মিছিল থেকে নারী লাঞ্ছনা: থমকে গেছে তদন্ত

আশিক আহমেদ, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৪ মার্চ ২০১৮, ১৮:৪১ | প্রকাশিত : ২৪ মার্চ ২০১৮, ০৭:৫৩
প্রতীকী ছবি

৭ মার্চ রাজধানীতে আওয়ামী লীগের সমাবেশগামী মিছিল থেকে কিশোরীকে হয়রানির ভিডিও চিত্র পাওয়া গেলেও অভিযুক্তদের শনাক্তের কোনো উদ্যোগই নেই পুলিশের। এখন বাহিনীটি আরও নতুন ভিডিও চিত্র পাওয়ার চেষ্টার কথা বলছে।

অথচ এই ঘটনার ১০ দিন পর বাসে যৌন হয়রানির ঘটনায় অভিযুক্ত বাস চালক ও সহকারীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পেরেছে। অভিযোগকারী ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানানোর পর পুলিশ তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অভিযান চালায়।

কিন্তু ৭ মার্চের ঘটনায় পুলিশের অনুসন্ধানই এখনও শুরু হয়নি। সেদিনকার একটি ভিডিও চিত্রতে হয়রানির বিষয়টি স্পষ্ট হলেও মিছিলটি আওয়ামী লীগের কোন ইউনিটের ছিল, তাতে কারা নেতৃত্বে ছিলেন, এবং কর্মী কারা ছিল, সে বিষয়ে অনুসন্ধানই শুরু হয়নি।

এতে পুলিশের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকার কর্মী সালমা আলী। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনা তো নতুন নয়। সেই ১৯৯৯ সালে থার্টিফার্স্ট নাইটে যৌন হয়রানির কোন বিচার হয়নি। এ কারণেই অপরাধীরা সব সময়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে। এর ফলে এই মনোভাবের মানুষ মনে করে তাদের কিছু হবে না। এ কারণেই তারা এসব অসভ্যতা করতে উৎসাহী হয়ে ওঠে।’

৭ মার্চে বেশ কিছু হয়রানির ঘটনা ঘটলেও বাংলামোটরে ঘটা একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী কিশোরীর বাবা অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলাও করেছিলেন। আর সরকারের পক্ষ থেকে দোষীরা যেই হোক না কেন শনাক্ত করে বিচারের আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আশ্বাসের কোনো বাস্তবায়ন হয়নি এখনও।

তিন বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে যৌন হয়রানির ঘটনাতেও আট জনের ছবি পাওয়া গেলেও সাত জনের নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি। আবার একজনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও তিনি জামিনে মুক্ত হয়েছেন আর মামলার সাক্ষীরা আদালতে হাজিরা না দেয়ায় বিচারও আগাচ্ছে না।

এই অভিজ্ঞতার কারণে ৭ মার্চের ঘটনায় বিচার হবে কি না, এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে সংশয়ের কথা বলাবলি হচ্ছে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ারর্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের স্মরণে গত ৭ মার্চ একই ময়দানে জনসভা করে আওয়ামী লীগ। আর এ জন্য আশপাশের বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল নিয়ন্ত্রিত ছিল। এ কারণে হেঁটে চলতে বাধ্য হয় মানুষ। আর চলার পথে জনসভায় আসা নেতা-কর্মীদের হাতে বেশ কয়েকজন নারী হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ উঠে।

এদের মধ্যে ভিকারুননেসার ছাত্রী অদিতি বৈরাগী ফেসবুকে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে যায়। তিনি জানান, বাংলামোটর এলাকায় সোহরাওয়ার্দীর সমাবেশে যাওয়া একটি মিছিল থেকে তাকে হয়রানি করা হয়েছে। তাকে থাপ্পরও দেয়া হয়েছে। এই ঘটনায় মানসিকভাবে ভয়াবহ বিপর্যস্ত জানিয়ে অদিতি এমনও লিখেন ‘আমি এই শুয়রদের দেশে থাকব না।’

অদিতির পাশাপাশি ইশরাতুল শোভা, আফরিন আসাদ মেঘলাসহ আরও বেশ কয়েকজন তরুণীও ফেসবুকে একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা লিখেন।

একজন লিখেছেন ‘আল্লাহ কেন মেয়েদের দুইটা হাত দিল? দুইটা হাত দিয়ে এতগুলো হাত থেকে বুক, পেট বাঁচাব, ওড়না ধরে রাখব নাকি তাদের হাতগুলো সরাব?’

অন্য একজন লিখেন, ‘হল থেকে বের হয়ে কোনও রিকশা পাইনি। কেউ শাহবাগ যাবে না। হেঁটে শহীদ মিনার পর্যস্ত আসতে হয়েছে। আর পুরোটা রাস্তাজুড়ে ৭ মার্চ পালন করা দেশভক্ত সোনার ছেলেরা একা মেয়ে পেয়ে ইচ্ছামতো টিজ করছে। নোংরা কথা থেকে শুরু করে যেভাবে পারছে টিজ করছে।’

নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

পরদিন রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান অদিতিকে হয়রানির ভিডিও পেয়েছেন তারা। মন্ত্রী সেদিন বলেন, ‘ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না।’

১১ মার্চ রাজধানীতে অন্য একটি আলোচনায় মন্ত্রী বলেন,  ‘ভিকারুননেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীকে বেশ কয়েকজন ওড়না ধরে টানাটানি করেছে এ ঘটনা সত্য। ভিডিও ফুটেজ দেখেছি, সেখানে দেখা গেছে।...ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক ছাড় দেওয়া হবে না।’

তবে মন্ত্রীর সেই আশ্বাস অন্তত এখন পর্যন্ত ফলেনি। হয়রানির ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। আবার মন্ত্রী ভিডিও ফুটেজে প্রমাণ পাওয়ার কথা বললেও  পুলিশ এখন বলছে, তারা এখনো সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করছে। এরপর জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের কাজ শুরু হবে।

নতুন ভিডিও চিত্রের সন্ধানে আগাচ্ছে না তদন্ত

৮ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ঘটনার ভিডিওচিত্র পাওয়ার পর পুলিশ বলেছিল, এই ঘটনায় দায়ীদের চিহ্নিত করা কঠিন হবে না। কারণ, কারওয়ানবাজার থেকে মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগের যে ইউনিটগুলো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাচ্ছিল তাদের ব্যানার ছিল। আর এই ব্যানার ধরেই নেতাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই কর্মীদের পরিচয় জানার আশার কথা বলেছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেই কাজটি করার চেষ্টা করেনি পুলিশ।

অদিতির বাবার করা মামলাটি তদন্তে প্রথমে দায়িত্ব দেয়া হয় রমনা মডেল থানার কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামকে। তবে দুই দিন পরেই তার কাছ থেকে তদন্ত ভার দেয়া হয় গোয়েন্দা বিভাগ ডিবিকে।

ঢাকটাইমসকে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই মামলাটির তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগ। আমি দুয়েকদিন মামলাটির তদন্ত করেছিলাম। এর সর্বশেষ তথ্য আমার জানা নেই।’

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণ বিভাগের রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার শামসুল আরেফিন ঢাকাটাইমনকে বলেন, ‘না এখনও পর্যন্ত এ ঘটনায় আমরা কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারিনি। কিছু ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছিল আরো কিছু ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এরপর আমরা কাজ শুরু করব। ’

‘তা ছাড়া ট্রাফিক পুলিশের যত সদস্য সেদিন এই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’

১৭ মার্চের ‘অপরাধীরা’ ধরা

১৭ মার্চ বাসে কলেজছাত্রীকে হেনস্তার শিকার ছাত্রী তাঁর উদ্ধার পাওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। আর পাঁচ দিনের মাথায় ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ বাসচালক ও তাঁর সহকারীকে গ্রেপ্তার করে।

ইডেন মহিলা কলেজের এক ছাত্রী ১৭ মার্চ সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে ফার্মগেটের সেজান পয়েন্ট থেকে মতিঝিল-মিরপুর চিড়িয়াখানা রুটে চলাচলকারী ‘নিউ ভিশন’ পরিবহনের একটি বাসে উঠেছিলেন। বাসে যাত্রী কম থাকায় অস্বস্তিতে যেতে চাইলে বাসচালকের সহকারী দরজাও রোধ করে দাঁড়ান এবং বাসচালক তাঁকে দরজা আটকে দিতে বলেন। এক পর্যায়ে বাসটি গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা করছে বলে মনে করে সহকারীকে ধাক্কা দিয়ে নেমে যান ওই ছাত্রী।

ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার পর এরপরই ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (পশ্চিম) কাজ শুরু করে।

ওই ছাত্রীর ফেসবুক পেজের ‘প্রাইভেসি রেসট্রিকটেড’ ছিল। তারপরও পুরিশ চেষ্টা করে ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। এক পর্যায়ে অভিযুক্তদের শনাক্ত করে আটক করা হয়। প্রথমে অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরে তারা দায় স্বীকার করে নেয়।

ঢাকাটাইমস/২৪মার্চ/এএ/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত