‘সরকারি একটি টাকাও পরিবারের জন্য খরচ করব না’

আলফাডাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৪ মে ২০১৮, ০৮:১৬ | প্রকাশিত : ০৩ মে ২০১৮, ২২:৪১

জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হলে সরকার থেকে প্রাপ্য সুযোগ সুবিধার একটি টাকাও নিজের ও পরিবারের জন্য খরচ করবেন না বলে অঙ্গীকার করেছেন ফরিদপুর-১ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন-প্রত্যাশী আরিফুর রহমান দোলন। তিনি বলেছেন, সরকারি টাকায় তার সন্তানদের একটি চকলেটও কিনে খাওয়াবেন না। সেসব অর্থ জনগণের সেবায় ব্যয় করবেন।

আজ বৃহস্পতিবার বিকালে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের কোন্দারদিয়া বাজারে এক পথসভায় তিনি এ কথা বলেন।

ফরিদপুর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য দোলন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে ফরিদপুর-১ আসনের বিভিন্ন এলাকায় জনসংযোগ করছেন জোরেশোরে।

ইতিমধ্যে আলফাডাঙ্গা ও মধুখালীতে বিপুল প্রচারণায় তার পক্ষে জনগণের মধ্যে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছেন। এখন তিনি এই আসনের অপর উপজেলা বোয়ালমারীতে গণসংযোগে নেমেছেন।

নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন-প্রত্যাশী তরুণ এ নেতা কোন্দারদিয়া বাজারের পথসভায় সমাগতদের উদ্দেশে বলেন, আমি প্রথমবার এলাম আপনাদের মাঝে। এটাই শেষ বার নয়। বারবার আসব। আমরা সবাই মিলে যেন এ অঞ্চলকে আরো যেন সমৃদ্ধ করতে পারি। আমাদের অঞ্চল যেন আর পিছিয়ে না থাকে। সারাদেশ যেমন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেত্বতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের এই অঞ্চল যেন সেই উন্নয়নের মহা সড়কে আরো বেশি করে যুক্ত হতে পারে, সেই জন্য আমি আপনাদের নিয়ে কাজ করতে চাই।

দোলন বলেন, আমরা যখন এই অঞ্চলের উন্নয়নের দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাই, তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, তোমরা বিচ্ছিন্নভাবে কেন আসো। তোমাদের তো একজন জনপ্রতিনিধি আছে। তোমাদের দাবি, তোমাদের উন্নয়নের কথা তোমাদের প্রতিনিধি বলবেন। দুঃখের বিষয়, জনপ্রতিনিধি যখন আমাদের দাবির কথা না বলেন, তখন আমাদের কিন্তু মুখ খুলতে হয়। সেভাবেই আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম, যদি জনপ্রতিনিধি আমাদের দাবির কথা না বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা কি পিছিয়ে থাকব?

দোলন বলেন, তিনি আমাদের পিছিয়ে রাখতে চান না। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি নিজে এগুলো দেখবেন। আলফাডাঙ্গার যে গ্রামে আমার বাড়ি, সে গ্রামে ৮০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প তিনি আমাদের দিয়েছেন। টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার (টিটিসি)।

‘আমরা কিন্তু আমার এলাকার উন্নয়নের কথা বলতে যাইনি। বলেছি, ফরিদপুর-১ অঞ্চলের মানুষের জন্য। এ অঞ্চলের মানুষ পিছিয়ে আছে’- বলেন তিনি।

‘আমরা কেন পিছিয়ে থাকব। আমরা তো পিছিয়ে থাকতে পারি না। কারণ, এ অঞ্চলের মানুষ বারবার নৌকার প্রার্থীকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করে জাতীয় সংসদে পাঠায়। যেই মার্কার সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়, সেই মার্কায় ভোট দিয়ে আমরা কেন কাঙ্খিত উন্নয়ন পাব না।’ দোলন বলেন, নেত্রী কিন্তু এ যুক্তি মেনে নিয়েছেন। তিনি আলফাডাঙ্গায় ৮০ কোটি টাকার টিটিসি দিয়েছেন। বোয়ালমারী উপজেলাতেও এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান হবে।

ফরিদপুর-১ আসনে মনোনয়ন-প্রত্যাশী এ সমাজসেবক বিভিন্ন সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তাঘাটের উন্নয়নের দাবি নিয়ে ফরিদপুর সদর আসনের এমপি, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের কাছে গিয়েছেন জানিয়ে বলেন, যখনই এ অঞ্চলের রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট সড়কের উন্নয়নের দাবি নিয়ে তার কাছে যাচ্ছি, উনি কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে সে দাবি মেনে নিচ্ছেন। আমরা এভাবে বিচ্ছিনভাবে এলাকার উন্নয়নের জন্য কাজ করছি।

কিন্ত এসব দায়িত্ব ছিল জনপ্রতিনিধির। জনপ্রতিনিধি যদি আমাদের দাবি নিয়ে কথা না বলেন, সে জন্য আমরা পিছিয়ে পড়তে পারি না। আমাদের বঞ্চনার কথা বলার দায়িত্ব জনপ্রতিনিধির। তারা যদি কোনো কারণে ব্যর্থ হয়, তখন বাধ্য হয়ে আমাদের মুখ খুলতে হয়। সরকার জনপ্রতিনিধিদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা ও অর্থকড়ি দেন। আমাদের ‍দুঃখ দুর্দশার কথা শোনার জন্য তাদের এ সুবিধা দেয়া হয়। আমাদের দুর্দশা লাঘবের চেষ্টা করার জন্য তাদের এসব ‍সুবিধা দেয়া হয়। তাদের যাবতীয় খরচ সরকার দেয়।

‘সরকার চলে জনগণের ট্যাক্সের টাকায়। জনপ্রতিনিদের খরচ সেখান থেকে দেয়া হয়। আপনার সেবা করার জন্য আপনি টাকা দিচ্ছেন। আপনার সেবা করার জন্য জন্য যিনি অর্থকড়ি ও সুবিধা পাচ্ছেন তার কাছ থেকে কি আপনারা সেবা পাচ্ছেন?’ প্রশ্ন রাখেন দোলন।

ঢাকাটাইমস ও এই সময় সম্পাদক বলেন, ‘আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিন’ বলে স্বীকার করছেন জনপ্রতিনিধিরা আপনাদের সেবা করতে চান। কে কার সেবা করে? চাকর মনিবের সেবা করে। তাহলে আপনারা জনগণ হলেন মনিব।’

‘দুঃখের বিষয়, নির্বাচিত হওয়ার পর, কোনো কোনো জনপ্রতিনিধি নিজেকে মনিব মনে করছেন। আর জনগণকে চাকর মনে করছেন। জনগণকে চাকর মনে করছেন বলেই জনগণের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অসম্মানজনক আচরণ করছেন। উন্নয়ন করছেন না। সেবা না করলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পাওয়া টাকা জনপ্রতিনিধির জন্য হালাল হবে না।’

‘জনপ্রতিনিধি যতদিন নিজেকে চাকর মনে না করবেন, ততদিন আপনারা কাঙ্খিত সেবা পাবেন না।’

দোলন বলেন, আমি এ অঞ্চল ঘুরেছি আর নিজে নিজেকে প্রশ্ন করেছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি আপনাদের চাকর হতে চাই। চাকর যদি হতে না পারি সেবা করব কিভাবে। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলাম কি হলাম না এটি বড় কথা নয়। জনগণকে সম্মান করতে পারলাম কিনা, সেবা করতে পারলাম কিনা, জনগণের ভালোবাসা পেলাম কিনা এটিই বড় কথা।

এ সময় দোলন সমাজসেবায় নিজেদের পারিবারিক ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, আমার বাড়ি কামারগ্রামে। আমার পূর্ব পুরুষ শত বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের সেবা করছেন। আমার দাদু কাঞ্চন মুন্সী। তিনি এ অঞ্চলে সর্ব প্রথম মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। তার আগে প্রাইমারি স্কুল করেছেন, হাসপাতাল করেছেন, মসজিদ-মাদ্রাসা করেছেন, কবরস্থান করেছেন। এইভাবে তার জীবদ্দশায় হাজার হাজার মানুষের সেবা করে গিয়েছেন। আমিও আমার পূর্ব পুরুষের সমাজসেবার ধারাবাহিকায় আপনাদের সেবা করতে আপনাদের কাছে হাজির হয়েছি। খোঁজ নিয়ে দেখবেন, আমিও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কাঞ্চন মুন্সীর নামে একটি ফাউন্ডেশন করেছি। একটি স্কুল করেছি। সেখানে বিনামূল্যে বাচ্চাদের উচ্চমানের শিক্ষা দেয়া হয়।

দোলন বলেন, আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে সরকার থেকে থানার বিভিন্ন সড়ক কাচা থেকে পাকা করার চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে অনেক রাস্তা করা সম্ভব হয়েছে। এগুলো জনপ্রতিনিধির কাজ। জনসেবার বিভিন্ন কাজে সরকারের দরবারে দৌড়াচ্ছি সুসম্পর্ক আছে বলে। এসব কাজ একজন মেম্বার, চেয়ারম্যান ও এমপির। তাদের ক্ষমতা বেশি। কিন্তু আপনারা আমরা তো সাধারণ জনগণ। জনগণের সেবা করতে, সরকার থেকে উন্নয়নের বরাদ্দ আনতে জনপ্রতিনিধি হওয়া প্রয়োজন।

কৃষকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ সভাপতি দোলন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা সারাদেশের উন্নয়ন করে সোনার বাংলা গড়ছেন। আর নেতৃত্বের ব্যর্থতায় আমরা যদি উন্নয়নের বরাদ্দ না আনতে পারি এ দায় কার? আপনাদের আমাদেরও দায় আছে। আমরা যদি আমাদের দাবি আদায়ে সচেষ্ট থাকি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, তাহলে আমরা কিন্তু জনপ্রতিনিধি পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখি। জনগণই ক্ষমতার উৎস। আপনারা প্রত্যেকেই একেকজন মেম্বার, চেয়ারম্যান ও এমপি। আপনারাই প্রকৃত শক্তিশালী। আপনারা গর্জে উঠুন। আপনারা নিজেদের দাবি আদায়ে সচেষ্ট হন। কোনোভাবে আর বঞ্চিত হওয়া যাবে না।’

‘শেখ হাসিনা আমাদের প্রতি অনেক আন্তরিক। তিনি আমাদেরকে দিতে চান। আপনাদের প্রতিনিধি যদি আপনাদের সেবা করতে না পারে, তাহলে প্রয়োজনে প্রতিনিধি পরিবর্তন করে আরেকজনকে পাঠান, যিনি চেয়ে আনতে পারবেন। যিনি নিজেকে চাকর মনে করে আপনাদের সেবা করতে পারবেন, যিনি নিজেকে প্রকৃত অর্থে আপনাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবেন তাকে পাঠান। যে জনপ্রতিনিধি আপনাদের বুড়ো আঙুল দেখালেন, তাকে আপনাদের প্রয়োজন আছে কিনা বিবেচনা করবেন।’

এসময় তিনি এমপি হলে সরকারি অর্থ জনগণের সেবার ব্যয় করার অঙ্গীকার করে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি যদি কোনোদিন জাতীয় সংসদের প্রতিনিধি হতে পারি, তাহলে লাখ লাখ টাকার সরকারি সুবিধা গ্রহণ করব না। আমি আমার দুই সন্তানের মাথায় হাত রেখে অঙ্গীকার করেছি, সরকারি টাকায় তাদের একটি চকলেটও খাওয়াবো না। কারণ, আল্লাহ তায়ালা তো আমাকে উপার্জন করার ক্ষমতা দিয়েছেন। আমি সরকার থেকে পাওয়া অর্থ জনগণের সেবায় ব্যয় করব।’

দোলন বলেন, আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে আমি কেন এমপি হতে চাই। আমি এমপি হতে চাই সম্মানের জন্য এবং এমপি হলে বেশি করে আপনাদের উন্নয়ন ও সেবা করা সম্ভব হবে তাই।

পরে দোলন দুই বছর আগের নিজের গাড়িতে সড়ক দুর্ঘটনায় পড়ার কথা স্মরণ করে বলেন, আমি সেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করতে পারতাম। মৃত্যুকে কাছ দেখেছি। মৃত্যু থেকে বেঁচে ফিরেছি আপনাদের সেবা করার জন্য। পরে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমৃত্যু এ অঞ্চলের মানুষের সেবা করব। সৃষ্টি কর্তার কাছে এ অঙ্গীকার করেছি। আপনারা আমার ভালো কাজ আমাকে সহযোগিতা করবেন। মন্দ কাজে সহযোগিতা করবেন না। সমালোচনা করবেন। আপনাদের উন্নয়নের জন্য আমাকে ব্যবহার করবেন। এমপি হই আর না হই, আমি আমৃত্যু আপনাদের সেবা করে যাব।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন, ফরিদপুর জেলা পরিষদ সদস্য ও জেলা কৃষকলীগের সদস্য সচিব শেখ শহীদুল ইসলাম শহীদ, বোয়ালমারী উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুজ্জামান মৃধা লিটন, ঢাকা মহানগর প্রজন্ম লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লুৎফর রহমান, দাদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ, সাতৈর ইউনিয়ন কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক ওসমান মিয়া, দাদপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি তোফাজ্জেল হোসেন প্রমুখ।

ঢাকাটাইমস/০৩মে/প্রতিনিধি/ইএস 

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজপাট বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত