ঐতিহ্যবাহী নাচ নিয়ে কাজ করতে চাই: প্রান্তিক দেব

শেখ সাইফ
| আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:৫৪ | প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:৫৯

প্রান্তিক দেব। তরুণ নৃত্যশিল্পী। পড়াশোনা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্বে। ছোটবেলায় নাচ শেখার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও শেখা হয়ে উঠেনি। তবে দমে যায়নি তার ইচ্ছা। কলেজজীবনে এসে নিজের অদম্য ইচ্ছাতেই নাচের জগতে পা রাখেন। নাচ নিয়ে জীবনে অনেকদূর যেতে চান। নাচের নানা দিক নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকাটাইমসের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন- শেখ সাইফ

আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে জানতে চাই

আমার ছেলেবেলা কেটেছে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সিংঘোটিয়া গ্রামে। পরিবারে মা-বাবা এবং আমরা দুই ভাই বোন। আমি ছোট। বাবা পরিতোষ দেব, পেশায় ডাক্তার। মা ইতি সরকার, স্বাস্থ ও পরিবার পরিকল্পনাতে চাকরি করেন। গ্রামের আর আট দশটা ছেলের মতই মাঠে মাঠে ঘুরে বেড়ানো, বৃষ্টির দিনে ভেজা, কাদা ছোড়াছুড়ি করা, মাঠে ফুটবল, ডাংগুলি খেলা এসব করেই দিন কেটেছে। এক সময় গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে টাঙ্গাইল সদরের স্বামী বিবেকানন্দ হাইস্কুল ও মাহমুদুল হাসান কলেজে ভর্তি হই।

নাচের সঙ্গে যুক্ত হলেন কবে থেকে?

আমার খুব মনে পড়ে। যখন আমি ক্লাস সিক্সে পড়তাম তখনকার কথা। সে সময় পহেলা বৈশাখে নাচের অনুষ্ঠানে আমার বয়সের ছেলে-মেয়েদের নাচ দেখে আমার খুব নাচ শেখার ইচ্ছা জাগে। ইস, যদি তাদের মতো নাচতে পারতাম! এ কথা আমার বাসায় জানালে কেউ রাজি হলো না। এমনি করে মনের ইচ্ছা মনে পুষে রেখে হাইস্কুলের শিক্ষাজীবন পার করলাম। একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমি দেখে দেখে যেকোনো নাচের মুদ্রা খুব সহজে আয়ত্ব করে ফেলতাম। এমনি করে কলেজে নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বাসার কাউকে কিছু না বলে নাচ করেছিলাম। ওই সময় আমাকে সহায়তা করেছিলেন আমার নাচের প্রথম গুরু শ্রদ্ধেয় হারুন স্যার। বলতে পারের তখন থেকেই আমার নাচের জগতে পা রাখা।

নাচ নিয়ে প্রতিবন্ধকতা কেমন?

অনেকের ধারণা নাচ মূলত মেয়েদের জন্য। ছেলেরা আবার নাচ করবে কেনো? আবার অনেকে মঞ্চে নাচ করা বা নাচ শেখাকে বাকা চোখে দেখতো। এখন আর সেই অবস্থা নেই। আমরা অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পেরেছি। এখন অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের শেখাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। তবে নাচ এখনো পেশা হিসেবে নেওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি হয়নি। নাচ শিখছে ভালো কথা। শিখুক। কিন্তু পাশাপাশি তাকে অন্যকিছু হওয়ার জন্য তৈরি হতে হবে। তাদের কাছে নাচ শুধু শখের বশে করা হতে পারে। এটার প্রধান কারণ আমি মনে করি প্রচার প্রসারের অভাব। আমাদের মিডিয়াগুলো যদি নাচকে সেইভাবে প্রচারে কাজ করত তাহলে নাচ নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতো।  আপনি দেখুন। প্রতিটি টেলিভিশন চ্যানেলে যেভাবে নাটক দেখানো হয়। গানের অনুষ্ঠান প্রচার করা হয় সেভাবে নাচের অনুষ্ঠান প্রচারণা করা হয় না। দু’একটি চ্যানেলে টুকটাক নাচের অনুষ্ঠান করা হলেও তা হাতে গোনা। তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই বললেই চলে।

তরুণ নৃত্যশিল্পী হিসেবে নাচকে কীভাবে দেখেন?

যারা তরুণ নাচিয়ে তাদের অনেকেই ভালো কাজ করছে। বর্তমানে সবখানেই প্রতিযোগিতা চলছে। তাই আমরা যারা তরুণ নৃত্যশিল্পী তাদের উচিত ভালোভাবে নাচ শেখা। শিখে এসে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করা। অনেনে নাচ নিয়ে বিভিন্ন এক্সপেরিমেন্ট করছে। এটা খুব আশাব্যঞ্জক দিক। আর আমিও যেহেতু শিখছি তাই অন্যদের নাচ নিয়ে মন্তব্য করার স্পর্ধা দেখানো ধৃষ্টতার শামিল হবে। তবে এটুকু বলতে পারি ভালো-মন্দ মিলিয়ে কাজ হচ্ছে।

আমাদের দেশের নাচের মান কেমন?

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আর আমদের সংস্কৃতি ঐতিহ্যগত দিক থেকে একই বলা চলে। এ জন্য আমরা নাচের ক্ষেত্রে ভারতীয় ক্লাসিক্যাল ফর্মের চর্চা করি। আমাদের ফোক নৃত্যতেও ব্যবহার হচ্ছে ভারত নাট্যশাস্ত্র নির্দেশিত বিভিন্ন মুদ্রা। দেশীয় সংস্কৃতির সাথে সাথে তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফর্ম ও রপ্ত করে নিয়েছে। তবে আমাদের দেশের তরুণ নৃত্যশিল্পীদের সমস্যা হলো আমরা পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে থাকি। আমাদের সামাজিক অবস্থা, সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা আর মিডিয়ার প্রচারণার অভাবে আন্তর্জাতিক ফর্ম নিয়ে যে কাজ করার আগ্রহ সেটা হারিয়ে ফেলছে। তবে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে। এটি আরো বেশি হওয়া দরকার।

বাইরের দেশে কোথাও নাচ করেছেন কি?

আমি টুকটাক এই অল্প বয়সে অনেক কাজই করেছি। এটা আমার সৌভাগ্য বটে। পরিবারের সাপোর্টে আমি এতদূর আসতে পেরেছি। দেশ ও দেশের বাইরে কাজ করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনেক অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেছি। দেশের বাইরে- রাশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, শ্রীলংকা, ভারত, নেপালসহ আরো অনেক দেশেই প্রোগ্রাম করেছি। এসব দেশে আমার দেশের সংস্কৃতির নাচ তুলে ধরতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি।

যেহেতু আমি একদম ছোটবেলা থেকে নাচ শিখতে পারিনি। নাচের জগতে এসেছি অনেক পরে। আমি শিখে যাচ্ছি। আমার সবটুকু সত্তা ঢেলে দিয়ে নাচ শিখি, নাচ করি। আমার নাচের এ অবস্থায় আসার জন্য আশীর্বাদ হয়ে আছেন নাচের শিক্ষকগণ, বাবা-মা, আর দর্শকদের ভালোবাসা। দর্শকের ভালবাসা আমি সব সময় মাথায় তুলে রাখি। তাদের ভালোবাসা আমার অনেক বড় প্রাপ্তি, অনেক বড় অর্জন।

নাচের পাশাপাশি আর কিছু করছেন?

আমার ঘুম অত্যধিক প্রিয়। আমি ঘুমকাতুরে বলা চলে। ক্লাস, পড়াশোনা, নাচের পর যে অবসর পাই তখন ইউনিভার্সিটির বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেই। আমি যেহেতু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাটক ও নাট্যতত্ব নিয়ে অনার্স শেশ করলাম। তাই নাচের পাশাপাশি নাটকেও টুকটাক কাজ করি। এপ্রিলের ১১ তারিখে শিল্পকলার স্টুডিও থিয়েটার হলে আমার অভিনীত ‘দেবদাশ’ নাটক মঞ্চস্থ হলো। নাটকটির নির্দেশনায় ছিলেন ইউসুফ হাসান অর্ক।

নাচ নিয়ে আপনার স্বপ্ন জানতে চাই

বলা চলে হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে নাচ নিয়ে চলেছি। আমাদের সংস্কৃতি, দর্শকদের চাহিদা সবকিছু মাথায় রেখেই আমি নাচ করি। প্রায় সব ধরনের নাচ করি। যেমন ফোক, ক্রিয়েটিভ, ইন্ডিয়ান ক্লাসিক ইত্যাদি। তবে ভারতনাট্যম আমাকে খুব বেশি টানে। এছাড়া ময়ূরভঞ্জ ছৌ নৃত্য খুব ভালো লাগে।

আমি ভারতনাট্যম এখনো শিখছি। আমার গুরু শ্রদ্ধেয় আনিসুল ইসলাম হিরো স্যারের কাছ থেকে শিখছি। তিনি অনেক বড় মাপের একজন শিক্ষক। তাই আমি ভারতনাট্যম নিয়ে কাজ করার অনেক স্বপ্ন দেখি। খুব ইচ্ছা আমার দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে বাংলার ঐতিহ্যবাহী নাচ সংগ্রহ করবো। এবং নাচ নিয়ে গবেষণা করব।

নতুনদের জন্য আপনার পরামর্শ কি

আমি বিশ্বাস করি ভালোবাসা এবং প্রবল ইচ্ছা ছাড়া নাচ কেনো পৃথিবীর কোনো কাজেই সফল হওয়া যায় না। আমি আত্মা দিয়ে কাজ করি। নাচ আমার কাছে ইশ্বরের আশির্বাদ। শুধুমাত্র সুরের সাথে তাল মিলিয়ে হাত পা নাড়ালেই নাচ হয় না। হয়তো আপাতত দৃষ্টিতে মনে হবে কোনো ভুল নেই তবে দর্শকের মন তাতে তৃপ্ত হয় না। মনে হবে কোথাও যেন কমতি আছে। আমার কাছে মনে হয় নাচ সুন্দর করতে হলে মেধার সাথে দেহের সংযোগ ঘটানো দরকার। তবেই প্রতিটি মুদ্রা সঠিক হবে। নাচের একটি মুদ্রা সম্পূর্ণ না করে অন্য মুদ্রায় চলে যাবার প্রবণতা কমে যাবে।

আমি যেহেতু ইয়াং জেনারেশনের নৃত্যশিল্পীদের একজন। তাই ভুল ধরা আমার কাজ নয়। আমাদের ভুল শুধরে দেবে আমাদের গুরুজনেরা। আমরা যারা নাচ করি তাদের চর্চাটা চালিয়ে যেতে হবে নিয়মিত। তাহলে যখন আমরা কোনো ক্রিয়েটিভ স্টাইল বা ফিউশন করবো তখন বুঝতে পারব কতটা নান্দনিক হলো।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ

ঢাকাটাইমস এবং আপনাকেও ধন্যবাদ

(ঢাকাটাইমস/২৩এপ্রিল/এসএস/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিনোদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত