‘ঢাবি উপাচার্য ছাত্রলীগের অন্ধ অনুসরণ করেন কীভাবে!’

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ২৩:৪৪ | প্রকাশিত : ২৩ এপ্রিল ২০১৮, ২১:৫০

ঢাকা বিশ্ববিদালয়ের উপাচার্য ড. আখতারুজ্জামান ব্যক্তি হিসেবে খুব ভালো মানুষ হলেও প্রশাসক হিসেবে ‘অত্যন্ত অদক্ষ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির আইন বিভাগের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল। ছাত্রলীগ নেত্রী ইফফাত জাহান এশার ঘটনায় উপাচার্য ছাত্রলীগের অনুসরণ করেছেন বলে মনে করেন তিনি। একজন উপাচার্য কীভাবে ছাত্রলীগের অনুসরণ করে শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার এবং ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেয় এটা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন আসিফ নজরুল।

রবিবার রাতে  বেসকারি টেলিভিশন ইনডিপেনডেন্টের টক শো ‘আজকের বাংলাদেশে’ অতিথি হিসেবে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। খালেদ মুহিউদ্দিনের সঞ্চালনায় টক শোতে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম।

আসিফ নজরুল বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আর আমরা এক বিল্ডিংয়ে থাকতাম। তিনি পারিবারিকভাবে আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। উনার বাসায় হামলা হওয়ার পরদিন আমি গিয়েছি। উনি একজন ভালো মানুষ। কিন্তু উনি অত্যন্ত অদক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘প্রথমে ছাত্রলীগ এশাকে (সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহান এশা) বহিষ্কার করেছে। উনি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) এশাকে বহিষ্কার করেছেন। ছাত্রলীগ এশার বহিষ্কার প্রত্যাহার করেছে। তদন্ত হওয়ার আগেই উনি (ভিসি) বলেছেন বহিষ্কার প্রত্যাহার করা হবে। ছাত্রলীগ ২৪ জনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছে। ‍উনিও সেটা অনুসরণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্য ছাত্রলীগের এমন অন্ধ অনুসরণ করেন কীভাবে?’

‘ভিসি বলেছেন যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে তারাও ছাত্রলীগ করেন’ সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘ছাত্রলীগ করার পর উনি এগুলো বুঝতে পারেন। আগে বুঝতে পারেন না? আমি আবারও বলি, ব্যক্তিগতভাবে উনি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। আমার খুবই পরিচিত উনি। খুবই কষ্ট পাবেন অনুষ্ঠানটা দেখে। আমার কাছে এত খারাপ লেগেছে, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, তার সেই ব্যক্তিত্ব, সেই নিরপেক্ষতা কেন নেই? এমনও হতে পারে উনি সহজ সরল মানুষ। ঘটনার আকস্মিকতায় হয়তো উনার মাথাটাথা ঠিক নেই। কারণ বিচারবোধ কিছুটা উনি হারিয়ে ফেলেছেন। উনি এটা করতে পারেন না।’

কোটা সংস্কার আন্দোলন পুরোটাই মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে শুরু হয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘আমাকে এক মুক্তিযোদ্ধা বলেছেন, স্বাধীনতার আগে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ পেত আট শতাংশ চাকরি। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা দেশ স্বাধীন করে ১০০ শতাংশ করেছে। কথাটা শুনে আমার অনেক ভালো লেগেছে। আপনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চাকরি দেন। যুদ্ধাহত যারা আছে এবং যুদ্ধকালীন যারা শহীদ হয়েছে, তাদের সন্তানদের চাকরি দেন। কোনো বিবেকবান লোক এর বিরোধিতা করবে না।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘এখানে দুইটা বিষয়। একটা হলো প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা। আরেকটা বিষয় হলো সন্তানকে দিলে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা অথবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া। কিন্তু সমস্যা তখনই দেখা দিল যখন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারাসহ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধারা পেতে শুরু করলো। আর এই সরকারের আমলে যুক্ত হলো শুধু সন্তান নয় গণহারে নাতি-পুতিও পাবে। তখন মানুষের মনে এর অযৌক্তিকতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন জাগে। আমার মনেও জন্ম নিল এই প্রশ্ন। একটা নাতি বা পুতির কী যোগ্যতা আছে, কেন তারা নানা বা দাদার কৃতিত্ব পাবে?’

এ সময় সঞ্চালক প্রশ্ন করেন তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন কোটা সংস্কার আন্দোলন পুরোটাই মুক্তিযোদ্ধা কোটাটা নিয়েই?  আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে মনে করি। এটা নিয়ে লুকোছাপার কিছু নেই। প্রথমত, মুক্তিযোদ্ধা কোটার মধ্য সবচেয়ে বেশি অযৌক্তিক উপাদান (এলিমেন্ট) আছে। এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আপত্তি আছে। যেকোনো কোটার সাংবিধানিক বেসিস আছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সেটা নেই। কারণ সব মুক্তিযোদ্ধাকে আপনি পশ্চাৎপদ বললে আপনি তাদের অপমান করছেন।’

‘দ্বিতীয় হলো একমাত্র এই কোটাতে দুর্নীতি সম্ভব। কারণ আপনি পুরুষ হলে বলতে পারবেন না আমি নারী কোটা চাই। সুস্থ শরীরের হলে আপনি বলতে পারবেন না আমি প্রতিবন্ধী। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সম্ভব সার্টিফিকেট যোগাড় করে। একমাত্র এটাতেই দুর্নীতি করা সম্ভব।’

‘আর একটা বিষয়, ৫০ শতাংশ নারীকে দেয়া হচ্ছে ১০ শতাংশ কোটা। আর মুক্তিযোদ্ধা দুই লাখও ধরলেও তাদের পুরো পরিবার নিয়ে মোট  জনসংখ্যার এক শতাংশ। আপনি তাদের ৩০ শতাংশ করে দিচ্ছেন।’

আসিফ নজরুল বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী কোটা প্রয়োজন। তবে আন্দোলনকারীদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা বলেছে কোটা কমে গেলে ফ্রি প্রতিযোগিতা করতে পারছে ১০০টি পোস্টে। তাহলে তারা ১০ শতাংশের চেয়ে বেশি সুযোগ পাবে।’

‘কোটা আন্দোলনকারীদের কোনো মতাদর্শ থাকতেই পারে’

কোটা সংস্কার আন্দোলনে দুই ভাগ হওয়ার কারণ কী? এটা কি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কথাবার্তায় হয়েছে কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘কোটা সংস্কার বিষয়টা আমার কাছেও মনে হয় একটা যৌক্তিক দাবি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলতে চাই, তাদের আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা আমরা অস্বীকার করছি না। ৫৬ ভাগ কোটায় চলে যাচ্ছে। মেধাবীদের কাছে থাকছে ৪৪ ভাগ, সেটা নিয়েই কথা।’

‘কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন শুরু হয় আমরা তাদের শিক্ষার্থী হিসেবেই দেখছি। এই শিক্ষার্থীদের কোনো না কোনো মতাদর্শ থাকতেই পারে। প্রথমে ছাত্রলীগ পক্ষে বিপক্ষে কোনো অবস্থান নেয়নি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, ‘জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম সংসদে একটি তথ্য দিয়েছেন। বাংলাদেশে এখন তিন লাখ ৬১ হাজার ২৬১টি পদ খালি আছে। সেখানে ৪৮ হাজার ২৪৬টি প্রথম শ্রেণির, ৫৪ হাজার ২৯৪টি দ্বিতীয় শ্রেণির। আর শিক্ষিত বেকার আছে ২৫ লাখ।’

‘এর উপরে প্রতি বছর চার লাখ গ্র্যাজুয়েশন করছে। এই কোটা সংস্কার আমাদের অনেক বিষয় চিন্তার সুযোগ করেছ। আমরা কেন টেকনিকাল (কারিগরি) শিক্ষায় যাচ্ছি না।’

ছাত্রীরা কেন আন্দোলনে কেন গেল এই প্রশ্নের জবাবে ড. সাদেকা হালিম বলেন, ‘এটা ইতিবাচক দিক, তাদের আত্মোপলব্ধি হয়েছে, তারা প্রতিযোগিতায় যাবে। কিন্তু শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারীরাই কিন্তু সারা বাংলাদেশের নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে না। প্রশাসনে এখনও ৮৩ শতাংশ পুরুষ। এই ডেটাগুলো এখনও আমাদের দৃশ্যমান। এটা মাথায় রাখা উচিত। তার হয়তো এভাবে চিন্তা করেনি।’

গভীর রাতে ছাত্রীদের অভিভাবক ডেকে হল থেকে ডেকে বের করে দেয়ার সমালোচনা করেন দুই অতিথিই। তারা মনে করেন, প্রভোস্ট সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারতেন।

(ঢাকাটাইমস/২৩এপ্রিল/জেআর/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত