রানা প্লাজা ধস: বিচার আর কবে?

আদালত প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৮, ১৮:১৯ | প্রকাশিত : ২৪ এপ্রিল ২০১৮, ০৮:১৬

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতি দুর্ঘটনার। কেবল দেশ নয়, গোটা বিশ্ব তোলপাড় করা এই দুর্ঘটনায় মারা গেছে এক হাজার একশ জনেরও বেশি। কিন্তু এই মৃত্যুও জন্য যারা দায়ী, তাদেরকে পাঁচ বছরেও সাজা দিতে না পারা ব্যর্থতার গ্লানি হয়েই রইল।

এর মধ্যে আজ মঙ্গলবার এই দুর্ঘটনার পাঁচ বছর পূর্তিতে নানা আয়োজনে স্মরণ করা হবে নিহতদের। আগের চার বছরের মতোই দাবি করা হবে বিচার আর সরকারের পক্ষ থেকে বিচারের আশ্বাসও আসবে। হয়ত আরও একটি বছর যাবে এভাবে। কিংবা তার পর আরও একটি বছর।

বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় এভাবেই তৈরি হচ্ছে হতাশা। যে বিষয়টি বারবার আইন বিশেষজ্ঞরা বলে আসছেন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারে আট তলা রানা প্লাজা ধসে সেখানে থাকা কয়েকটি পোশাক কারখানার এক হাজার ১১৭ জনকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১৭ দিনের অভিযানে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। সে হিসেবে নিহত হয় এক হাজার ১৩৬ জন।

অন্যদিকে আহত হয় এক হাজার ১৭০ জন। মৃত উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ৮৪৪ জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্তকৃত মরদেহ জুরাইন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। গুরুতর আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করে ৭৮ জন।

সারা বিশ্বেও অন্যতম ভয়াবহ এই শিল্প দুর্ঘটনার পর মামলা হয় মোট তিনটি। হত্যা, ইমারত নির্মাণ আইন এবং ইমারত নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে তিনটি মামলায় অভিযোগ গঠনও হয়েছে। কিন্তু এরপর আইনি জটিলতায় ঝুলে আছে বিচার। এর দুটি মামলার বিচার গত দুই বছরে একটুও আগায়নি।

মামলাগুলোর ৪২ আসামির মধ্যে একমাত্র ভবনটির মালিক সোহেল রানা এখন কারাগারে। বাকিদের ৩২ জন জামিনে, সাত জন পলাতক  এবং দুই জন আসামি মারা গেছেন।

হত্যা মামলা

হত্যা মামলায় ২০১৫ সালের ১ জুন রানা, রানার বাবা-মাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত সংস্থা সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর।

এরপর প্রায় এক বছর ধরে মামলাটির পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা এবং পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিসহ নানা কার্যক্রমের পর ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারের জন্য আসে।

ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই আসামিগণের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার শুরুর আদেশ দেন।

আসামিদের মধ্যে সাত জন এই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে কোয়াশমেন্টের আবেদন করার পর হাইকোর্ট মামলাটির নিম্ন আদালতের কার্যক্রম স্থগিত করে।

সম্প্রতি ৬ জন আসামির স্থগিতাদেশ বাতিল হলেও আসামি মোহাম্মদ আলী খানের স্থগিতাদেশ এখনো বহাল থাকায় আদালত এ পর্যন্ত সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি।

এ সম্পর্কে পাবলিক প্রসিকিউটর খোন্দকার আব্দুল মান্নান ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘একজন আসামির পক্ষে স্থগিতাদেশ ১২ মে পর্যন্ত রয়েছে। এর মধ্যে যদি বৃদ্ধির কোন আদেশ না আসে তবে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করব।’

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী জানান, এই মামলায় জামিনে থাকা সিদ্দিক ও আবুল হোসেন নামে দুই জন আসামি মারা গেছেন।

রাজউকের ইমারত নির্মাণ আইনের মামলা

২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন ১৩ জনকে আসামি করে সাভার থানায় মামলা করেন।

ওই মামলায়ও হত্যা মামলার সঙ্গে ২০১৫ সালের ১ জুন অভিযোগপত্র দেন সিআইডি কর্মকর্তা বিজয় কৃষ্ণ কর। এতে ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে আসামি করা হয়। এদের ১৭ জনই হত্যা মামলারও আসাম।

২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম মোস্তাফিজুর রহমান আসামিগণের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।

এরপর আসামিদের মধ্যে তিন জন এই আদেশ বাতিলে জন্য ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে তিনটি রিভিশন মামলা করেন। মামলার মধ্যে দুইটি খারিজ হলেও অপরটি বিচারাধীন থাকায় এখনও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে পারেনি আদালত।

এ সম্পর্কে ওই আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আনোয়ারুল কবির বাবুল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘আমরা সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন বিচারাধীন থাকায় আদালত সাক্ষ্যগ্রহণ করতে পারছি না।’

ইমারত নির্মাণে দুর্নীতির মামলা

রানা প্লাজা ভবনে ছয় তলা নির্মানে অনুমোদন থাকার পরও নয় তলা ভবন নির্মাণ করায় ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় সাভার থানায় ২০১৩ সালের ১৫ জুন মামলাটি করে দুদক।

মামলায় রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই এবং দ্বিতীয় দফায় ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপ পরিচালক মফিদুল ইসলাম।

এই মামলায় ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ এম আতোয়ার রহমান ২০১৭ সালের ২১ মে অভিযোগ গঠন করেন।

এ মামলা প্রসঙ্গে দুদকের প্রসিকিউটর মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, ‘বাদীর সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়েছে। যা চলমান। আশা করি, অপর সাক্ষীদের সাক্ষ্য নিয়ে দ্রুত মামলাটির বিচার শেষ করতে পারব।’

তিন মামলার আসামিদের অবস্থান

তিন মামলা মিলে মোট আসামি ছিল ৪২ জন। এদের সাতজন এখনও পলাতক। এরা হলেন, সাভার পৌরসভার সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাভার পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ ফারজানা ইসলাম, নান্টু কন্ট্রাকটার, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, রেজাউল ইসলাম, নয়ন মিয়া ও সফিকুল ইসলাম।

অন্যদিকে কারাগারে রয়েছেন শুধু ভবন মালিক সোহেল রানা। আসামি অবু বকর সিদ্দিক এবং আবুল হাসান মারা গেছেন।

জামিনে থাকা ৩২ আসামি হলেন: প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাইট ইঞ্জিনিয়ার সারোয়ার কামাল, ইমারত পরিদর্শক আওলাদ হোসেন, ভবন মালিক সোহেল রানার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, সাভার পৌর মেয়র রেফাত উলøাহ, কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইতার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, আমিনুল ইসলাম, মো. মধু, অনিল দাস, মো. শাহ আলম ওরফে মিঠু, সাভার পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কমকর্তা উত্তম কুমার রায়, সোহেল রানার মা মর্জিনা বেগম, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের সাবেক উপ-প্রধান পরিদর্শক আব্দুস সামাদ, উপ-প্রধান পরিদর্শক বেলায়েত হোসেন, পরিদর্শক প্রকৌশল ইউসুফ আলী, পরিদর্শক প্রকৌশল মহিদুল ইসলাম, ইতার টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, মনোয়ার হোসেন বিপ্লব, আতাউর রহমান, আব্দুস সালাম, বিদ্যুৎ মিয়া, সৈয়দ শফিকুল ইসলাম জনি, আব্দুল হামিদ, আব্দুল মজিদ, আমিনুল ইসলাম, ইউসুফ আলী ও মাহবুল আলম।

ঢাকাটাইমস/২৪এপ্রিল/আরজেড/ডব্লিউবি

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত