপড়, থাকার ঘর নাই। রেল লাইনের পাশে অথবা স্টেশনের কাছে এখানে সেখানে পড়ে থাকে অথবা জীর্ণ কুটিরে বাস করে।’

‘বৃষ্টির পানি যেমন আসে, চাঁদের আলোও আসে। কিন্তু তাদের মনে, তাদের পেটে ক্ষুধার জ্বালা।’

‘প্রায়ই দুর্ভিক্ষ লেগে থাকে। আমরা ছুটে যাই, তাদের সাহায্য করি, লঙ্গরখানা খুলি। কিন্তু সেটা তো সমাধানের পথ না।’

অভিনন্দন পর্ব শেষে অতিথির্ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করেন।

(ঢাকাটাইমস/২২মার্চ/ডব্লিউবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত