ট্রাম্পের প্রেম নাকি আসক্তি

সুলতানা স্বাতী
 | প্রকাশিত : ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১১:১৪

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের নারী আসক্তি ও হোয়াইট হাউসে নারীবিষয়ক কথা নতুন নয়। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে গেছে যেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নারী কেলেঙ্কারির ঘটনাগুলো। এমনিতেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের মন্তব্য, কর্মকাণ্ড আর কিছু নির্বাহী আদেশের জেরে বহুল সমালোচিত ও বিতর্কিত তিনি। রয়েছে একের পর এক হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের বরখাস্ত আর পদত্যাগের ভার। তার ওপর নতুন করে পর্নো তারকার সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনার প্রকাশ যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া।

এবারের এই কেলেঙ্কারি সামনে নিয়ে এসেছে মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। গত ১২ জানুয়ারি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে জার্নালটি। সেখানে জানানো হয়, ২০০৬ সালে এক পর্নো তারকার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু ওই পর্নো তারকা যাতে বিষয়টি নিয়ে মুখ না খোলেন, সেজন্য ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের অল্প কিছুদিন আগে নিজস্ব আইনজীবীর মাধ্যমে তাকে এক লাখ ৩০ হাজার ডলার দিয়েছিলেন ট্রাম্প।

ওই পর্নো তারকার আসল নাম স্টেফানি ক্লিফোর্ড। তবে পর্নো দুনিয়ায় তিনি স্টর্মি ডেনিয়েলস নামে পরিচিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণা যখন তুঙ্গে সে সময় মার্কিন টিভি চ্যানেল এবিসি নিউজকে এক সাক্ষাৎকার দেন ডেনিয়েলস। ওই সাক্ষাৎকারেই ট্রাম্পের সঙ্গে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্কের কথা প্রকাশ করেন তিনি। সে সময় নারীদের প্রতি বিদ্বেষমূলক কথাবার্তা ও যৌন হয়রানির অভিযোগ নিয়ে বেসামাল অবস্থায় ট্রাম্পের প্রচারণা শিবির। তখন নতুন করে আবারো এক কেলেঙ্কারি ঢাকতেই শুধু মুখ বন্ধ রাখতে ডেনিয়েলসকে ওই বিপুল অর্থ দেন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আইনজীবী মাইকেল কোহেন। শুধু তাই নয়, এ ব্যাপারে ডেনিয়েলসের আইনজীবী কেথ ড্যাভিডসনের সঙ্গে এক চুক্তিও হয়। আর চুক্তি করতে এক ‘ফেক’ কোম্পানিও খোলা হয়।

চুক্তি অনুসারে, দুজনের সম্পর্ক নিয়ে কোনো কথা বলতে পারবেন না কেউ। যদি বলেন, তাহলে যখন ও যতবার মুখ খুলবেন, তাকে ততবার এক মিলিয়ন ডলার করে জরিমানা দিতে হবে। চুক্তিতে অবশ্য ডেনিয়েলস অথবা ট্রাম্প কেউই নিজের নাম ব্যবহার করেননি। ডেনিয়েলসের নাম রাখা হয়েছিল পেগি প্যাটারসন, আর ট্রাম্পের নাম ডেনিস ডেনিসন। চুক্তিপত্রে পেগি প্যাটারসনের স্বাক্ষর থাকলেও ডেনিস ডেনিসন অর্থাৎ ট্রাম্পের কোনো স্বাক্ষর ছিল না। সম্ভবত ভবিষ্যতে বিপদে পড়লে যাতে অস্বীকার করতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই ট্রাম্প নিজের নাম স্বাক্ষর করেননি।

তবে ডেনিয়েলসকে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও বিষয়টি ট্রাম্প জানেন না বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী কোহেন। মক্কেলকে না জানিয়ে এক পর্নো তারকাকে বিপুল অর্থ দেওয়ার কোনো ব্যাখ্যা অবশ্য দিতে পারেননি তিনি। কিন্তু গল্পে গল্পে কোহেনই ফাঁস করেছেন বিষয়টি। আর জানুয়ারিতে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পরই বেঁকে বসেন ডেনিয়েলস। তার দাবি, অর্থ আদান-প্রদানের তথ্য ফাঁস করে দিয়ে তাদের মধ্যেকার চুক্তি ভঙ্গ করেছেন ট্রাম্পের আইনজীবী। অতএব এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলাতে ডেনিয়েলসের আর কোনো বাধা নেই। তাই তিনি যেখানে-সেখানে সাক্ষাৎকার দেওয়া শুরু করলেন। এমনকি সঠিক দাম পেলে ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রণয়ের বিস্তারিত বিবরণ, এমনকি প্রমাণপত্র দিতেও প্রস্তুত আছেন বলে জানালেন।

আর তার এই প্রস্তাবটাই লুফে নিলো ট্রাম্পবিরোধী গণমাধ্যমগুলো। বিভিন্ন গণমাধ্যমে ডেনিয়েলসের যে দেওয়া সাক্ষাৎকার থেকে যে তথ্য উঠে এসেছে তা অনেকটা এ রকম-বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়ার সঙ্গে বিবাহ ও গর্ভধারণের কিছুদিন পরই ক্যালিফোর্নিয়া ও নেভাদার মাঝামাঝিতে অবস্থিত লেক তোহায়ে রিসোর্টে অনুষ্ঠিত চ্যারিটি গলফ টুর্নামেন্টে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তার। এরপর ট্রাম্পের নিজস্ব হোটেলে তাকে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান ট্রাম্প। ওই সময়ই তাদের মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি ট্রাম্প নাকি ডেনিয়েলসকে নিয়মিত ফোন করতেন বলেও জানান। পরবর্তীতে টাচ উইকলি পত্রিকাকে এক ঘণ্টার একটি সাক্ষাৎকার দেন ডেনিয়েলস। সেখানে ট্রাম্পের লোকজন ডেনিয়েলসকে হুমকি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। ২০১১ সালে লাস ভেগাসের এক কার পার্কিংয়ে ডেনিয়েলসকে হুমকি দিয়ে ট্রাম্পের পিছনে না লাগার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

ট্রাম্প-ডেনিয়েলস সম্পর্ক চাউর হওয়ার পর ট্রাম্পের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার যেন অপূর্ব সুযোগ এসে যায় গণমাধ্যমগুলোর। ট্রাম্পের প্রেমিকাদের সম্পর্কে খবর বের করতে উঠে পড়ে লাগে তারা। ফলে বের হয়ে আসে বিভিন্ন সময়ে প্রেমিকাদের দীর্ঘ তালিকা। জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে প্রায় দুই বছর কারা ইয়াং নামের এক মডেলের সঙ্গে নিয়মিত ডেটিং করেছেন ট্রাম্প। রোয়ানি ব্রিউয়ার লাইন নামের ২৬ বছর বয়সী আরেক মডেলের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে কথা উঠেছিল কিছুদিন। কোনো এক পুল পার্টিতে ট্রাম্পের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল দুজনের। ১৯৯৫ সালের দিকে বেশ কিছুদিনের জন্য কাইলি ব্যাক্স নামের অন্য এক মডেলের সঙ্গে প্রকাশ্যেই ডেট করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শিথিল হলেও সম্পর্কটি বেশ কিছুদিন টিকিয়ে রেখেছিলেন তারা। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠলে তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন ব্যাক্স।

১৯৮৯ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ডেট করেছেন গ্যাব্রিয়ালা সাবাতানি নামের এক টেনিস খেলোয়াড়ের সঙ্গে। ইভানাকে ডিভোর্স দেওয়া এবং মেপলের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় এই সম্পর্কটি খুব একটা দীর্ঘ হয়নি। তবে ১৯৯৭ সালে আলসন জিয়ানিনি নামের ২৭ বছরের এক মডেলের সঙ্গে একসঙ্গে ছিলেন ট্রাম্প। এছাড়া ষাটের দশকের শেষ দিকে এমি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া অভিনেত্রী কেন্ডিস বার্গেনের সঙ্গে মজে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। মডেল ও টিভি তারকা আনা নিকোল স্মিথের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন ট্যাবলয়েড পত্রিকা সংবাদ প্রচার করেছে। গুজব রটেছিল ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজির স্ত্রী কার্লা ব্রুনিকে নিয়েও। সেটি ছিল ১৯৯১ সালের কথা। যদিও কার্লা সেই গুজব উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার মোটে একবারই দেখা হয়েছিল।

তবে এসব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে পর্নো তারকা ডেনিয়েলসের সঙ্গে সম্পর্কের কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে এখনো কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। এরই মধ্যে ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ডেনিয়েলসের আইনজীবী কেথ ড্যাভিডসন। গোপনীয়তা লঙ্ঘনের দায়ে কোহেনের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। কোহেনের যে ফেক কোম্পানি ডেনিয়েলসকে অর্থ দিয়েছে, সেই কোম্পানির বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। তার দাবি, যে চুক্তিতে এক পক্ষের স্বাক্ষর নেই, তার কোনো আইনি ভিত্তি নেই। অতএব চুপ করে থাকার যে চুক্তির কথা ট্রাম্পের আইনজীবী দাবি করেছেন, তারও কোনো আইনি ভিত্তি নেই। চুক্তি বাতিল করতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন তারা। এদিকে ডেনিয়েলসের বিরুদ্ধে সালিশি আদালতে নালিশ করেছেন ট্রাম্পের আইনজীবীও। চুক্তি ভঙ্গের দায়ে তার কাছে দুই কোটি ডলার দাবি করেছেন কোহেন। তার দাবি, চুপ থাকার জন্যই ডেনিয়েলসকে এক লাখ ৩০ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি কমপক্ষে ২০ বার সেই চুক্তি ভঙ্গ করেছেন।

এই ঘটনা কবে বা কিভাবে শেষ হবে তা কেউ জানে না। তবে এই ঘটনায় ঘরে-বাইরে সর্বত্রই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন ট্রাম্প। গৃহদাহ শুরু হয়ে গেছে ট্রাম্পের সংসারে। জানা গেছে, পর্নো তারকার সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্বামীর কাছ থেকে দূরে থাকছেন মেলানিয়া ট্রাম্প। যদিও মেলানিয়ার মুখপাত্র স্টেফানি গ্রিশাম জানিয়েছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ডেনিয়েলসের সম্পর্ক পুরোপুরি ভিত্তিহীন। আর এ নিয়ে উদ্বিগ্নও নন মেলানিয়া। ফার্স্ট লেডি হিসেবে মেলানিয়া তার ভূমিকা পালনে সচেতন। গণমাধ্যমের এসব ভুয়া ও মুখরোচক খবর তার সেই ভূমিকায় প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে জানান তিনি।

কিন্তু তারপরও চাপা থাকছে না ট্রাম্প-মেলানিয়া সম্পর্কের টানাপড়েন। হোয়াইট হাউসের গণ্ডি ছাড়িয়ে বাইরেও তা দৃশ্যমান হচ্ছে। এরই জেরে গত ২৫ জানুয়ারি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে ট্রাম্পের সঙ্গে অংশ নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করেন মেলানিয়া। ব্যক্তিগত ব্যস্ততার অজুহাত দেখালেও ওই সময় হোয়াইট হাউসেও ছিলেন না তিনি। একাই গিয়েছিলেন ফ্লোরিডায় অবকাশ যাপনে। এছাড়া ফার্স্ট লেডিস বক্স নামক একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্পকে সঙ্গে নিয়ে হাজির থাকার কথা থাকলেও সেখানে মেলানিয়াকে একা দেখা যায়। এর আগেও ট্রাম্পের বাড়ানো হাত মেলানিয়া বারবার উপেক্ষা করলে তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে গুঞ্জন ওঠে। তেল আবিবের বিমানবন্দরে লালগালিচা দিয়ে হাঁটার সময় ট্রাম্পের বাড়ানো হাত না ধরে হালকা চাপড় দিয়ে সরিয়ে দেন। কিছুদিন পর রোমের বিমানবন্দরেও ট্রাম্পের হাত প্রত্যাখ্যান করে নিজের চুল ঠিক করায় ব্যস্ত দেখা যায় মেলানিয়াকে। দুটি ঘটনার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে হইচই পড়ে যায়।

এদিকে ট্রাম্প-ডেনিয়েলস সম্পর্ককে সম্পূর্ণ গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও পার পাচ্ছে না হোয়াইট হাউস। সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাবই ঠিকমতো দিতে না পারায় ট্রাম্পের মুখপাত্ররা হচ্ছেন বিব্রত। এর আগে মার্কিন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের নারী কেলেঙ্কারি নিয়ে হোয়াইট হাউসে অভিশংসনের প্রস্তাব নেওয়া হয়েছিল। ট্রাম্পকে নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কিছু হয়নি। তবে হোয়াইট হাউসে তার অবস্থান অনেকটাই যে টালমাটাল, তা বুঝেছেন ট্রাম্প নিজেও। মার্কিন গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনগুলো খবরÑ এবার একটু ভুলচুক কিছু হলেই টলে যেতে পারে ট্রাম্পের ক্ষমতার গদি। ফলে যেন অনেকটাই চুপচাপ এখন ট্রাম্প।

সুলতানা স্বাতী: সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত