হাদিসের আলোকে শবে বরাত

মুফতি ইমদাদুল হক ফয়েজী
 | প্রকাশিত : ০১ মে ২০১৮, ১৮:১৭

লাইলাতুন্নিসফি মিন শাবান অর্থাৎ মধ্যশাবানের রাত। আরেকটু সহজ ভাষায় ১৪ শাবান দিবাগত রাত। যা আমাদের পরিভাষায় ‘শবে বরাত' বা ‘লাইলাতুল বারাত’ তথা মুক্তির রাত। কোরআন–হাদিসে ‘বারাত’ শব্দের উল্লেখ না থাকলেও সম্বন্ধের কারণ সম্ভবত রাসুল সা. এর হাদিস। নবীজী সা. ইরশাদ করনে, আল্লাহ তায়ালা অর্ধশাবানের রাতে সৃষ্টির দিতে (করুণার) দৃষ্টি করেন। মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতিত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।' (ইবনে হিব্বান-৫৬৬৫)

হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা দুই প্রকার মানুষ ছাড়া সবাইকে ক্ষমা দেন। অন্যভাবে বললে-দোজখ ও শাস্তি থেকে মুক্তি দেন। হতে পারে এটাই নামকরণের সার্থকতা। আর এ কারণেই বলা হয় ‘শবে বরাত’ বা ‘লাইলাতুল বারাত’ তথা মুক্তির রাত।

আমাদের কেউ কেউ এ রাতের ফজিলত একেবারেই অস্বীকার করেন। আবার কেউ কেউ ইবাদাতের নামে মনগড়া পথ ও পদ্ধতির অনুসরণ করেন, যা ইবাদাতের পরিবর্তে বিদাতে রূপ নেয়। অস্বীকার কিংবা মনগড়া ইবাদাত কোনোটিই কাম্য নয়। শরিয়ত যা যেভাবে নির্দেশ করেছে তা হুবহু সেভাবে পালন করাই ইবাদাত এবং শরিয়তের চাহিদা। এতে কম-বেশি করার কোনো প্রকার সুযোগ বা অবকাশ নেই। 

শাবান মাস রমজার প্রস্তুতি গ্রহণের সময়। এ মাসের ফজিলত বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। শাবান মাসে রাসুল সা. অধিক হারে রোজা রাখতেন। উম্মতকেও এর ওপর উৎসাহিত করেছেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'আমি রাসুল সা. কে কখনও রমজান ছাড়া পূর্ণ কোনো মাসে রোজা রাখতে দেখিনি। শাবান মাসে তিনি অধিক পরিমাণে রোজা রাখতেন। বছরের অন্য কোনো মাসে এরূপ করতেন না।' (বুখারি-১৬৮৬)

হজরত উসামা ইবনে জায়দ রা. নবীজি সা. কে শাবান মাসে অধিক রোজা রাখার কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, 'অধিকাংশ মানুষ এ মাসের ব্যাপারে উদাসীন থাকে। অথচ এটি এমন মাস, যে মাসে আল্লাহর কাছে বান্দাদের আমলনামা পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমলনামা এমন অবস্থায় পেশ করা হোক, যখন আমি রোজাদার।' (নাসায়ি-২৩৫৭)

'লাইলাতুল বারাত’ শব্দ সরাসরি হাদিসে নেই বলে এ রাতের কোনো মর্যাদা বা ফজিলত নেই, একথা বলা একেবারেই অবান্তর। মধ্য শাবানের রাত তথা শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যদিও অধিকাংশ হাদিসের সনদ দুর্বল। এ ব্যাপারে যুগের অন্যতম শীর্ষ আলেম শায়খুল ইসলাম আল্লামা তকী উসমানী দা.বা. বলেন, 'দশজন সাহাবি থেকে শবে বরাতের মর্যাদা সম্পর্কে হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অবশ্যই কোনো কোনোটির সনদ দুর্বল। এই সনদগত দুর্বলতার কারণে কেউ বলে দিয়েছেন এ রাতের ফজিলত ভিত্তিহীন। কিন্তু মুহাদ্দিস ও ফকিহদের ফয়সালা হলো কোনো একটি হাদিস যদি সনদগতভাবে দুর্বল হয় অতঃপর বিভিন্ন হাদীস দ্বারা তা সমর্থিত হয় তাহলে এ সমর্থনের কারণে তার দুর্বলতা রহিত হয়ে যায়। সুতরাং শবে বরাতের ফজিলতকে ভিত্তিহীন বলা একটি অকাট্য ভুল।' (নির্বাচিত বয়ান-পৃ. ৯৭ )

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা রা. বলেন, 'একবার মধ্য শাবান রাতে রাসুল সা. আমার কাছে এসে আবার বের হয়ে গেলেন। আমি তার পেছনে বের হয়ে তাকে ‘জান্নাতুল বাকিতে পেলাম। তিনি মুমিন ও শহীদদের জন্য ইস্তেগফার করছিলেন। রাসুল সা. ঘরে ফিরে আমাকে বললেন--হে আয়েশা, আজ মধ্য শাবানের রাত। আজ রাত আল্লাহ তায়ালার বনু কালব গোত্রের ছাগলের পশমের পরিমাণ (অধিকসংখ্যক) বান্দাদের ক্ষমা করবেন। আল্লাহ তায়ালা মুশরিক , হিংসা পোষণকারী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী পুরুষ, মাতা-পিতার অবাধ্য ও মদপানকারীদেরকে ক্ষমা করবেন না। এরপর রাসুল সা. আমাকে বললেন- হে আয়েশা, তুমি কি আজ রাত আমাকে ইবাদাতের অনুমতি দেবে? আয়েশা রা. বলেন, আমি বললাম আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য উৎসর্গিত। রাসুল সা. দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে লাগলেন। এরপর এতো দীর্ঘ সেজদা করলেন যে আমার সন্দেহ হলো তাঁর রূহ মোবারক কবজ করা হয়নি তো! আমি উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুল নাড়া দিলাম, তা নড়ে উঠলো। আমি শান্ত ও আনন্দিত হলাম যে, রাসুল সা. জীবিত আছেন। তিনি সিজদায় এ দোয়া পড়ছিলেন-

(অনুবাদ) আমি আপনার নিকট আপনার শাস্তি থেকে ক্ষমার, আপনার অসন্তুষ্টি থেকে সন্তুষ্টির, আপনার থেকে আপনার (শাস্তি ও পাকড়াও থেকে) আশ্রয় চাই। আপনার সত্তা মহান, আমি আপনার উপযুক্ত প্রশংসা করতে অক্ষম, আপনি এরূপ, যেরূপ আপনি আপনার প্রশংসা করেছেন। আয়েশা রা. বলেন, আমি রাসুল সা. এর কাছ থেকে এ দোয়া পড়তে লাগলাম। তিনি বললেন, হে আয়েশা! এ দোয়া শিখো এবং অন্যদেরকেও শিখিয়ে দাও।' (বায়হাকি-৩৮৩৩)

হজরত আলী রা. বলেন, রাসুল সা. ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের মাঝে মধ্য শাবানের রাত আসে, তখন তোমরা এ রাতে ইবাদাত করো এবং দিনের বেলা রোজা রাখো।' (ইবনে মাজাহ-১৩৮০) 

পূর্বেও বলা হয়েছে, এ রাতের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিসগুলোর কোনো কোনোটি সনদের দিক থেকে দুর্বল। কিন্তু দশজন সাহাবি থেকে বর্ণিত হওয়ায় এবং দুর্বলতা কঠিন না হওয়ার কারণে তা হাসানের স্তরে পৌঁছে গেছে। ফলে ফজিলত অস্বীকার করা যায় না। সুতরাং আমাদের উচিত কোনো প্রকার অবজ্ঞা, অবহেলা না করে বাসুল সা. এর আমল এর আলোকে মনগড়া ও বাড়াবাড়ি মুক্ত ইবাদাত করা। হাদিস থেকে রাসুল স. এর আমল স্পষ্ট। যেমন- তিনি একবার মধ্য শাবানের রাতে মুসলমানদের কবরস্থানে গিয়ে মাগফেরাত কামনা করেছেন। দেখুন, রাসুল সা. থেকে তার দীর্ঘ জীবনে মাত্র একবার এ রাতে কবরস্থানে যাওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। তাও একাকি, সুতরাং আমরা এ রাতে কবর জিয়ারত করতে পারি। তবে তা প্রতি বছর নয়। আবার দলবদ্ধভাবে যাওয়ারও কোনো ভিত্তি নেই। বলা বাহুল্য, আমরা যদি প্রতি বছর কবর জিয়ারতের রুটিন করে ফেলি এবং দলবেঁধে যাই তবে তা ভ্রান্তি এবং মনগড়া বাড়াবাড়ি। আর এরূপ কিছুই বিদাত।

রাসুল সা. এর দীর্ঘ নামাজ সম্পর্কিত হাদিস আমাদের আমলের মাপকাঠি। দেখুন, রাসুল সা. দীর্ঘ নামাজ পড়েছেন, সেজদা করেছেন কিন্তু তা একাকি এবং নিজঘরে। এছাড়া অন্যান্য রাত্রিতেও রাসুল সা. নফল নামাজ নিজঘরেই আদায় করেছেন। সুতরাং আমাদের নফল নামাজ ও ইবাদাত এরূপ হওয়াই সুন্নাহ'র চাহিদা। স্মরণ রাখতে হবে, নফল নামাজ আল্লাহর সাথে বান্দার বিশেষ সম্পর্ক স্থাপনের সোপান, যা নির্জনে হওয়াই কাম্য। একথা সবারই জানা যে, রাসুল স. এর কামরার দরজা খুললেই ছিল মসজিদে নববী সা.। যদি নফল আমল ঘরের চেয়ে মসজিদে করা উত্তম হতো তবে রাসুল সা. কোনো স্থানস্বল্পতা সত্ত্বে এবং মসজিদে নববী পাশে রেখেও নিজঘরে নফল আমল করতেন? আরও বাড়াবাড়ি হচ্ছে, আমরা অনেকেই এ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ জামাতের সাথে আদায় করি। অথচ তা কোনোভাবেই প্রমাণিত নয়। আমাদের ভাবা উচিত, আমরা আবেগের বশীভূত হয়ে ইবাদাত মনে করে অনেক কিছুই করি- যা বাস্তবে শরিয়ত বা সুন্নাহ সম্মত নয়। ফলে আমলনামায় পুণ্যের পরিবর্তে পাপ জমা হয়।

আবার ইবাদাতের নামে এমন কিছু কাজ এ রাতে করা হয় যা একবারেই ভিত্তিহীন। যেমন: হালুয়া, শিরনি, আতশবাজি, মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, আলোকসজ্জা, গোসল, মৃত্যের রুহ ঘরে আসার ধারণা, বরাতের নামাজ, আলফিয়া নামাজ ইত্যাদি। এগুলো কু-সংস্কার এবং বেদাত। যা কোনোভাবেই শরিয়ত সমর্থন করে না বরং জঘন্যতম পাপ।

মধ্য শাবান রোজা রাখার ব্যাপারে আল্লামা তকী উসমানী দা. বা. বলেন, 'এটাকে রীতিমতো সুন্নত মনে করা ঠিক নয়। যেহেতু হাদিসটি দুর্বল, তাই কেবল মধ্য শাবানের কারণে নয় বরং নবীজী স. এ মাসে অধিক রোজা রাখতেন এবং রাখতে উম্মতকেও উৎসাহিত করেছেন এছাড়া প্রতি আরবি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ রোজা রাখা মুস্তাহাব, উদ্দেশ্যে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া যেতে পারে। যাতে রাসুল সা. এর অন্যান্য হাদীসের ওপর আমলের কারণে পুণ্য অর্জন হয়ে যায়। 

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সঠিকভাবে তথা তার রাসুল সা. এর হাদিসের আলোকে নীরবে, নিভৃতে ইবাদাতের মাধ্যমে মহিমান্বিত এ রজনীকে মূল্যায়ণ করার তাওফিক দান করুন। সবধরনের প্রান্তিকতা ও বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত রাখুন। আমিন।

লেখক: আলেম

সংবাদটি শেয়ার করুন

ইসলাম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত