‘মুক্তাঙ্গন’ কোথায় জানেন?

দিদার মালেকী
 | প্রকাশিত : ১৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৯:৫১

শহরে দাঁড়ানোর জায়গা কমেছে। দাঁড়ানো বলতে অহেতুক দাঁড়িয়ে থাকা নয়। কোনো ন্যায্য কিংবা যৌক্তিক দাবি আদায়ে দাঁড়ানো। এ দাঁড়িয়ে থাকা গণমাধ্যমের বদৌলতে পৌঁছে যাবে সংশ্লিষ্ট মহলে। ঢাকায় এমনই একটা দাঁড়ানোর জায়গা ছিল। দাবি-দাওয়া নিয়ে নিত্যদিন সেখানে দাঁড়াতো সামাজিক-রাজনৈতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সমিতি-সংগঠন। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অনেক রাজনৈতিক দলও দাঁড়াতো সেখানে। শিক্ষানবিশ রিপোর্টারদের অ্যাসাইনমেন্ট থাকতো সে জায়গায়। কতো কতো নিউজের খেই পাওয়া যেত সেখানে। তাদের সাংবাদিকতার গোড়াপত্তনে সেটা ছিল এক বুনিয়াদি ক্ষেত্রপীঠ। এমনকি গত দশকের শেষের দিকেও সে জায়গাটির স্বতন্ত্র এক অস্তিত্ব ছিল। সে জায়গাকে কেন্দ্র করে পুলিশি অবস্থানও থাকতো লক্ষ্যণীয়। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় দু’চারটা খবর থাকতোই সেখান থেকে সংগৃহীত। কোথায় যেন হারিয়ে গেল সে জায়গাটি!

বলছিলাম রাজধানীর ‘মুক্তাঙ্গন’-এর কথা। সহকর্মী অনেক সাংবাদিকের মনে পড়ল বুঝি এবার। সাংবাদিকতার শুরুর দিনগুলোতে মুক্তাঙ্গনে অ্যাসাইনমেন্ট থাকতো। কতো কতো সংগঠন-সমিতির দেখা মিলতো এখানে! তাদের কতো রকমের দাবি দাওয়া থাকতো। সেসব থেকে ‘নিউজ’ বের করে প্রতিবেদন তৈরি করতে হতো। মাঝেমধ্যে সেখানে পুলিশি হানাও থাকতো। হঠাৎ করে মুক্তাঙ্গন হারিয়ে যেতে বসল। ২০১১ সালের দিকে এসে মুক্তাঙ্গন যেন লুপ্তাঙ্গনে পরিণত হলো। লোকজন দাবি-দাওয়া নিয়ে এখানে দাঁড়ায় না আর। সবাই প্রেসক্লাবমুখো হয়ে গেল। হয় প্রেসক্লাবের সামনের রাস্তায় মানববন্ধন, নয়তো সহজেই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন। অথচ আগে সংবাদ সম্মেলনের একটা ওজস্বি ব্যাপার ছিল। এখন যে কেউ যেকোনো কারণেই সংবাদ সম্মেলন করছে। ওই অর্থে সেসব থেকে সংবাদও মিলছে না তেমন। অন্যদিকে মুক্তাঙ্গনে দাঁড়ালেই আলাদা একটা ব্যাপার থাকতো। কেননা ওখানে কেউ এমনি এমনি দাঁড়াতো না। দাঁড়াতো কোনো না কোনো যৌক্তিক অধিকার আদায়ের দাবি-দাওয়া নিয়ে। ওই মাহাত্মটুকু ছিল মুক্তাঙ্গনের। ছিল তার ‘সংবাদ-গুরুত্বও’।

সম্ভবত ২০০৯ এর কোনো এক বিকেলে মুক্তাঙ্গন হয়ে ফিরতে গিয়ে দেখি অদূরে রাস্তার কিনারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন প্রখ্যাত দর্শন-তাত্ত্বিক সরদার ফজলুল করিম। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এ মনীষা ব্যক্তিত্বের সঙ্গে কিছুটা কথা বলার সৌভাগ্য হয়েছিল। সেটা যথার্থই মুক্ত আলোহাওয়ার বিকেল ছিল। তাঁর মুখ থেকে শুনেছিলাম শ্রমকেন্দ্রিক মানুষের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে নানা কথা। তাঁর কথার সূত্র ধরেই আমার মনে পড়ছিল- কতো কতো শ্রেণি পেশার মানুষের মুখ! যারা ভাবতো মুক্তাঙ্গনে এসে দাঁড়ালেই বুঝি টনক নড়বে সরকারি মহলের। মিলবে দাবিদাওয়া নিয়ে কোনো না কোনো আশ্বাস। আবার এখানেই দেখেছিলাম উত্তরবঙ্গের ‘পাহান’ জনগোষ্ঠীর নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকা। কিংবা সড়ক দুর্ঘটনায় পা হারানো পুত্রের জন্য মায়ের আকুতি। যারা শুধু জেনেছিল রাজধানীর মুক্তাঙ্গনে গিয়ে দাঁড়ালেই তাদের নিয়ে লিখবে পত্রপত্রিকা! আহা, কোথায় হারিয়ে গেল সে অঙ্গন, ‘মুক্তাঙ্গন’।

পাকিস্তান আমলে প্রায় ৮৪ শতাংশ জমির ওপর রাজধানীর পল্টনে ‘মুক্তাঙ্গন’ নামে পার্কটি গড়ে ওঠে। জিপিওর পশ্চিম কোলঘেঁষা মুক্তাঙ্গন ১৯৭৯ সাল থেকে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন-সমিতির সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সর্বশেষ ২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল এক আদেশে মুক্তাঙ্গনে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। সেসময় হেফাজতে ইসলাম ও আরও কয়েকটি ইসলামি সংগঠন মুক্তাঙ্গনে পাল্টাপাল্টি সমাবেশ ডাকলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় ডিএমপি এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠনকে সেখানে সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি।

সভা-সমাবেশ না হওয়ার সুবাদে মহাসমারোহে শুরু হয় দখলের উৎসব। মূলত ১৯৯০ সালের পর থেকেই মুক্তাঙ্গনে দখল শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে এসে সে জায়গাটি যেন হারিয়ে ফেলেছে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব। ময়লার ভাগাড়ে এখন চাপা পড়ে আছে একদা জনরবে সরব থাকা ‘মুক্তাঙ্গন’। আরেক দশক পর হয়তো লোকে ভুলেই যাবে ‘মুক্তাঙ্গন’ নামে সত্যিই কোনো এক অঙ্গন ছিল রাজধানীর বুকে!

লেখক: কবি, সাংবাদিক, গবেষক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত