আওয়ামী লীগের ‘ব্যাডলাক’: পার্থ

মোসাদ্দেক বশির, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২২ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:৪৭

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানে ফোনালাপ ফাঁস করে সরকারি দল আওয়ামী লীগ লাভবান হতে পারেনি বলে মনে করেন ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ। তিনি এটাকে আওয়ামী লীগের জন্য ‘ব্যাডলাক’ হিসেবে দেখছেন।

শনিবার মধ্যরাতে চ্যানেল আইয়ের টক শো ‘তৃতীয় মাত্রা’য় অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। তার সঙ্গে টক শোতে আরও ছিলেন আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপন করেন জিল্লুর রহমান।

কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদাদলের শিক্ষক ও জাসাসের সভাপতি মামুন আহমেদকে লন্ডন থেকে ফোন করেন তারেক রহমান। ফাঁস হওয়া ওই ফোনালাপ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করে। এতে শোনা যায়, তারেক রহমান ওই শিক্ষককে আরও সংগঠিত হয়ে এই আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এটাকে আওয়ামী লীগ ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ হিসেবে দেখছে। সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা এটা নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন।

টক শোতে অংশ নিয়ে ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা আন্দালিব রহমান পার্থ এই প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন। বলেন, ‘আমি তারেক রহমানের ফোনালাপটা বেশ কয়েকবার শুনেছি।আমি খুঁজেই পেলাম না এখানে খারাপটা কী হলো। একটা ন্যায্য দাবি আমি বললাম যে, একটু অরগানাইজ করেন, দেখেন একটু ছাত্রদেরকে সহযোগিতা করেন। কাউকে রাস্তায় নামতে বলেননি, কাউকে জ্বালাও-পোড়াও করতে বলেননি। এটা আওয়ামী লীগের ব্যাডলাক যে, আওয়ামী লীগ এধরনের কিছু বের করতে পারেনি।’

‘তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচার করা তো আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ। আওয়ামী লীগের লোকজন এটা নিয়ে এতো কথা পেপার পত্রিকায় লেখলেন। উনারা কেন যেন মনে করেছেন, তারেক রহমানের এই বক্তব্য আসার পরে বিরাট একটা কিছু হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই বের করতে পারলেন না। এখানে মূলত ষড়যন্ত্রের কিছু নাই। তারেক রহমান জনগণের রাজনীতি করেন, তারেক রহমান জনগণের পাশে দাঁড়াবেন, বিএনপি চেয়ারপারসন দাঁড়াবেন, আমরা দাঁড়াবো।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হল থেকে রাতে ছাত্রীদের বের করে দেয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘আমার মেয়ে বা আপনার মেয়েকে যদি রাতে হল থেকে বের করে দেয়া হয় সেটা কেমন লাগবে? এটাতো দিনের বেলায় হতে পারতো, তদন্ত কমিটি হতে পারতো, সেইগুলো নিয়ে এত গোপনীতা কেন?’

‘মেয়েদের মোবাইল সিজ করা হয়েছে। কে মোবাইল সিজ করতে পারে। মোবাইলতো আপনার পকেটে। কেন আপনি আমার মোবাইল নেবেন? আপনি আমার ইউনিভার্সির ভিসি হন আর যেই হন। আপনি পারেন না। ৫০ জনের লিস্ট করা, সিসি টিভিতে দেখা, যারা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল তাদের বাবাকে জিজ্ঞাসা করা। কাউকে উঠিয়ে নিয়ে একবার চোখ বাঁধা, একবার না বাঁধা, একবার ছেড়ে দেয়া। আসলে ঘটনাটা কেন ঘটছে।’

পার্থ বলেন, ‘এটা একটা ম্যাসেজ যে, আমরা চাপের মুখে কোটাটা বাদ দিয়েছি এজন্য পুরোটাই বাদ দিয়েছি। এটাকে সংস্কার দরকার ছিল। এর আগে ছাত্রদের ভ্যাট নিয়ে আন্দোলন দেখেছেন, মানি না ভ্যাট দিতেই হবে। আন্দোলনের মুখে তাদের কিন্তু সেটা মেনে নিতে হয়েছিল।’

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সংসদে মতিয়া চৌধুরীর দেয়া বক্তব্যেরও সমালোচনা করেন পার্থ।

দাবি মেনে নেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, যখন সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে যাচ্ছে বা সব জায়গায় চলে যাচ্ছে তখন সরকার বলে, আমরা দিতে চাচ্ছি না, ঠিক আছে তাহলে বাদ দিয়ে দিলাম।’

২০ দলীয় জোটের এই নেতা বলেন, ‘এখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ আছে যে কীভাবে তারা এটা একুমেডেশন করলো, কারা করলো, এখন একটা নিদর্শন দিতেই হবে, নিদর্শন না দিলে আগামীতে এ ধরনের আন্দোলন হয় কি না, যদি হয় তাহলে যাতে থামাতে পারে।’

সাবেক এই সাংসদ বলেন, ‘গণতন্ত্র একটা চর্চার বিষয়। এখন বিরোধী দল সংসদে দাঁড়িয়েও সরকারের প্রশংসা করে। যেকোনো ইস্যুতে তারা সরকারের প্রশংসা করে।’ তিনি বলেন, ‘যদি আপনি সংসদে বক্তব্য দেন, তাহলে আপনাকে প্রথমে বলতে হবে বঙ্গবন্ধু, তারপর অমুক, তারপর টাইটেল, তারপর কী কী ভালো কাজ করেছে, তারপর আমাদের গালিগালাজ। এই বলতে বলতে আপনার সময় শেষ হয়ে যাবে। এরপর বলবে যে, স্পিকার আমাকে আরও দুই মিনিট সময় দেন, আমার এলাকার জন্য কিছু বলবো। এই পাঁচ বছরে প্র্যাকটিস হতে হতে এই জিনিসটা এখন চলছে।’

পার্থ বলেন, ‘আমাদের রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা, আমাদরে ব্যর্থতা, আজ ৪০ বছর পরও এই ছেলেগুলো, বাচ্চা ছেলেগুলি যারা এই আন্দোলন করছে, এরা কী চাচ্ছে, টাকা চাচ্ছে না, পয়সা চাচ্ছে না, ঘুষ চাচ্ছে না, কিছুই যাচ্ছে না, চাকরি চাচ্ছে। সবচেয়ে বড় উন্নয়ন কিন্তু মানুষের উন্নয়ন। আপনি রাস্তা করেন, ঘাট করেন, ব্রিজ করেন, কালভার্ট করেন এগুলো কিন্তু উন্নয়ন না। আমরা জন্মের পর থেকে দেখে আসছি, আমরা চাই রাস্তাঘাট ভালো হবে, যদি না হয় এই দায় কিন্তু আগের প্রজন্মের যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, এরপর ৫০ বছর দেশ চালিয়েছেন। আমার বাবা হতে পারেন, আমার আত্মীয় হতে পারেন, যারা এই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত উনাদের দায়।’

‘এই উন্নয়নটাই আমাদের দরকার, শিক্ষিত মেধাবী ছেলেমেয়েরা উপরে আসবেন। তারাই শিক্ষিত মেধাবীদের উপরে নিয়ে আসবেন। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যার কারণে আমাদের ১৬ কোটি ১৮ কোটি জনগণ থাকা সত্ত্বেও যাদের অল্প জনগণ আছে যেসব দেশে, দুই কোটি আড়াই কোটি জনগণ তারা আমাদের চেয়ে অনেক উপরে। কারণ  মানবসম্পদের উন্নয়নের জায়গাটায় তারা আমাদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী।’

কোটা সংস্কারের আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি এই আন্দোলনটা একটা বিপ্লব। আমি মনে করি এই আন্দোলনটা যথাযথ। জনগণের প্রত্যেকটা দাবির সঙ্গেই আমরা থাকবো। আমি মনে করি তারেক রহমান যে কাজটি করেছেন সেটা জনগণের কাজ করেছেন।’

আন্দোলনটা কোটায় সীমাবদ্ধ থাকেনি’

আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘কোটা সংস্কারে যে বিষয়গুলো নিয়ে আন্দোলন হয়েছে সেই আন্দোলনের অনেকগুলো দিকও রয়েছে। যারা আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল তারা সুনির্দিষ্টভাবে কী চায় একথা না বলে সমগ্র ব্যবস্থাটাকে একটা অস্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল।’

‘একটা দেশে দাবি থাকতে পারে, প্রশাসনিক ব্যবস্থার, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার পরিবর্তন বা সংশোধনের জন্য দাবি আসতেই পারে। আর কোনো ব্যবস্থাই চিরন্তন না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিশ্বাস করেন যেকোনো ব্যবস্থাই চিরন্তন না। তিনি অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন, বিধবা ভাতা, দুস্থ ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা চালু করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ছিল না, আবার মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পুনর্বাসন করা, অনগ্রসর গোষ্ঠীকে সামনে নিয়ে আসার জন্য সংবিধানেও বলা আছে।’

রেজাউল বলেন, ‘কোটার আন্দোলনকে আমরা দোষের কিছু দেখি না। তবে আন্দোলনটা যখন ভয়ঙ্কর দিকে যাচ্ছিল তখন সেই রকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে, সরকারপ্রধান হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি নারীর ক্ষমতায়নের জন্য, নারীর অধিকার দেবার জন্য, নারীকে সাবলম্বী করার জন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, এখনো রাখছেন, তিনি সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।’

আওয়ামী লীগের এই নেতা বলেন, ‘আন্দোলনটাকে যেভাবে ধাবিত করার চেষ্টা করা হচ্ছিল, আন্দোলনটা কোটার আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। আন্দোলন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে বলে শেখ হাসিনা দাবি মেনে নিলেন তা কিন্তু নয়। আমি বলছি, আন্দোলনের আকারটা এমন আকার ধারণ করছিল যে, তখন প্রশ্ন আসছিল, কোটার আন্দোলন নাকি অন্যকিছুর আন্দোলন। আন্দোলনের বিষয়ের প্রতি সংবেদনশীলতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সেটা ছিল। সেটার বহিঃপ্রকাশ তিনি ঘটিয়েছেন।’

‘কিন্তু এটাকে ইন্সট্রম্যান্ট হিসেবে ব্যবহার করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার জন্য একটা পরিকল্পনা ছিল। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যেটা বললেন, বিচ্ছিন্ন আন্দোলনে কাজ হবে না। আপনারা গণতন্ত্রের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পুড়ুন। অর্থাৎ যারা কোটার আন্দোলনে ছিলেন তাদেরকে বললেন ২০ দলীয় জোটের বা বিএনপির আন্দোলন, ওটার দিকেও ঝাঁপিয়ে পড়ুন। ওরা বলে কোটা আর এরা বলে আমাদের রাজনীতির আন্দোলন। এই রকম একটা যোগসূত্রতা।’

রেজাউল করিম বলেন, ‘বিএনপি নেতা তারেক রহমানের কনভারসন সবাই পেয়েছেন। সামগ্রিক অবস্থাটা অনাকাঙ্ক্ষিত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাবি মেনে নিয়ে যেমন সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন, তদ্রুপভাবে পরিপক্ক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রের ভেতর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির অপচেষ্টা কেউ যাতে চালাতো না পারে সেই বিষয়টাও তিনি সুকৌশলে দেখেছেন।’

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির কথা বলছেন। কিছু কিছু ঘটনা ঘটেছে যেই ঘটনাগুলো কোনোভাবে কোনো বিবেকবান মানুষ সমর্থন করতে পারে না। যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী নেত্রীর (ইফফাত আরা এশা) গালিগালাজ, তার কর্মীদের প্রতি চাপ সৃষ্টি করা এটাকে আমরা সমর্থন করি না। একইভাবে একজন ছাত্রীকে বিবস্ত্র করে আগে থেকে জুতার মালা তৈরি করা, সেই মালা পরিয়ে দেয়ার বীভৎস, নারকীয়, বর্বরোচিত ঘটনাও কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি। সেখানে উচ্ছ্বসিতভাবে যারা এটা করেছে সেটাতো আমরা দেখেছি। আমরা যেমন ওই মেয়েটির তার কর্মীদের প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ বন্ধ করাকে সমর্থন করি, অনুরূপভাবে যারা তাদের একজন সহপাঠী তার সাথে যে ব্যবহার করেছে এই চিত্রটা যারা দেখেছেন তারা কি ভাবতে পারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীরা তাদের একজন স্বজনকে জুতার মালা ঝুলিয়ে দিতে পারে।’

এশা সম্পর্কে ছাত্রলীগের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ছাত্র সংগঠনের যে সিদ্ধান্তটা এসেছিল সেটা উত্তাল অবস্থায় যে তথ্য তাদের কাছে এসেছিল সেই তথ্যের ভিত্তিতে। তদন্তের মাধ্যমে সামগ্রিক অবস্থাটা পাওয়ার পরে তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে।’

অন্য ছাত্রীদের সঙ্গে ওই ছাত্রীর আচরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এই সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত অভিমত দলের নেতাকর্মী যেই হন না কেন, ছাত্রলীগ ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। এই সংগঠনের কোনো নেতানেত্রী অনাকাঙ্ক্ষিত আচারণ করে তাহলে আমি শ ম রেজাউল করিম আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে কোনোভাবে সমর্থন করতে পারি না।’

(ঢাকাটাইমস/২২এপ্রিল/এমএবি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত